ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বৈধ প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৮৭.৭৬ শতাংশ বা প্রায় ৮৮ শতাংশ প্রার্থীই আয়করভুক্ত। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ৪৯ জন বৈধ প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণে এসব তথ্য জানা গেছে।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রার্থীর মধ্যে ৪৩ জন নিয়মিত আয়কর দেন, আর মাত্র ৬ জন প্রার্থী আয়করের আওতার বাইরে রয়েছেন। আয়করের বাইরে থাকা এই ছয়জনের মধ্যে রয়েছেন জামায়াত জোটের পাঁচজন এবং বিএনপির একজন প্রার্থী।
এদিকে গতকাল বিএনপির প্রার্থী মাধবী মারমার বিরুদ্ধে জেলা পরিষদের পদ থেকে পদত্যাগ না করার অভিযোগে আপিল করা হয়েছে। অন্যদিকে নিজের প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেছেন এনসিপির প্রার্থী মনিরা শারমিন।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রার্থীর বয়স ৪০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। ৩০ বছরের নিচে তরুণ প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, অন্যদিকে ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ রাজনীতিকদের উপস্থিতিও রয়েছে। ফলে বয়সের দিক থেকে প্রার্থীদের তালিকায় একটি ভারসাম্য থাকলেও অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও প্রার্থীদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। ৪৯ জনের মধ্যে ৪২ জনই উচ্চশিক্ষিত, যাদের মধ্যে এমএ, এমএসএস, এলএলবি, এমবিবিএস এবং ব্যারিস্টার ডিগ্রিধারী প্রার্থীরা রয়েছেন। মাত্র দুজন স্বশিক্ষিত প্রার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এটি নারীর শিক্ষাগত অগ্রগতির একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে।
রাজনৈতিক জোটভিত্তিক বিশ্লেষণে বিএনপি জোটের ৩৬ জন, জামায়াত জোটের ১২ জন এবং স্বতন্ত্র একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। বিএনপি জোটের মধ্যে ১৬ জন কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন, যা মোট প্রার্থীর প্রায় ৪৪ শতাংশ। তাদের অনেকের সম্পদ ২ কোটি থেকে ৬ কোটি টাকার মধ্যে, এমনকি কয়েকজনের সম্পদ আরও বেশি। অন্যদিকে জামায়াত জোটের ১২ জনের মধ্যে মাত্র একজন কোটিপতি। অধিকাংশের সম্পদ ২০ থেকে ৮০ লাখ টাকার মধ্যে সীমিত। এই বৈষম্য দুই জোটের অর্থনৈতিক প্রোফাইলে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করে।
জামায়াত জোটের প্রার্থীদের মধ্যে আয়করের বাইরে থাকা প্রার্থীর সংখ্যা পাঁচজন, যাদের মধ্যে এনসিপির মাহমুদা আলম মিতু অন্যতম। তার বয়স ৩৭ বছর এবং তিনি এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক। তার নামে কোনো মামলা নেই এবং তিনি তুলনামূলকভাবে স্বল্প সম্পদশালী হলেও স্বচ্ছ আর্থিক অবস্থান দেখিয়েছেন। একই জোটে তাসমিয়া প্রধান, নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, মারজিয়া বেগম, মাহফুজা হান্নান, রোকেয়া বেগমসহ আরও কয়েকজন প্রার্থী রয়েছেন, যাদের সম্পদ ও আয় সীমিত হলেও সামাজিক পেশাগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
বয়সের দিক থেকেও জামায়াত জোটের প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে সমবয়সী এবং ৩৭ থেকে ৬৮ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই শিক্ষক, আইনজীবী ও চিকিৎসক পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম, কারণ অনেকেই প্রথমবার সংসদীয় রাজনীতিতে আসছেন।
অন্যদিকে বিএনপি জোটের বেশির ভাগ প্রার্থী পেশাগত ও আর্থিক দিক থেকে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং পেশাজীবীদের উপস্থিতি রয়েছে। অনেকের ব্যাংক আমানত, জমি, ফ্ল্যাট, শেয়ার এবং বিপুল স্বর্ণালংকারের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে তাদের আর্থিক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
প্রার্থীদের সম্পদের ধরন বিশ্লেষণেও ভিন্নতা দেখা যায়। বিএনপি জোটে নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি এবং স্বর্ণালংকারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। জামায়াত জোটে এসব সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম এবং সীমিত সঞ্চয় ও স্থাবর সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি।
হলফনামায় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে বিএনপি জোটের প্রার্থীরা এগিয়ে। তাদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ এবং অতীতে সংসদ সদস্য বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন। জামায়াত জোটে তুলনামূলকভাবে নতুন মুখের আধিক্য রয়েছে, যারা এবারই প্রথম সংসদীয় পর্যায়ের ভোটে অংশ নিয়েছেন।
এদিকে গতকাল রবিবার ছিল প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে সংক্ষুব্ধদের আপিলের সুযোগ। এদিন বিএনপির প্রার্থী মাধবী মারমার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে ইসিতে আপিল করেছেন দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক চন্দ্রা চাকমা। তার অভিযোগ, মাধবী মারমা বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য পদ থেকে যথাযথভাবে পদত্যাগ না করেই জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যা আইনগতভাবে বৈধ নয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মাধবী মারমার দাবি, ২০ এপ্রিলই তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা পৌঁছে গেছে। পদত্যাগের বিষয়টি হলফনামায় উল্লেখ না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত ফরম্যাটে এ ধরনের তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা. আবুল মনসুর জানিয়েছেন, মাধবী মারমার স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্রটি ২৬ এপ্রিল তার কাছে পৌঁছেছে। ঘটনাটি নিয়ে নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।
অন্যদিকে এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন নিজের প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেছেন। পরে মনিরা শারমিন জানান, সরকারি চাকরিতে থাকাকালে তিনি এমন কোনো দায়িত্বে ছিলেন না, যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল। তাই এ কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়াকে তিনি অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তার আপিলের শুনানি আজ ২৭ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রার্থীদের হলফনামা রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন। বিএনপি জোটে অভিজ্ঞ ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রার্থীর আধিক্য রয়েছে, অন্যদিকে জামায়াত জোট তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও নবীন নেতৃত্বকে সামনে এনেছে। রাজনীতির মাঠে আসা এই নারীদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ তাদের।
ইসির তফসিল অনুযায়ী, দায়ের হওয়া আপিলগুলো নিষ্পত্তি হবে ২৮ এপ্রিল। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আপিলের নিষ্পত্তির পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা নির্ধারণ করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল, প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল। আর নির্বাচন হবে ১২ মে। তবে কোনো আসনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে বিদ্যমান প্রার্থীদেরই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।