‘তিন দিন ধরে এলপি গ্যাস পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করে বসে আছি। আগে ১২ কেজির যেসব সিলিন্ডার পেয়েছিলাম সেগুলো ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছি। কবে এই সংকট দূর হবে কোম্পানিও বলতে পারছে না। কী একটা বাজে অবস্থা চলছে। এভাবে চলা যায় না।’ এলপি গ্যাস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পেট্রোম্যাক্সের ডিলার এম এন ট্রেডার্সের ম্যানেজার মো. আকাশ খবরের কাগজের কাছে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এলপি গ্যাসের খুচরা বিক্রেতারাও জানান, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। দুই-একটা পাওয়া গেলেও ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে জানা যায়, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা প্রতিদিন ৫ হাজার টন এলপি গ্যাস বেশি দামে বিক্রি করছেন। ৪ লাখ ১৫ হাজার সিলিন্ডারে ৫ হাজার টন গ্যাস ধরে। প্রতি সিলিন্ডারে কমপক্ষ ১ হাজার ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। সে হিসাবে তারা ভোক্তাদের কাছ থেকে দিনে লুটপাট করছেন প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
রাজধানীতে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাসের চাহিদা আরও বেড়ে গেছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে শুরু হয়েছে এই সংকট। ১২ কেজির এলপি গ্যাস সিলিন্ডার সরকার ভোক্তা পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। কিন্তু এই দামে তো দূরের কথা, কোনো কোনো এলাকায় দ্বিগুণ দামেও মেলে না। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা মিলেমিশে যে যার মতো দাম নিচ্ছেন। এলপি গ্যাস সংকটের ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের সোহেল এন্টারপ্রাইজের বিক্রয়কর্মী মো. উজ্জ্বল খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই গ্যাসের সংকট চলছে। দুই-এক দিন পর এক গাড়ি (৬১৫ সিলিন্ডার) এলপি গ্যাস পাচ্ছি। ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। সকাল ৮টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কাজেই সবার চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।’ কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কোম্পানি থেকেই কিছু বলতে পারছে না, কবে পরিস্থিতি আগের মতো হবে। গাড়ি পাঠিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। এতে বাড়তি ভাড়া লাগছে।’
এদিকে খুচরা বিক্রেতারাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে জানান, ডিলাররা ১ হাজার ৫০০ টাকার কথা বললেও ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকার কমে বিক্রি করেন না। কম টাকা দিতে চাইলে তারা বলেন, গ্যাস নেই। সেই গ্যাস ভোক্তাদের কাছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
টঙ্গীর পূর্ব হারিচপুরের চা বিক্রেতা মো. মনু মিয়া বলেন, ‘২ হাজার ৫০০ টাকার বেশি দামে কিনতে হয় ১২ কেজির সিলিন্ডার। শুধু মনু মিয়াই নন, ঢাকা শহরের অধিকাংশ ভোক্তাকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এলপি গ্যাস।
বাড়তি দামের প্রভাব হোটেলে
গ্যাসের সংকটের কারণে বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁর লাভ কমে গেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারওয়ান বাজারের চারুলতা রেস্তোরাঁর ম্যানেজার আমির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাসের দরকার হচ্ছে। চাহিদামতো পাওয়া যায় না। বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। কিন্তু কোনো খাবারের দাম বেশি রাখা হয় না। এ জন্য আগের তুলনায় লাভ কমে গেছে। এ ছাড়া চা-পাতি ও কৌটার দুধের দামও বেড়ে গেছে। তাই চা বিক্রি করেও আগের মতো লাভ হয় না।’ তারা বেশি দামে চা বিক্রি না করলেও অনেক এলাকায় চা বিক্রেতারা এলপি গ্যাসের বাড়তি দামের কারণে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় একই কথা বলেন মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের নাদিম রেস্তোরাঁর ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।
জানা গেছে, সারা দেশে জ্বালানির কাজে এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ওই পরিস্থিতিতে আমদানিকারক কোম্পানি ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডসহ আরও অনেক কোম্পানি বেশি করে আমদানির অনুমতি চাইলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি। এর ধাক্কা লেগেছে দেড় বছর পর। সরবরাহ কমে যাওয়ায় ২৫ দিন ধরে দেশে এলপি গ্যাসের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্যাস আমদানিকারকরা বলছেন, সরকার আগে বেশি করে আমদানির অনুমতি দিলে এমন সংকট হতো না।
এলপিজির সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘লোয়াবের পক্ষ থেকে এক বছর আগে আমদানি বাড়াতে অনুমোদন চেয়েছিল। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কিছু কোম্পানির এলপি গ্যাস আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সরবরাহ কমে গেছে। এক বছর পর চিঠির জবাবে মন্ত্রণালয় বলেছে, এটা নীতিমালা অনুমোদন করে না। এরপর আবার গত ২১ আগস্ট চিঠি দেওয়া হয়। নতুন প্ল্যান্টের অনুমোদন চাইলেও দেয়নি। এ কারণেই সরবরাহ কমে গেছে। এ ছাড়া ইরান থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য এলপিজির সংকট চলছে। তবে আগের তুলনায় আমদানি বেড়েছে। তা দেশে আসতে সময় লাগবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
লোয়াবের কিছু সদস্যকে কেন বেশি করে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়নি–এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। সংকট কাটাতে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি)। এলপিজি আমদানির কাজটা বেসরকারিভাবেই পুরোটা হচ্ছে। তাই আপাতত সরকার শুধু আমদানির দায়িত্ব নেবে। সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের কাজ বেসরকারি খাতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা বলেন, ‘বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বেশি করে এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দেশে আসতে একটু সময় লাগবে। আশা করি, রমজান মাসের আগেই সংকট কেটে যাবে।’
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন। দিনে কম বেশি ৫ হাজার টন এলপিজি লাগে। ১ টনে ১২ কেজির ৮৩টি সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা হয়। ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ খরচ হয় রান্নায়, বাকি ২০ শতাংশ শিল্পকারখানা ও যানবাহনে। ২০২৪ সালে দেশে এলপিজি আসে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। গত বছরে আমদানি কমে হয় ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।