বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে কারসাজি করে অন্তত ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন ১০০ রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির মালিকসহ সংশ্লিষ্ট তিন শতাধিক ব্যক্তি। ১০০ অ্যাজেন্সির মধ্যে এ পর্যন্ত ৪০টির মালিকসহ ১০২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৪০টি মামলা করেছে দুদক। এতে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা ২ লাখ ৫ হাজার ২৮৪ জনের কাছ থেকে সরকার-নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি ৯৫ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা আদায়ের পর আত্মসাৎ করেছেন। আরও ৬০টি অ্যাজেন্সির মালিকসহ অন্তত ২০০ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানে অভিযোগসংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে একই ধরনের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা। দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে আরও ৬০টি মামলা হতে পারে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানান, গত ১১ মার্চ থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ৪০টি মামলা হয়েছে। সেগুলোর তদন্ত চলছে। একই ধরনের অভিযোগে আরও অনেক রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা যদি মামলা দায়েরের সুপারিশ জানিয়ে কমিশনে প্রতিবেদন পেশ করেন, সে ক্ষেত্রে কমিশন পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
দুদক সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া সরকারের চুক্তির আওতায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১০টি নির্ধারিত রিক্রুটিং অ্যাজেন্সি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাত। বিভিন্ন অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে আবার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে মালয়েশিয়া। ওই সমঝোতায় শ্রমিক পাঠাতে রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০টি করা হয়। ২০২২ সালে সরকারি আদেশে শ্রমিক ভিসায় মালয়েশিয়া যেতে শ্রমিকপ্রতি সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার ৫৪০ টাকা ফি নির্ধারণ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেখানেও তৈরি হয় নতুন সিন্ডিকেট। মালয়েশিয়াগামী প্রত্যেকের কাছ থেকে নির্ধারিত খরচের অতিরিক্ত ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করেন ১০০ অ্যাজেন্সির মালিক ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের (লোটাস কামাল) পরিবারসহ সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেয় ২০-২৫টি অ্যাজেন্সি। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অতিরিক্ত টাকা খরচ করেও প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষে অনেকেই মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। অনেকেই ছাড়পত্র পাননি, বাকিরা ছাড়পত্র পেলেও মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তার সম্মতি না পেয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন। এভাবে অ্যাজেন্সিগুলো ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়াগামী অন্তত ১৪ লাখ ৩২ হাজার ৮৩৫ জনের কাছ থেকে নির্ধারিত খরচের অতিরিক্ত প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের মাধ্যমে আত্মসাৎ করে।
মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে দুর্নীতির বিষয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল (লোটাস কামাল), সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক এমপি বেনজীর আহমদ ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ওই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চলতি বছরের শুরুর দিকে দুদকে অনেক অভিযোগ আসে। অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে জোর তৎপরতা শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত ১১ মার্চ প্রথমবারের মতো মামলা করে দুদক। এতে ৬৭ হাজার ৩৮০ জনের কাছ থেকে ১ হাজার ১২৮ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে ১২টি অ্যাজেন্সির ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ১২টি মামলা করা হয়। অ্যাজেন্সিগুলো হলো অরবিটাল এন্টারপ্রাইজ, অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল, স্নিগ্ধা ওভারসিজ, আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল, বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল, বিএম ট্রাভেলস, বিএনএস ওভারসিজ, রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেড ও দ্য ইফতি ওভারসিজ।
এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর ১৩ অ্যাজেন্সির ৩১ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ১৩টি মামলা করে দুদক। এতে ৬৯ হাজার ২৪৩ জনের কাছ থেকে ১ হাজার ১৫৯ কোটি ৮২ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। অ্যাজেন্সিগুলো হলো আকাশ ভ্রমণ, উইনার ওভারসিজ, শাহীন ট্রাভেলস, নাভিরা লিমিটেড, আদিব এয়ার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, ইউনাইটেড ম্যানপাওয়ার কনসালট্যান্স, গ্রিন ল্যান্ড ওভারসিজ, পিআর ওভারসিজ, জাহরত অ্যাসোসিয়েটস, অনন্য অপূর্ব রিক্রুটিং, জান্নাত ওভারসিজ, মিডওয়ে ওভারসিজ ও সাউথ পয়েন্ট ওভারসিজ।
গত ৬ নভেম্বর ৩ হাজার ৩৩১ জনের কাছ থেকে ৫২৫ কোটি ২২ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে ছয়টি অ্যাজেন্সির ১১ জনের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করে দুদক। অ্যাজেন্সিগুলো হলো আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, মেরিট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, সাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল, ইম্পেরিয়াল রিসোর্সেস, আরআরসি হিউম্যান রিসোর্স সার্ভিস ও থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল।
১১ নভেম্বর ৩১০ কোটি ৯৩ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চারটি রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির পাঁচজনের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। অ্যাজেন্সিগুলো হলো সেলিব্রিটি ইন্টারন্যাশনাল, অদিতি ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল এবং আর ভিং এন্টারপ্রাইজ।
১৩ নভেম্বর ৩১৪ কোটি ৩৪ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচটি রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির ২২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক পাঁচটি মামলা করে দুদক। অ্যাজেন্সিগুলো হলো এমএস জিএমজি ট্রেডিং, জিএমজি অ্যাসোসিয়েট, কিউকে কুইক এক্সপ্রেস, এমইএফ গ্লোবাল ও দাহমাসি করপোরেশন।
একই ধরনের অভিযোগে আরও ৬০টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। অ্যাজেন্সিগুলো হলো এএনজেড মাল্টিন্যাশনাল, নেক্সট ওভারসিজ, আল হেরা ওভারসিজ, জনতা ট্রাভেলস, এমএস এশা ইন্টারন্যাশনাল, মালয়েশিয়া বাংলাদেশ হোল্ডিংস, ত্রিবেণী ইন্টারন্যাশনাল, এমএস শান ওভারসিজ, মনসুর আলী ওভারসিজ অ্যান্ড ট্রাভেলস, হাইডরি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এজিএ ইন্টারন্যাশনাল, বেসিক পাওয়ার অ্যান্ড কেয়ার ওভারসিজ, ইস্ট ওয়েস্ট প্যারাডাইজ, কিসওয়া এন্টারপ্রাইজ, মাস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, নাতাশা ওভারসিজ, নিউ হ্যাভেন ইন্টারন্যাশনাল, রমনা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, ইউনাইটেড এক্সপোর্ট, উইন ইন্টারন্যাশনাল, দ্য সুপার ইস্টার্ন, মদিনা ওভারসিজ, মৃধা ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, ম্যানিসপাওয়ার করপোরেশন, প্রান্তিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম, আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, সুলতান ওভারসিজ, প্রভাতি ইন্টারন্যাশনাল, এমএস বিডি গ্লোবাল বিজনেস, ট্রান্স এশিয়া ইন্টারগ্রেট সার্ভিসেস, গ্যালাক্সি করপোরেশন, গাজীপুর এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আল ফারাহ হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড কনসালটেন্সি, অপরাজিতা ওভারসিজ, আল খামিস ইন্টারন্যাশনাল, দরবার গ্লোবাল ওভারসিজ, ফোর সাইট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, এমএস কাশিপুর ওভারসিজ, মুবিন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, জেজি আল ফালাহ ম্যানেজমেন্ট, দিশারি ইন্টারন্যাশনাল, এমএস আল হেরা ওভারসিজ, ফিউচার ইন্টারন্যাশনাল, স্ট্যানফোর্ড এমপ্লয়মেন্ট, মোহাম্মদ নুরুজ্জামান অ্যান্ড সন্স, আহাদ ইন্টারন্যাশনাল, আমান এন্টারপ্রাইজ, আক্তার রিক্রুটিং এজেন্সি, রানওয়ে ইন্টারন্যাশনাল, এমএস এলিগ্যান্টস ওভারসিজ, পিএন এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি, আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনাল, আল-বোখারি ইন্টারন্যাশনাল, আমিয়াল ইন্টারন্যাশনাল, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল, নিউ এজ ইন্টারন্যাশনাল, ঐচি ইন্টারন্যাশনাল, পাথ ফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনাল, সরকার ইন্টারন্যাশনাল এবং এসওএস ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেস।