ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভের পর সেখানে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশিদের ‘পুশব্যাক’ করার বিষয়টি জোরেশোরে সামনে এসেছে। এবারের নির্বাচনে বিজেপির রাজনৈতিক ইস্যু ছিল অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো। নির্বাচনে জয়ী হয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ইস্যুতে তার কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
- অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো দিল্লির মূল লক্ষ্য
- দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাই করতে দিল্লির আহ্বান
- সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ
শুভেন্দু অধিকারী সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। এ জন্য ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্য সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে গেছে এবং সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। সে লক্ষ্যেই সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৫৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে ৫৬৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া বাকি রয়েছে।
পুশব্যাক
দেশটিতে অবৈধ বাংলাদেশিদের ‘পুশব্যাক’ নিয়ে সম্প্রতি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে একই সুরে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
তিনি জানান, এ বিষয়ে গত কয়েক দিন ধরে এ ধরনের মন্তব্য লক্ষ্য করছেন। তবে মূল বিষয় হলো, ভারতে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রত্যাবাসন। এই প্রক্রিয়া সফল করতে বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।
জয়সওয়াল আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের কাছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ২ হাজার ৮৬২টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে অনেক আবেদন পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এগুলো দ্রুত যাচাই-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো সহজ ও সুশৃঙ্খলভাবে করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাই-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করারও আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি, যাতে পরবর্তী পুশব্যাক-প্রক্রিয়া দ্রুত করা যায়।
দিল্লির একটি সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো। নির্বাচনে মমতার তৃনমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজেপি জয়ী হওয়ায় তাদের এই প্রতিশ্রুতি প্রথমেই সামনে এনেছে। আগামীতে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় অভিযান চালিয়ে ফেরত পাঠানো হতে পারে। এ জন্য অবৈধ বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব দ্রুত যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে দিল্লি, যাতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটাও দ্রুত করা যায়।
সূত্র আরও জানায়, অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দিল্লির ক্ষমতাসীন নেতৃত্বেরও সায় রয়েছে। অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর জন্য যদি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপও হয়, সে বিষয়টিও মেনে নিতে প্রস্তুত দিল্লি।
দিল্লির আরেকটি সূত্র জানায়, এই মুহূর্তে দিল্লির কোর ইস্যু হচ্ছে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো। এই কাজটি কখন থেকে কীভাবে শুরু হবে, সেটা বিজেপি সরকারের ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে, সেটা সময় বলে দেবে। এটা কতটা রাজনৈতিক হবে বা কতটা বাস্তবায়ন হবে, তাও এখন বলা সম্ভব নয়। তবে দিল্লির এখন প্রধান লক্ষ্য অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো, তিস্তা বা গঙ্গা চুক্তি নয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভের পর পুশব্যাক ইস্যুটি নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে জোর করে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের বের করে দেওয়া কোনো সভ্য দেশের কাজ হতে পারে না। এ ধরনের কাজ একটি জাতির অসভ্যতা প্রমাণ করে। অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি আন্তর্জাতিক নিয়ম আছে। এটা অনুসরণ করলে অভিনন্দন, তবে নাগরিকত্ব যাচাই না করে জোর করে পুশব্যাক কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জোর করে ফেরত পাঠানো হলে সেটা উভয় দেশের জন্যই ক্ষতিকর হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সীমান্তে সম্ভাব্য ‘পুশব্যাক’ নিয়ে গত সপ্তাহে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর এমন কোনো ঘটনা ঘটবে বলে তিনি আশা করেন না। তবে সীমান্ত পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও একই বিষয়ে মন্তব্য করেন। বিএনপির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বক্তব্যে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যদি সীমান্তে ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক লোক ঢোকানোর ঘটনা ঘটে, তাহলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।