দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সুদূর প্রবাসে থেকে দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নানা ছক কষেছেন, পরিকল্পনা করেছেন। দেশে ফিরে নির্বাচনি প্রচারে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া শুরু করেছেন। এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের নারী সদস্য পাবেন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই কার্ড একটি পরিবারের সচ্ছলতা বাড়াতে সহায়তা করবে। মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমাবে। পরিবারে নারীর সম্মান বাড়াবে, নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে।
কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ দিয়ে অনেকে পরিবারের জন্য খাবার কিনছেন, অনেকে সন্তানের পড়ার জন্য বা নিজের অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসায় খরচ করছেন। অনেকে ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ জমিয়ে নিজের শেষসম্বল ভিটেমাটিতে ঘর করার কথাও ভাবছেন। ভোগান্তি ছাড়া এই কার্ডের অর্থ হাতে পৌঁছে যাওয়ায় অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করে বলেছেন, এই কার্ড আমাদের মতো অসহায় মানুষের কাছে সহায় হিসেবে আছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, “দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। বিএনপির অন্যতম নির্বাচনি অঙ্গীকার ছিল ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। সরকার গঠনের পরপরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ কার্ড দেওয়া শুরু হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের দ্বিতীয় দিনেই এ কার্ড বাস্তবায়নের কাজে গঠন করা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রাপ্তি একটি দরিদ্র বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে তাৎক্ষণিক আর্থিক স্বস্তি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, যা মূলত মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়তা করবে। এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের নারীদের সম্মান বাড়বে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থ বা কম মূল্যে পণ্য সহায়তা পৌঁছাবে বলে গণমাধ্যমে জানতে পেরেছি। এই কার্ড একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে।’
ঈদের আগেই হতদরিদ্রদের হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দিতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে কমিটির সভাপতি করা হয়। তার নেতৃত্বে এই কমিটিতে ১৫ জন সদস্য রয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
প্রজ্ঞাপনে কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এ অর্থ ও পণ্য-সেবার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। প্রতি পরিবারে কেবল একটি কার্ড ইস্যু করা হবে। পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত-এ ৪টি শ্রেণিতে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে হতদরিদ্র এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। সরকার প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৩টি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১০ মার্চ এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারগুলো নিয়মিত নগদ সহায়তা পাবে। এই কার্ডের মাধ্যমে একটি পরিবারে কিছুটা হলেও আর্থিক স্বস্তি আসবে। এই কার্ড দিয়ে ভবিষ্যতে টিসিবি বা সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় কম মূল্যে পণ্য দেওয়া হলে অল্প আয়ের পরিবারগুলো খাদ্যসংকট থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে। এই কার্ডটি সাধারণত পরিবারের নারী প্রতিনিধির নামে দেওয়া হবে। ফলে ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াবে। পরিবারে ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও ক্ষমতা বাড়াবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ায় অল্প আয়ের পরিবারগুলো সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় আনবে। ফলে চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা পাবে। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত পরিবারটি রাষ্ট্রীয় তথ্যভান্ডারে যুক্ত হবে। ফলে ভবিষ্যতে অন্যান্য সরকারি সহায়তা পেতেও পরিবারটির সুবিধা হবে। এই কার্ড সুবিধাভোগী পরিবারগুলোকে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে সাহায্য করবে এবং পরিবারের ওপর নিত্যপণ্যের দামের চাপ কমাবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে নারী ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ফ্যামিলি কার্ড একটি পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করবে। সর্বজনীন প্রকল্পের এই কার্ড পরিবারের নারী প্রতিনিধির নামে হবে। পর্যায়ক্রমে সবাই এ কার্ডটি পাবেন। যাদের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, তাদের আর অন্য কোনো কার্ড দেওয়া হবে না বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
ফারজানা শারমিন পুতুল আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে সুবিধাভোগী বাছাই করতে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে এই কার্ড পৌঁছানো হবে। ক্রমান্বয়ে এটি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কাছেও পৌঁছানো হবে। প্রকল্পটির আওতায় সারা দেশে ১৪টি ইউনিটে কাজ শুরু হয়েছে। সুবিধাভোগীরা সরকার থেকে জনগণের কাছে ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এই সুবিধা পেয়ে যাবেন।’
ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ পাওয়া আছিয়া বেগম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার স্বামীর হার্টের সমস্যা আছে, লো প্রেশারও আছে। প্রতিদিনই তাকে ওষুধ খেতে হয়। আমাকেও নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। আমাদের দুজনের জন্য মাসে ২ হাজার টাকার বেশি ওষুধ কিনতে হয়। তাই এই টাকা থেকে কিছু ওষুধের জন্য রাখব, আর কিছু ভবিষ্যতের জন্য জমা করব।’
আরেক সুবিধাভোগী ফরিদা বেগম খবরের কাগজকে বলেন, পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। আমার স্বামী পেশায় একজন জেলে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ২ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছি। এই অর্থ সন্তানদের লেখাপড়ার কাজে ব্যয় করব।
তিনি আরও বলেন, ‘টাকাটা খুব বেশি না হলেও আমাদের মতো পরিবারের জন্য অনেক কাজে লাগবে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার পিছনে খরচ করব।’
এ বিষয়ে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, “দল-মত-নির্বিশেষে ফ্যামিলি কার্ড সবাইকে দেওয়া হবে। ফ্যামিলি প্রধান অর্থাৎ ‘মা’ এ কার্ড পাবেন। আর ফ্যামিলি কতগুলো হয়, আমরা ধরে নিই- ৫ জনের যদি একটি ফ্যামিলি হয়, আমাদের যদি ১৮ কোটি মানুষ হয়, তাহলে সাড়ে ৪ কোটি ফ্যামিলি আছে। এর মধ্যে হতদরিদ্র ও দরিদ্র আছেন।”