১৯৭১ সালের ১১ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের এক উত্তাল দিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে গণ-আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা এই দিনে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়।
এই দিনটি ছিল মূলত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি বাঙালির চূড়ান্ত অবাধ্যতা এবং স্বাধিকার আন্দোলনের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এই দিনে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি-আধা সরকারি অফিস, আদালত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি বন্ধ থাকে। কর্মচারীরা কাজে যোগ না দিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। ঢাকাসহ সারা দেশে আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল ও সমাবেশ চলতে থাকে।
১ মার্চ থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় যে, যতদিন পর্যন্ত না বাঙালির দাবি মানা হবে, ততদিন কেউ কোনো খাজনা বা ট্যাক্স প্রদান করবে না। এটি ছিল পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বঙ্গবন্ধু এই দিনে কিছু ব্যাংকিং শিথিলতা ঘোষণা করেন। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ব্যাংকগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে শর্ত ছিল যে কোনো টাকা যেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার না হতে পারে।
এই দিনটি সাংস্কৃতিক জাগরণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পী-কলাকুশলীরা সামরিক সেন্সরশিপের প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনের সমর্থনে সভা করেন এবং বুদ্ধিজীবীরা বাঙালির স্বাধিকারের পক্ষে বিবৃতি দেন।
একদিকে যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে, অন্যদিকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ১১ মার্চ দেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক বাহিনীর গুলিতে বেশ কয়েকজন বাঙালি শহিদ হন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। কারফিউ জারি করা হলেও মানুষ তা অমান্য করে রাস্তায় নেমে আসে।
পূর্ব পাকিস্তানের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি বিশ্ব গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পেতে শুরু করে। যুক্তরাজ্যের ‘দ্য টাইমস’ এবং ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় বাঙালির এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহকে ‘অপ্রতিরোধ্য’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বিদেশি সাংবাদিকরা ঢাকার রাজপথের এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে অভিভূত হন।