দেশে আগের চেয়ে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বেড়েছে। তবে এখনো তাদের সংকট কাটেনি। প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব, ব্যাংকিং জটিলতা, প্রশিক্ষণের অভাব এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতাসহ বেশ কিছু সমস্যা এখনো রয়েছে। সমস্যার কারণে নারী উদ্যোক্তাদের অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ মাঝপথেই থেমে যাচ্ছে। অনেকে পরিকল্পনা করেও ব্যবসা শুরুই করতে পারছেন না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় সব ধরনের শিল্পের উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের দাম এবং পরিবহন খরচ ব্যাপক বেড়েছে। চাহিদামতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে উৎপাদনের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হচ্ছে। আর এতে নারী উদ্যোক্তারা বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নারী উদ্যোক্তারা অভিযোগ, সরকারের সব ধরনের নিয়মকানুন মেনেই তারা ব্যবসা করছেন। শুধু নারী বলে অনেক সুযোগ পাচ্ছেন না। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের ঋণ দিতে আস্থা পায় না। এটা এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৮৭.৯ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা মূলধন বা পুঁজির অভাবকে তাদের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জামানতবিহীন ঋণ প্রাপ্তিতে ব্যাংকিং জটিলতা, উচ্চ সুদের হার এবং নারীদের ব্যবসা নিয়ে ব্যাংকের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো বড় সমস্যা।
এ ছাড়া এখনো অনেক পরিবার নারীদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। যাতায়াতে নিরাপত্তাহীনতাও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নারী উদ্যোক্তারা।
আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই এসএমই খাতের। তারা বিভাগীয় শহরের বাইরে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে থাকেন। অল্প পুঁজির এসব নারী উদ্যোক্তার বেশির ভাগই নিজের সামান্য কিছু সঞ্চয় দিয়ে বা ধারদেনা করে ছোটখাটো একটা ব্যবসা শুরু করেন। অনেকে একাই ব্যবসা চালান। ব্যবসা বাড়তে থাকলে অনেকে কয়েকজন কর্মী নিযোগ করেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগেরই কারখানা ভাড়া করে ব্যবসা করার সক্ষমতা থাকে না। নিজের বাসাবাড়িতেই পণ্য তৈরি করেন। এসব নারীর আয়ের অর্থ সাধারণত তার পরিবারের পেছনে খরচ হয়ে যায়। তবে অনেক নারী উদ্যোক্তা ছোট আকারের কারখানা বা দোকান ভাড়া করে পণ্য উৎপাদন করেন। কাঁচামাল, কারখানার ভাড়া এবং পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে তাদের ব্যবসার মোট খরচও বেড়ে যায়। এতে মুনাফা কমে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা ও শিল্পে খরচ বেড়ে যাওয়ায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন উইমেন এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ওয়েব) প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়াল মিন্টু। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বা শিল্প চালিয়ে নিতে প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হয়। ১০ হাজারের বেশি নারী উদ্যোক্তা ওয়েবের সদস্য। সদস্যের মধ্যে বেশির ভাগই এসএমই উদ্যোক্তা, বড় মাপের উদ্যোক্তার সংখ্য কম। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে ওয়েবের সদস্য সব ধরনের নারী উদ্যোক্তা ভয়াবহ সমস্যায় পড়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে অল্প পুঁজির নারী উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার সংগ্রাম কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকের ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেকে এরই মধ্যে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, নারী উদ্যোক্তারা এমনিতেই অনেক সমস্যায় থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এখন তাদের সমস্যা আরও বেড়েছে। ব্যবসার বিভিন্ন উপকরণ ও খাতের খরচ বেড়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বাড়তি খরচের চাপ কীভাবে সামলাবেন? তাদের সেই সক্ষমতা নেই। ছোটদের কথা বাদ দিচ্ছি, বড়মাপের নারী উদ্যোক্তারাও একজন পুরুষ উদ্যোক্তার চেয়ে কম সুবিধা পেয়ে থাকেন। এটা আমাদের সামাজিক সমস্যা। এ সমস্যার বলি হচ্ছেন নারীরা।
এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বা ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের নিজেদের পর্যাপ্ত সঞ্চয় বা পারিবারিক মূলধন না থাকায় শুরুতেই বড় বাধার মুখে পড়তে হয়। নারী উদ্যোক্তারা ব্যাংক বা প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে আছেন। জামানতের অভাব ও অতিরিক্ত কাগজপত্রের জটিলতায় তারা ব্যাংক ঋণ পান না। নারীরা ব্যবসায় আসতে চাইলে এখনো অনেক পরিবার এবং সমাজ থেকে বাধা দেওয়া হয় বা নিরুৎসাহিত করা হয়। ব্যবসা পরিচালনা, বাজারজাতকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাদার জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে সীমিত পরিসরে প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও তা আবার সব নারী পাচ্ছেন না। ই-কমার্স বা এফ-কমার্সের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স ও নিবন্ধনের কড়াকড়ি নতুন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারী উদ্যোক্তাদের সংকট কমাতে এসএমই ফাউন্ডশনের প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোকে জামানতবিহীন এবং স্বল্প সুদে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা বাড়ানো, নারী উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনলাইন নারী উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি এবং ই-কমার্সের নিয়মকানুন সহজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্যের জন্য বিশেষ মেলা বা স্থায়ী বাজারের মাধ্যমে বিক্রির সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
সম্প্রতি এসএমই ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে নারী এসএমই উদ্যোক্তাদের বাজার সম্ভাবনা ও অর্থায়ন বৃদ্ধি’ শীর্ষক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী শিল্পোদ্যোক্তাদের বার্ষিক ঋণ চাহিদার ৬০ শতাংশই পূরণ করতে পারছে না ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
শহরের অনেক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়েও ব্যবসা করছেন। নারী ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের অনলাইন প্ল্যাটফরম উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম-‘উই’ থেকে জানিয়েছে, বর্তমানে এ প্ল্যাটফরমটিতে দেশি পণ্য নিয়ে কাজ করছেন এমন উদ্যোক্তার সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে। এসব নারীর অন্যতম সমস্যা পুঁজি। কোন ধরনের পণ্যের চাহিদা বেশি তা নির্ধারণেও তারা পিছিয়ে আছেন। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে অনলাইনে বিক্রি করা পণ্য বেশি দাম দিয়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে বিক্রি দামও বাড়াতে হয়েছে। এতে ক্রেতা কমেছে। অনেক নারী উদ্যোক্তা পুঁজিসংকটে পড়েছেন।
ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের মোট নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ নারী হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে তারা টিকতে পারছেন না। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে নারী উদ্যোক্তাদের সংকট বেড়েছে। তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের পর্যাপ্ত আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়া গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।