মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, শিল্পের বিপর্যয় কাটানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা আনা, বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। বিনিয়োগ বাড়াতেও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই মত জানিয়ে শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বেসরকারি খাতে গতি আনতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।
জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি থামছে না। রমজান মাস উপলক্ষে এরই মধ্যে অনেক জিনিসের দাম আরও বেড়েছে। সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েই চলেছে। খরচ মিটাতে অনেকে সঞ্চয় ভেঙেছেন। অনেকে ধারদেনাও করেছেন। অনেকে পাড়া-মহল্লার দোকান থেকে বাকিতে নিয়েও সংসার চালাচ্ছেন। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, এবারে রোজায় দাম নাগালে রাখা নির্বাচিত সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
অর্থনীতির বিশ্লেষক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে আছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেন। কিন্তু শেষ সময় পর্যন্ত তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচিত সরকারের সামনে অর্থনীতির অন্যতম চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা।’
তিনি আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই রোজার মাস শুরু হয়েছে। প্রতি বছর রোজায় সিন্ডিকেটের দাপট বাড়ে। অতীতে কোনো সরকারই এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এবারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তা হবে নির্বাচিত সরকারের অন্যতম সাফল্য।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুর্নীতির অভিযোগ এনে খাদ্য পণ্য আমদানিকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার কারণেও বাজারে পণ্য সরবরাহ কমেছে। এতেও জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। জিনিসপত্রের দাম কমাতে বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে।’
গত দেড় বছরে শিল্প খাতে ধস নেমেছে। নানামুখী চাপে ক্রমাগত লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে হাজারের বেশি ছোটবড় কারখানা। এসব কারখানার মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল (বস্ত্র খাত), চামড়াশিল্প বেশি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিপর্যয় নেমেছে।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই একে একে বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের শতাধিক বড় মাপের শিল্প কারখানা। এসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অর্থপাচার, রাজস্ব ফাঁকিসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই এসব ব্যক্তির অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়েছে লক্ষাধিক শ্রমিক।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও হামিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘কেউ দুর্নীতি করলে তার বিচার হবে, কিন্তু দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ার আগেই তার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক না। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিক কর্মচারীরা বিনা দোষে বিপদে পড়বেন। বেকার হবেন। গত দেড় বছরে অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা অপরাধী কি না তা প্রমাণ হওয়ার আগেই অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেকার হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। নির্বাচিত সরকারের কাছে শিল্প খাতের বন্ধ কারখানা চালু করা এবং নতুন শিল্প গড়ে তোলার দাবি জানাই।’
সাবেক তত্ত্বাধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘অনেক বছর ধরে দেশে বিনিয়োগ নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। নতুন বেকারের সঙ্গে পুরোনো বেকার যোগ হয়ে অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যার সমাধান করতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ এলে শিল্প গড়ে উঠবে। পুরোনো শিল্পে গতি আসবে।’
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে গতি আনতে হবে। ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা আনা এখন জরুরি। এখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ছে না। এ খাতে গতি এলে ব্যাংকে খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশে ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্প খাতে মন্দা চলছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত দেড় বছরে রাজস্ব খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। রাজস্ব সংস্কার কমিটির সুপারিশ ছাড়াই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত সরকারকে এনবিআরে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নির্বাচিত সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে মনোযোগী হতে হবে। প্রয়োজনে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরামর্শ শুনতে হবে।’
এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব দেশের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে বাণিজ্য নীতি পরিচালনা করতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব অর্থনীতির মধ্যে আনা যাবে না। আশাকরি নির্বাচিত সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ নিয়ে আমরা ব্যবসায়ীরা মত দিলেও তা আমলে আনা হয়নি। পুরো ব্যাংক খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচিত সরকারকে ব্যাংক খাতে স্থিরতা আনতে হবে।’