অসহনীয় তীব্র গরমের মধ্যে ‘ধানমন্ডি লেক’ ছিল এক টুকরো স্বস্তির জায়গা। প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে এখানে ভিড় জমাতেন শিক্ষক, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে সময় কাটাতে আসতেন। দিনমজুর, রিকশাচালক ও পথচারীরাও এই লেকের ছায়ায় সাময়িক স্বস্তি পেতেন।
ধানমন্ডি লেকের গুরুত্ব শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের ইতিহাসও। লেকের পাশেই অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি। লেকের গা ঘেঁষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের এই বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
সময়ের পথপরিক্রমায় এই লেকের শীতল চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর উদ্যোগে প্রকাশিত গবেষণায় ধানমন্ডি লেক সংশ্লিষ্ট এলাকা কলাবাগানকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি, এলাকায় গাছপালা ও সবুজ আচ্ছাদনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিচে নেমে এসেছে।
লেক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেটি এখন কচুরিপানা ও বর্জ্যের স্তূপে পরিণত হয়েছে। পানির ওপর ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ নানা ধরনের আবর্জনা। লেকজুড়ে কচুরিপানার বিস্তার এতটাই বেশি যে অনেক জায়গায় পানির অস্তিত্বই চোখে পড়ে না। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং লেক কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে।
লেকের পাড়ে যত্রতত্র ময়লা ফেলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবাসিক ভবনের পয়োবর্জ্য, যা দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়ক প্রঙ্গণে অবর্জনার মাত্রা বেশি দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে লেক পরিষ্কার করা হয় না। সেখানে পানি পচে যাওয়ায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এতে আশপাশের বাসিন্দা ও লেকে ঘুরতে আসা নগরবাসী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বেড়ে গিয়ে পুরো এলাকায় মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে লেকের পানি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর বিশেষ নজর রাখা হতো। স্থানীয় কাউন্সিলরের কার্যালয়ও লেকের পাশে। আগে নিয়মিতভাবে লেক থেকে নৌকা দিয়ে কচুরিপানা ও ময়লা পরিষ্কার করা হতো। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার চালানো হতো বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে সেই কার্যক্রম একেবারেই বন্ধ রয়েছে। সে সময় স্থানীয় কাউন্সিলরও পালিয়ে যান। ফলে লেকটি ধীরে ধীরে একটি দূষিত ও অচল জলাধারে পরিণত হচ্ছে।
লেকের আশপাশের গাছপালার অবস্থাও শোচনীয়। অনেক গাছ ভেঙে পড়েছে, কিছু কাটা অবস্থায় রয়েছে, আবার অনেক গাছ হেলে পড়ে আছে। যথাযথ পরিচর্যার অভাবে গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, যা এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্যকে আরও নাজুক করে তুলছে।
লেকে ভ্রমণ করেন এ রকম স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি চিত্রও উদ্বেগজনক। লেকের ভেতর ও পাড়ে হকারের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। সেখানে দিনে-রাতে অবাধে মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সন্ধ্যার পর এই পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
‘ধানমন্ডি সোসাইটি’র নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক সফিউল্লাহ ১৪ বছর ধরে এই লেকের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমান অবস্থা নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করে গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে লেকের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। আগে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হতো এবং প্রায় ১০ জন কর্মী লেক পরিষ্কার করতেন। এখন সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। কাউন্সিলর স্বপন পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে কেউ লেকের খেয়াল রাখেন না। কেউ ইজারা নিয়েছেন বা কেউ আছেন কি না, কিছুই জানি না।’
তিনি বলেন, আগে দিন-রাত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন থাকতেন। এখন তাদেরও দেখা যায় না। ফলে মাদকসেবীর সংখ্যা এবং ‘নিত্যনতুন’ লোকজনের আনাগোনা বাড়ছে। পুলিশের টহল থাকলেও তা নিয়মিত নয়। সোসাইটির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানিয়ে পুলিশের টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অবকাঠামোগত সমস্যাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। লেকের পাশে ‘মসজিদ-উত-তাকওয়া’ এলাকার সড়ক দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। এতে ধুলাবালি ছড়িয়ে এলাকার পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। প্রায় এক বছর ধরে এই অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এই পরিস্থিতিতে যারা নিয়মিত লেকে হাঁটাহাঁটি বা দৌড়াতে আসতেন, তারা এখন বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন। ধানমন্ডির কলাবাগানের বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার তৌফিক এখন অবসরে রয়েছেন। লেকে নিয়মিত হাঁটেন তিনি। লেকের বিষয় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আগে প্রতিদিন সকালে এখানে হাঁটতে আসতাম, খুব ভালো লাগত। এখন মাদক, দুর্গন্ধ আর মশার কারণে দাঁড়ানোই কঠিন, যেন দেখার কেউ নেই।’
রাজধানীর পরিবেশ নিয়ে কাজ করা ইমন চৌধুরী বলেন, ধানমন্ডি লেক শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়, এটি ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যেভাবে কচুরিপানা, বর্জ্য এবং পয়োবর্জ্যের মাধ্যমে লেকটিকে দূষিত করা হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে এই লেকে সচেতন রুচিবোধের লোকেরা আর আসবেন না, বরং অচিরেই অসাধুদের দখলে চলে যাবে।
ধানমন্ডি লেকটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন। সংস্থাটি সূত্রে জানা গেছে, লেকের পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং গাছপালার দায়িত্ব আলাদা বিভাগের অধীনে থাকায় সমন্বয়ের অভাব দেখা দিয়েছে। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অবহেলা আরও বাড়ছে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শনিবার সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে লেক এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
অব্যবস্থাপনা বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার খবরের কাগজকে বলেন, আগামী শনিবার লেকসহ ধানমন্ডি এরিয়ার সাতটি স্পটে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। সেখানে লেকের যে বিষয় যে কর্মকর্তার আওতাধীন তারাসহ আমাদের প্রশাসকও উপস্থিত থাকবেন।’
লেকের এমন দুর্দশার জন্য এই পদের আগের কর্মকর্তার অবহেলাকে দায়ী করেন বর্তমান প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) অতি.দা. মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি এখানে অতিরিক্তি দায়িত্ব পালন করছি। গত দেড়-দুই বছর এখানে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাদকসেবী বেড়েছে, এটি কার দায়িত্ব? প্রশাসন কী করছে? তার পরেও আমরা শনিবার সব বিষয়ে বিশেষ অভিযান চালাব।’
লেকের মসজিদের পাশে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির বিষয় তিনি বলেন, ‘এটি আমার দৃষ্টিতে ছিল না। এখন আপনার কাছে জানলাম, অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’