নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেন, গত ১০ দিনে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে তিনি বিচলিত। প্রধান তার পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পাঠিয়েছেন।
নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সিবিএসই-এর অন-স্ক্রিন মার্কিং প্রক্রিয়ায় অনিয়মের জন্য জবাবদিহির দাবিতে যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভের মধ্যেই প্রধানের পদত্যাগের খবর আসে। এর পাশাপাশি, পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক সংস্কারের দাবিও জানানো হয়।
এখানে তার চিঠির সম্পূর্ণ পাঠ দেওয়া হলো-
আমার তরুণ বন্ধুরা,
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি ছাত্র, শিক্ষক এবং শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করেছি। আমি সর্বদা বিশ্বাস করি যে, একটি বলিষ্ঠ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দূরদর্শী শিক্ষা ব্যবস্থাই একটি শক্তিশালী জাতির ভিত্তিপ্রস্তর।
আমি দেশের যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি এবং ন্যায্য প্রত্যাশাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। ভারতের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের একটি নৈতিক অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে জাতির সেবা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
তবে, ২০২৬ সালের ৩ মে অনুষ্ঠিত NEET-UG পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম প্রকাশ্যে আসে। বিষয়টি অবিলম্বে আমলে নিয়ে ভারত সরকার তদন্তের ভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দেয়, পরীক্ষাটি বাতিল করে এবং পুনঃপরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে। এ ছাড়াও, আগামী বছর থেকে এই পরীক্ষাটি সিবিটি (কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষা) পদ্ধতিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই পুরো সময়জুড়ে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ২০ লক্ষেরও বেশি ছাত্রছাত্রীর জন্য পরীক্ষাটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নিশ্চিত করা। কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি রাজ্য সরকারগুলোর- বিশেষ করে জেলা প্রশাসনগুলোর- সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি ‘সমগ্র সরকারি’ পদ্ধতির মাধ্যমে এটি অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় ২১ জুন, ২০২৬ তারিখে পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
প্রথম দিন থেকেই আমি সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছিলাম এবং পরিস্থিতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, কোনো মেধাবী ছাত্রছাত্রীর সম্ভাবনা যেন ‘পরীক্ষা মাফিয়াদের’ হাতে নষ্ট না হয় এবং কোনো ছাত্রছাত্রী যেন অবিচারের শিকার না হয়। ১৬ জুলাই ঘোষিত NEET-UG-এর ফলাফল সন্তোষজনক ছিল এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে আসা বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী সাফল্য অর্জন করেছে।
তবে, সেই সময়েও দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের পথে বাধা সৃষ্টি ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, যা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত করে।
আমাদের গণতন্ত্রের শক্তির ওপর আমার বরাবরই অটল বিশ্বাস রয়েছে এবং আমি তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। তারা শুধু ভারতের ভবিষ্যৎই নয়, বরং এক নতুন ও উন্নত ভারতের মশালবাহক, নির্মাতা এবং স্থপতিও বটে।
গত ১০ দিনের ঘটনায় আমি ব্যথিত। এটি আমার ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়। ভারতের যুবশক্তিই এই জাতির প্রকৃত শক্তি। আমি সংকল্পবদ্ধ যে, দেশের যুবকদের বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে পড়তে দেব না।
যন্তর মন্তর এবং সারা দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে- দেশবিরোধী শক্তি যাতে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা, একজনও ভারতীয় ছাত্রের ভবিষ্যৎ যাতে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করা এবং আমাদের সন্তানদের পড়াশোনায় সময় দিতে ও নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে- আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।
তার নির্দেশনা, আস্থা এবং অবিচল সমর্থনের জন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি মন্ত্রিপরিষদের আমার সব সম্মানিত সহকর্মী, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেই সকল ব্যক্তিকেও ধন্যবাদ জানাই, যাদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। জাতির সেবা আমার জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার; আমি এর প্রতি চিরকাল নিবেদিত থাকব।
ভগবান জগন্নাথের আশীর্বাদে ভবিষ্যতেও আমি ভারতমাতা, ওড়িশার জনগণ এবং দেশের যুবসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সর্বতোভাবে নিজেকে উৎসর্গ করে যাব।
আপনার,
ধর্মেন্দ্র প্রধান
সূত্র: এনডিটিভি