সুদানের আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ- RSF) দাবি করেছে যে তারা অবরুদ্ধ শহর দারফুরের এল-ফাশেরে অবস্থিত সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর দখল করে নিয়েছে। এই ঘটনাকে দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গোষ্ঠীটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা সেনাবাহিনীর ষষ্ঠ ডিভিশন সদর দপ্তরে থাকা ‘বিশাল সামরিক যান’ ধ্বংস করেছে এবং সামরিক সরঞ্জাম জব্দ করেছে। সংবাদ মাধ্যম ‘বিবিসি ভেরিফাই’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত সেই ভিডিওগুলির সত্যতা নিশ্চিত করেছে, যেখানে আরএসএফ যোদ্ধাদের সেনাবাহিনীর ঘাঁটির ভেতরে দেখা যাচ্ছে।
এই সদর দপ্তর হারানোটা সরকারি বাহিনীর জন্য একটি বিশাল ধাক্কা। কারণ দারফুর অঞ্চলে এটিই সেনাবাহিনীর সর্বশেষ বড় ঘাঁটি ছিল, যার ফলে এই এলাকাটি কার্যকরভাবে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে চলে এলো। এ বিষয়ে সেনাবাহিনী এখনও কোনো মন্তব্য করেনি।
এল-ফাশেরের পরিস্থিতি
আরএসএফ গত ১৮ মাস ধরে এল-ফাশের শহরটিকে ঘিরে রেখেছে। সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং বেসামরিক নাগরিকরা সেখানে ঘন ঘন বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৩ লাখ মানুষ এই লড়াইয়ের মধ্যে আটকা পড়েছে। গত আগস্টে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গিয়েছিল, শহরটির চারপাশে মানুষকে ভেতরে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে মাটির বিস্তৃত প্রাচীর তৈরি করা হচ্ছে।
আরএসএফ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন দিক থেকে ষষ্ঠ পদাতিক ডিভিশন কমান্ডের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল, যা শহরটিতে সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত। শহরটির কিছু অংশ এখনও সেনাবাহিনী এবং তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, মনে করা হচ্ছে তারা আর বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারবে না।
অবিরাম বোমাবর্ষণ এবং খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রীর ঘাটতির কারণে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষুধা ও রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের সহযোগিতায় গণহত্যা
সুদানের ওই সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট ও গণমাধ্যমের প্রবেশ না থাকায় RSF এর গণহত্যার প্রমাণ বিশ্ব মিডিয়ায় আসছে না। গতকালও এল-ফাশেরে সেনা সদর ও শহর দখল করার পরে আমিরাত ও ইসরায়েল সমর্থিত RSF সশস্ত্র গোষ্ঠী বেসামরিক জনগণের উপর গণহত্যা চালিয়েছে।
সুদানের দারফুরের এল-ফাশেরে RSF বাহিনী মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য বিখ্যাত হাসাবাল্লাহকে হত্যা করেছে।
হাসাবাল্লাহ স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য, তিনি মূলত অবরুদ্ধ এলাকাগুলোতে খাদ্য ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতেন। সংঘাত বাড়লেও তিনি এলাকা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
সেই সঙ্গে RSF বাহিনী গতকাল শহরে প্রবেশের পর তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। RSF এর চোখে এই লোকগুলোর অপরাধ হলো, তারা অবরুদ্ধ ও অনাহারে থাকা মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দিয়েছিল। আর তাই এই অপরাধে এদেরকে গুলি করে হত্যা করেছে আরব আমিরাত সমর্থিত RSF বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
সুদানের অবরুদ্ধ এল-ফাশেরে থেকে চলে যাওয়ার সময় RSF বাহিনী আল জাজিরার সাংবাদিক মুয়াম্মার ইব্রাহিমকেও অপহরণ করেছে।
মুয়াম্মার ইব্রাহিম গত দুই বছর ধরে সংঘাতপূর্ণ দারফুর অঞ্চল থেকে রিপোর্ট করে আসছিলেন। তিনি নিয়মিতভাবে RSF বাহিনীর হামলা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তুলে ধরছিলেন।
সংঘাতের পটভূমি ও ভবিষ্যৎ
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা এল-ফাশের অবরোধের সময় আরএসএফের বিরুদ্ধে অসংখ্য মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলেছে যে আরএসএফ দারফুরের অ-আরব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে।
২০২৩ সাল থেকে সুদান ভয়াবহ সংঘাতে বিধ্বস্ত হচ্ছে, যখন আরএসএফ এবং সুদানি সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি মানুষ মারা গেছে এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
সেনাবাহিনী দেশের বেশিরভাগ উত্তর ও পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। এল-ফাশের ছিল দারফুরে সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্রদের হাতে থাকা সর্বশেষ প্রধান শহুরে কেন্দ্র। আরএসএফ প্রায় পুরো দারফুর এবং প্রতিবেশী কর্ডোফান অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
আরএসএফ সম্পূর্ণভাবে এল-ফাশেরের নিয়ন্ত্রণ নিলে, তারা সেখানে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার গঠন করার আশা করছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/