নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও আইনি সতর্কতার পরও দেশের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের সামনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যানার, পোস্টার ও বিলবোর্ড ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। প্রশাসনের মূল কেন্দ্র সচিবালয় তো বটেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ অন্য জেলার সরকারি দপ্তরগুলোতে গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ব্যানার ঝুলছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ভবন, অফিস, যানবাহন কিংবা সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে কোনো ধরনের নির্বাচনি বা গণভোট সংক্রান্ত প্রচার চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে লিখিত নির্দেশ পাঠানো হলেও মাঠপর্যায়ে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি।
গত ২৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোটকে সামনে রেখে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার সংক্রান্ত বিষয়ে সতর্ক করে। চিঠিতে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৮৬ ধারার বিধান উল্লেখ করে বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট সম্পর্কে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন, তবে তিনি ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোটের পক্ষে কোনোভাবেই জনগণকে আহ্বান জানাতে পারবেন না।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এ ধরনের কার্যক্রম গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে, যা আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। চিঠিটির অনুলিপি বিভাগীয় কমিশনার, রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, মাঠ প্রশসনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়।
এই নির্দেশের পর রাজধানীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে ব্যানার অপসারণের উদ্যোগ দেখা যায়। অবশ্য গতকাল শনিবার সকালে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের প্রবেশপথে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ঝুলানো ব্যানার দেখা গেছে। ভেতরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ভবনেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে টাঙানো ব্যানারগুলো ঝুলতে দেখা গেছে। অনেক স্থানে ‘হ্যাঁ চিহ্নিত টিক’ দেওয়ার পোস্টার লাগানো রয়েছে। সচিবালয়ের একটি সূত্র জানায়, এখনো ব্যানার সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
এর বাইরে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এই এলাকার একাধিক সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সামনে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারসামগ্রী ঝুলতে দেখা গেছে। গতকাল সকালে রাজধানীর মেট্রোরেলের একটি ভিডিও স্ক্রিনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে দেখা গেছে।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি অফিস ও দপ্তরে গণভোটে হ্যাঁ ভোটের প্রচার দেখা গেছে। গণভোটের বিষয়ে ইসি ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পেয়েছেন কি না? কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির খবরের কাগজকে বলেন, আমরা ইসির একধরনের নির্দেশ পেয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে এখনো চিঠি পাইনি। চিঠি পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান খবরের কাগজকে বলেন, ‘‘আমরা ইসির নির্দেশ পেয়েছি। সেটাই করছি– মানুষকে গণভোটের বিষয়ে সচেতন করছি, জানাচ্ছি। তবে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ এর বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত দিচ্ছি না।’’
এদিকে কিছু সরকারি দপ্তরে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যানার সরিয়ে ভিন্ন কৌশলে নতুন বোর্ড ও বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এসব বোর্ডে গণভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সংশোধন ও পরিবর্তনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হলেও সেখানে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান নেই। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এ ধরনের উপস্থাপনাও একতরফাভাবে নির্দিষ্ট একটি ভোটের পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার সরকারি অফিসগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রামে জেলা পরিষদ বহুতল ভবন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিভাগীয় কমিশনারের অফিস, নির্বাচন কমিশনের দপ্তর, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিসিএসআইআর এবং কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সামনে গণভোট সংক্রান্ত প্রচারসামগ্রী ঝুলতে দেখা গেছে। কোনো কোনো ব্যানারে সরাসরি ‘পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ’ লেখা থাকলেও কোথাও ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’ শিরোনামে গণভোটের পর সম্ভাব্য পরিবর্তনের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকাতেও সরকারি স্থাপনার আশপাশে বড় আকারের বিলবোর্ডে গণভোটের বিষয়বস্তু প্রচার করা হচ্ছে। যদিও সেখানে সরাসরি ভোটের আহ্বান নেই, তবু প্রচারের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মোতাবেক যেসব কার্য অপরাধ ও নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য, একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর প্রযোজ্য, অপরাধ ও আচরণবিধির লঙ্ঘন বলিয়া গণ্য হইবে এবং এরূপ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান প্রয়োগ করিয়া এখতিয়ারসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উক্ত অপরাধের বিচার এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।’
অন্যদিকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি কোনোভাবে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে তার সরকারি পদমর্যাদার অপব্যবহার করলে তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছর ও সর্বনিম্ন এক বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন।