একাত্তরের ৪ মার্চ গণমাধ্যমের ইতিহাসে নানা ঘটনা ঘটে। এদিন রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’ এবং পাকিস্তান টেলিভিশন ‘ঢাকা টেলিভিশন’ হিসেবে সম্প্রচার শুরু করে। একটি সভা থেকে এদিন সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ওপর ইতোমধ্যে যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ‘স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার না দিলে সাংবাদিকরা বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন না।’ এদিকে বেতার-টেলিভিশনের শিল্পীরা ঘোষণা করেন, যতদিন পর্যন্ত দেশের জনগণ ও ছাত্রসমাজ সংগ্রামে লিপ্ত থাকবেন ততদিন পর্যন্ত ‘বেতার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তারা অংশ নেবেন না।’
এদিন করাচি প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান দেশকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।
ওই সময়ের পত্রপত্রিকা ও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
পত্রপত্রিকা সূত্রে জানা যায়, একাত্তরের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চট্টগ্রামে ১২০ ও খুলনায় সাতজনকে হত্যা করে। এদিন ছাত্রলীগ ও ডাকসু আহ্বান জানায়, ৬ মার্চের মধ্যে ঢাকা শহরে এবং ৭ মার্চের মধ্যে সারা দেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন সম্পন্ন করতে হবে। প্রতিটি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ১ জন আহ্বায়ক ও ১০ জন সদস্য থাকবেন। এই আহ্বানে এগিয়ে আসে অন্যান্য দল। শিক্ষকরাও সভা করার প্রস্তুতি নেন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ঘটনাপ্রবাহ দৈনিক বাংলা পরের বছর ১৯৭২ সালের মার্চ মাসজুড়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে। ধারাবাহিকে ৪ মার্চ প্রসঙ্গে লেখা হয়, ঢাকা ও সব প্রদেশে সর্বাত্মক হরতাল পালন হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার জমায়েত শপথের মধ্য দিয়ে বাংলার মুক্তি আন্দোলন ধাপে ধাপে এগোতে থাকে। ঘরে ঘরে প্রস্তুতির ডাক দেন বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন ডাক দিলেন, যেকোনো মূল্যে মুক্তিসংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। প্রস্তুত থাকতে হবে ঘরে ঘরে। শোষণ ও ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি নারী-পুরুষ যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছে তা দেখে তিনি সবাইকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, আত্মত্যাগ ছাড়া মুক্তি আসবে না। কাজেই যেকোনো মূল্যে মুক্তিসংগ্রাম চালিয়ে যেতেই হবে।
সব শ্রেণির মানুষ এসেছে সংগ্রামে। এগিয়ে এসেছে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র। রাজনীতিকদের সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকরা। বেতার-টিভি শিল্পীরা এদিন থেকে বর্জন করেছেন অনুষ্ঠান। সার্বিক মুক্তি আদায়ের গণ-আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে সাংবাদিক ইউনিয়ন। মিছিল ও সমাবেশের আয়োজনও করেছে তারা।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইটে এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা ও গণহত্যার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ঢাকাসহ সারা বাংলায় সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। প্রদেশের বেসামরিক শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
হরতাল চলাকালে খুলনায় সেনাবাহিনীর গুলিতে ছয়জন শহিদ হন। চট্টগ্রামে দুই দিনে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১২১ জনে।
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের পর স্বাধিকার আন্দোলনে গুলিতে আহত মুমূর্ষু বীর সংগ্রামীদের প্রাণ রক্ষার্থে শত শত নারী-পুরুষ ও ছাত্রছাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ব্লাড ব্যাংকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, চরম ত্যাগ স্বীকার ছাড়া কোনো দিন কোনো জাতির মুক্তি আসেনি। তিনি উপনিবেশবাদী শোষণ ও শাসন অব্যাহত রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় বীর জাতিকে অভিনন্দন জানান।
আওয়ামী লীগপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫ ও ৬ মার্চ সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যেসব সরকারি ও বেসরকারি অফিসে কর্মচারীরা এখনো বেতন পাননি, শুধু বেতন প্রদানের জন্য সেসব অফিস বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।’
পিডিপিপ্রধান নূরুল আমীন এক বিবৃতিতে ১০ মার্চ রাজনৈতিক নেতাদের সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে প্রেসিডেন্টের প্রতি অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঢাকায় আহ্বান করার দাবি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫ জন শিক্ষক পৃথক পৃথক বিবৃতিতে ঢাকার ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার গণবিরোধী ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জেড এ ভুট্টো করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশের সংহতির জন্য তার দল যদ্দুর সম্ভব ৬ দফার কাছাকাছি হওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের বিস্ফোরোন্মুখ পরিস্থিতির অবসানের জন্য তিনি এখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে রাজি হবেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে ভুট্টো বলেন, ‘ঘটনা দ্রুত ঘটছে। এ সম্পর্কে অবহিত করার জন্য আমরা সাংবাদিকদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করব।’