আমাদের শরীরের ডান ও বাম দিক সাধারণত একে অপরের প্রতিচ্ছবি হিসেবে মনে হয়। তবে পায়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। অনেক সময় দেখা যায়, এক পা অন্য পায়ের তুলনায় বড়। এমন কেন হয়?
নিউইয়র্ক ফুট অ্যান্ড অ্যাঙ্কেলের পডিয়াট্রিস্ট ড. কোরিন রেনে বলেন, ‘কারও পা কখনো একেবারে একই মাপের হয় না। আমাদের শরীর মোটামুটি সিমেট্রিক্যাল বা প্রতিসম, তবে পুরোপুরি প্রতিসম নয়।’
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই বৈসাদৃশ্য মোটেও বিরল নয়। ১৯৮৩ সালে ৪ হাজার নারী ও ২ হাজার ৮০০ পুরুষের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, কারও পায়ের মাপ বা আকৃতি হুবহু এক নয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের সাতরা (SATRA) বুলেটিন নামক প্রকাশনায় প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ২ হাজার ৮৯০ জনের পায়ের মাপ বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ১৯ শতাংশ মানুষের পায়ের দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪ মিলিমিটার বা তার বেশি পার্থক্য রয়েছে। এটি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মাপ অনুযায়ী প্রায় অর্ধেক জুতার সাইজ।
গবেষণাটিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। চীনে কমপক্ষে ২৪ শতাংশ মানুষের মধ্যে পায়ের দৈর্ঘ্যে ৪ মিলিমিটারের বেশি পার্থক্য রয়েছে। এই বৈসাদৃশ্য স্বাভাবিক হলেও এটি কেন হয়? জানতে হলে শারীরবৃত্তীয় কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে।
ডান পা বড় নাকি বাঁ পা?
পায়ের আকারের পার্থক্য নিয়ে গবেষকদের মধ্যে স্পষ্ট কোনো ঐকমত্য নেই। কিছু গবেষণা বাম পা বড় হওয়ার কথা বললেও অন্য গবেষণাগুলোতে ডান পা বড় হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আবার কোনো কোনো গবেষণা অনুযায়ী, দুই পায়ের মধ্যে যেকোনোটির বড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর লিবার্টি টাউনশিপে সেন্টার ফর ফুট কেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের বাঁ পা ডান পায়ের চেয়ে বড় হয়। লন্ডনের সিটি করাপোডি অ্যান্ড পডিয়াট্রিও একই মত পোষণ করে। তাদের তথ্যমতে, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ডানহাতি হওয়ার কারণে শরীরের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাঁ পা বেশি ব্যবহৃত হয়। ফলে বাঁ পা সামান্য বড় হয়ে যায়।
১৯৮৩ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সাধারণত ধরে নেওয়া হয় বাঁ পা ডান পায়ের চেয়ে বড় হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ব্যক্তির ডান বা বাঁ পা বড় হওয়ার সম্ভাবনা সমান। অন্যদিকে ২০১৮ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ নারী ও ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষের ডান পা বাঁ পায়ের চেয়ে লম্বা হয়।
মানবদেহে কিছু অপ্রতিসাম্যতা স্বাভাবিক ভিন্নতার কারণে হয়ে থাকে। ড. কোরিন রেনের মতে, ‘আমাদের হাত পুরোপুরি প্রতিসম নয়, আমাদের চোখও নয়। একইভাবে পায়ের মাপেও পার্থক্য দেখা যায়।’ পায়ের মাপের এই ভিন্নতা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি এর পেছনে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কিছু শারীরিক কার্যকলাপও ভূমিকা রাখে।
পায়ের মাপের পার্থক্যের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। শারীরিক গঠন থেকে শুরু করে জীবনের বিশেষ সময়ে শরীরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন সবকিছু এর জন্য দায়ী।
নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার সময় বা পরবর্তী সময়ে পায়ের মাপে পার্থক্য দেখা দিতে পারে। রেনের মতে, ‘গর্ভাবস্থায় লিগামেন্ট ল্যাক্সিটির কারণে শরীরের জয়েন্টগুলো বেশি নমনীয় হয়ে যায়। এতে পায়ের মাপে ভিন্নতা আসতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি শরীরের একদিকে বেশি ভর দেন, তখন এক পা বড় হতে পারে। এই পরিবর্তন অনেক সময় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, আবার অনেক সময় তা স্থায়ী হয়ে যায়।’
কিছু জন্মগত অবস্থাও পায়ের মাপ ভিন্ন হওয়ার কারণ হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. জ্যাকব উইনেস জানান, ‘যদি কেউ ক্লাব ফুট নিয়ে জন্মান, তবে সেই পুরো অঙ্গটি অন্য পাশের তুলনায় ছোট হতে পারে।’
উইনেস উল্লেখ করেন, ব্র্যাকাইমেটাটারসিয়া ও ব্র্যাকাইমেটাপডি হলো এমন অবস্থা, যেখানে একটি পায়ের একটি বা একাধিক আঙুল ছোট হতে পারে। আবার ডিজিটাল হাইপোপ্লাসিয়ার মতো অবস্থায় আঙুল অপরিপূর্ণ বা কম বিকশিত থাকতে পারে।
এসব কারণেই আমাদের পায়ের মাপে পার্থক্য থাকে। এটি শারীরিক বৈচিত্র্যের একটি স্বাভাবিক অংশ, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে তেমন কোনো বড় সমস্যার কারণ হয় না। তবে যদি এই পার্থক্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শৈশবে আঘাতজনিত কারণে পায়ের মাপ ভিন্ন হতে পারে, বিশেষ করে যখন হাড়ের বৃদ্ধি চলমান থাকে। সেন্টার ফর ফুট কেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে প্লাস্টার পরলে পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে ছোট হয়ে যেতে পারে। লন্ডনের সিটি করাপোডি অ্যান্ড পডিয়াট্রি জানিয়েছে, এক পা অধিক ব্যবহার করাও পায়ের গঠনে পার্থক্য আনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যালে নৃত্যশিল্পীরা এক পায়ের মাংসপেশি বেশি ব্যবহার করেন। এতে পায়ের পেশিগুলো মোটা হয়ে যেতে পারে। ফলে পায়ের গঠন পরিবর্তিত হতে পারে।
ড. জ্যাকব উইনেস বলেন, ‘যদি এটি দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে বা অসহনীয় ব্যথার কারণ হয়, তবে সার্জারি করা হতে পারে। হাড় কাটার মতো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যথাক্রমে হাড় লম্বা বা খাটো করা যায়। সাধারণত ২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পরিবর্তন সহনীয় হয়।’
সাধারণত পায়ের মাপের এই পার্থক্য তেমন বড় সমস্যা নয়। তবে জুতা কেনার সময় কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বড় পায়ের মাপে জুতা কিনে ছোট পায়ের জন্য পডিয়াট্রিস্ট বা অর্থোটিস্টদের তৈরি কাস্টম ফিলার ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ফিলারগুলো জুতার আকার ঠিক করতে সাহায্য করে।
অন্য একটি সমাধান হলো দুই ভিন্ন মাপের জুতা কেনা। বিশেষ দোকানগুলোতে আলাদা আলাদা মাপের জুতা কিনতে পাওয়া যায়। এটি পায়ের আরাম নিশ্চিত করে।
পায়ের মাপের পার্থক্য সাধারণত অস্বাভাবিক নয় এবং এটি ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। সঠিক যত্ন ও চিকিৎসকের পরামর্শের মাধ্যমে এটি দৈনন্দিন জীবনে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না।


