গণভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচিতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রশাসনিক গণভোট এবং আরেকটি সাংবিধানিক গণভোট ছিল। চতুর্থবারের মতো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আবারও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজন করা হয়েছে।
এবারের গণভোটে জনমত কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়েও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে চলছে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা। বিশেষ করে সরকারি প্রচারে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো নিয়েও সমালোচনা করছেন অনেকে।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, বিশ্বের অনেক দেশেই কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জনগণের মতামত নিতে গণভোট নেওয়ার চর্চা আছে। তবে বাংলাদেশে যেগুলো হয়েছে, তাতে জনগণের মত কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, তৃণমূলে গণভোটের বিষয়ে অস্পষ্টতা দূর করতে মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষ থেকে নিচ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বার্তায় বলা হয়, প্রচারের অংশ হিসেবে গত রবিবার বরিশালে বিভাগীয় কর্মকর্তা সম্মেলন ও ইমাম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে গণভোট বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং অন্য বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। আগামী কয়েক দিনে অন্য সব বিভাগেও একই ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এসব কর্মসূচিতে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এভাবে গতকাল রাজশাহী বিভাগেও ইমাম সম্মেলন ও বিভাগীয় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া আগামীকাল বুধবার রংপুর, ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম, ১৭ জানুয়ারি ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহ, ২২ জানুয়ারি সিলেটে এবং ২৪ জানুয়ারি খুলনা বিভাগে বিভাগীয় পর্যায়ে ইমাম সম্মেলন ও বিভাগীয় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পাঠানো বার্তায় বলা হয়েছে।
গতকাল রাজশাহীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোট শুধু আগামী পাঁচ বছরের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে এবং বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন কীভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করবে–এসব মৌলিক সিদ্ধান্ত জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেটের মাধ্যমেই নেওয়া প্রয়োজন।’
এই সম্মেলনে আলী রীয়াজ আরও বলেন, ‘গণভোট আয়োজনের পেছনে জনগণের মতামতকে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য রয়েছে। এ কারণেই নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব গণভোটে অংশগ্রহণ করে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া।’
গণভোটের প্রচারের অংশ হিসেবে সরকারের ১১ জানুয়ারি থেকে আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট আটটি ফটোকার্ড শেয়ার করার কথা রয়েছে। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে গণভোটের প্রচারে ব্যানার টানানো হয়েছে। নির্বাচন পর্যন্ত গণভোটের লোগো ব্যবহার এবং এ-সংক্রান্ত ব্যানার দৃষ্টিনন্দন স্থানে প্রদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টানানো ব্যানারে লেখা আছে, গণভোট ২০২৬: সংসদ নির্বাচন। ৬ নম্বর ভবনের একটি ব্যানারে লেখা রয়েছে, দেশের চাবি আপনার হাতে। অন্য একটি ব্যানারে লেখা আছে পরিবর্তনের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন।
গত রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি ও শীর্ষ নির্বাহীদের গণভোটে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিটি ব্যাংক শাখায় দুটি করে ব্যানার টানানোর নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে সামনে আসে গণভোটের আলোচনা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের বৈধতা দিতেই গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
চারটি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে জনগণ মতামত জানাবেন।
ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
দেশে প্রথম গণভোট হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা আছে কি না, তা জানতে দেশের জনগণের মতামত নিতে ওই গণভোটের আয়োজন করা হয়।
ওই বছরের ৩১ মে দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে জানা যায়, ‘১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে জাতির উদ্দেশে বেতার ও টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে গণভোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সারা দেশে ২১ হাজার ৬৮৫টি কেন্দ্রে ৩০ মে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট নেওয়া হয়। ওই সময় দেশে মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখ। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, সেই গণভোটে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ‘না’ ভোট পড়েছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ।’
১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দেশে দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচি এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ওই গণভোটের আয়োজন হয়েছিল। আগের মতোই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এই পদ্ধতিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জনগণের আস্থা থাকলে জেনারেল এরশাদের ছবিসহ ‘হ্যাঁ’ বাক্সে এবং আস্থা না থাকলে ‘না’ বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সেই গণভোটে ভোট পড়েছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণে ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ‘তিন জোটের রূপরেখা’ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে গৃহীত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার পর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সম্মতি দেবেন কি না, সে প্রশ্নে দেশব্যাপী গণভোট আয়োজনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দেশের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত সেই তৃতীয় গণভোটে ভোট পড়ে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে, অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এই হার ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন ভোটার ‘না’ ভোট দেন। অর্থাৎ তারা রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। ‘না’ ভোটের হার ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। গণভোটে ৯৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৈধ ভোটের বিপরীতে বাতিল হয়েছিল শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট।
২০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের সেই বিধান বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর ওই সংশোধনী বাতিলের মামলায় হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি গণভোটও পুনর্বহাল করে রায় দেয়। সেই রায় কেউ চ্যালেঞ্জ না করায় গণভোট আয়োজনে এখন কোনো বাধা নেই।