পরের দিন ৭ মার্চের ভাষণে কী ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান–এই নিয়ে আগের দিন একাত্তরের ৬ মার্চ সব মহলে ছিল নানামুখী আলোচনা। এদিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুপুরে এক বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।
এই দুটি বিষয় নিয়ে তখন বিভিন্ন মহল থেকে নানা দাবি জানানো হয়, মন্তব্য করা হয়। এক বিবৃতিতে এদিন ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতারা ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) থেকে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাংলাদেশের সব বেতার কেন্দ্রে সরাসরি সম্প্রচারের দাবি জানান। এদিকে ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণের পর পরই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। আবার কোনো কোনো মহল থেকে তার অধিবেশন আহ্বানকে স্বাগত জানানো হয়।
ইয়াহিয়া খান এদিন লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ওই সময়ের পত্র-পত্রিকা, রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১ এর দশমাস’ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
একাত্তরের ৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়। তারই নির্দেশে দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক এবং যেসব বেসরকারি অফিসে এর আগে বেতন দেওয়া হয়নি সেসব অফিস বেতন দেওয়ার জন্য খোলা থাকে। এদিন ঢাকায় ষষ্ঠ দিনের মতো হরতাল পালিত হয়। হরতাল পালনকালে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
একাত্তরের ৬ মার্চ বেলা ১১টার দিকে সেন্ট্রাল জেলের গেট ভেঙে ৩৪১ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। জেল থেকে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে ৭ জন কয়েদি নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়।
এদিন ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা ভাষণে বলেন, ‘যাই ঘটুক না কেন যতদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রয়েছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান রয়েছি ততদিন পর্যন্ত আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করব।’
তার ভাষণের পর পরই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখার ওয়ার্কিং কমিটির এক যুক্ত জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এই বৈঠক। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের আলোকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এই ভাষণকে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো স্বাগত জানান। ভুট্টো এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তার দল ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনের আগেই আলোচনার মাধ্যমে শাসনতন্ত্রের মোটামুটি একটি কাঠামো স্থির করতে চায়।
এদিন এক সাক্ষাৎকারে মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল নূর খান বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ-শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সব বাধা অবিলম্বে দূর করতে হবে। ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণে পরিস্থিতি অবনতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর দোষারোপ করায় নূর খান দুঃখ প্রকাশ করেন।’
পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রধান খান আবদুল কাইয়ুম খান অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানান। অভিনন্দন জানানো বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পিডিপি প্রধান নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ দৌলতানা ইয়াহিয়া খানের ঘোষণাকে স্বাগত জানান।
একাত্তরের এই দিনে ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম জানান, ভারতের ওপর দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে।