কোনো এক হেমন্তকালের কথা। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার উদ্দেশে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। হরিরামপুরের দিকে যেতে যেতে রাস্তার দুপাশে বেশ কয়েকটি মুন ফ্লাওয়ারের ঝোপ চোখে পড়ল। রাস্তার পাশের বুনো ঘাসগুলোর মধ্যে কানশিরা ফুলগুলো নীলরত্নের মতো জ্বলজ্বল করছিল। ভোরের শিশির পেয়ে সেগুলো চকচক করছে। কিছু মাঠে আমন ধান কাটা হচ্ছিল। গাড়ি থেকে নেমে এসব শোভা দেখতে দেখতে চোখ পড়ল একটি ঘাসফড়িংয়ের দিকে।
এর পরের বছর মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে গিয়ে একই ঘাসফড়িংয়ের দেখা পেলাম। ঘাসফড়িংটি আমগাছে জন্মানো কিছু অর্কিড পাতার ওপর বসে ছিল।
ঘাস খায় বলে এসব ফড়িংদের বলে ঘাসফড়িং। এরা সাধারণত সবুজ রঙের হয়। গায়ের রংকে কাজে লাগিয়ে ছদ্মবেশ ধরে এরা ঘাসের সঙ্গে মিশে থাকে, যাতে শত্রু বা পাখিরা ওদের সহজে খুঁজে না পায়। কিন্তু এই বোকা ঘাসফড়িংয়ের রং আলাদা। এর রং খয়েরি-ধূসর, গাঢ় খয়েরি ছোপছাপ ধরা শরীর। সে জন্য এদের বলা হয় খয়রা দাগি ঘাসফড়িং। এদের ইংরেজি নাম ব্রাউন স্পটেড গ্রাসহপার। এরা আকারেও বেশ বড়। শুঁড়গুলো খাটো। তাই এদের ‘খাটো শুঁড় ঘাসফড়িং’ বলেও ডাকা হয়। লম্বা শুঁড়ের কিছু ঘাসফড়িংও আছে, যেগুলো সাধারণত পাতা খায় না, তারা প্রাণিভুক। কিন্তু খাটো শুঁড় ঘাসফড়িংরা তৃণভোজী। এদের বাচ্চা ও প্রাপ্তবয়স্করা সব সময়ই গাছের পাতা খায়।
ঘাসফড়িং বেশ রাক্ষুসে স্বভাবের। এরা ধান, গম, সবজি ও ঘাসজাতীয় আগাছা খায়। পাতার মাঝখানের শিরা তুলনামূলকভাবে শক্ত থাকায় ঘাসফড়িং প্রথমে পাতার কিনারা থেকে আঁকাবাঁকাভাবে খাওয়া শুরু করে। পত্রফলক খাওয়া শেষ হলে তারা শিরাগুলোও খেয়ে ফেলে। এদের দলবদ্ধ আক্রমণে সম্পূর্ণ গাছই শেষ হয়ে যায়। পঙ্গপাল বা লোকাস্টরা এর আরও এক স্বগোত্রীয় ভাই। পঙ্গপাল এক খেতের ফসল সাবাড় করে ঝাঁক বেঁধে উড়ে অন্য খেতে চলে যায়। এমনকি খাবারের খোঁজে এরা ঝাঁক বেঁধে অন্য দেশেও চলে যায়।
অ্যাক্রিডিডি গোত্রের এই ঘাসফড়িংয়ের দেহ লম্বা ও কিছুটা চ্যাপ্টা। এদের মাথা ফিকে বাদামি রঙের। পাখা দেহের চেয়ে লম্বা। পুরুষের চেয়ে স্ত্রী ঘাসফড়িংয়ের দেহ কিছুটা বেশি লম্বা। পেছনের পা দুটির ঊরু মোটা ও বাইরের পিঠে ২ থেকে ৩টি ডোরাকাটা দাগ থাকে। পেছনের পা দুটি খুবই শক্তিশালী। এ পা দুটির ওপর ভর করে সে দ্রুত লাফ দিয়ে সরে পড়তে পারে। আবার দরকার হলে ডানা দিয়ে উড়তেও পারে। এদের পিঠে একটি সুষ্পষ্ট কালো ত্রিভূজাকার চিহ্ন দেখা যায়। সামনের পায়ের ঊরু ফ্যাকাশে ধূসর-বাদামি ও সরু। শুঁড় দুটি সোজা, খাটো ও কাঠির মতো।
জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এদের বেশি দেখা যায়। মিলন বা প্রজননের জন্য এরা প্রথমে সখ্য স্থাপনের চেষ্টা করে। বিশেষ করে মিলনের সাধ জাগলে পুরুষ ঘাসফড়িং বিশেষ ভঙ্গিতে মাথা ঘোরায়। পাগুলো নাচের ভঙ্গিতে নড়াচড়া করে ও পা বা ডানা ঘষে এক বিশেষ ধরনের শব্দ করে, যা শুনতে ‘কিচিরমিচির ও টিকটিক’ শব্দের সংগীতের মতো শোনায়। তৃণভূমির ভেতরে এ রূপ নৃত্য-সংগীত প্রদর্শনের মাধ্যমে পুরুষ ঘাসফড়িং মেয়ে সঙ্গীকে আকৃষ্ট করে। সঙ্গী সাড়া দিলে তারা মিলন করে। স্ত্রী ফড়িংও এক বিশেষ ধরনের শব্দ করে পুরুষকে তার সম্মতির কথা জানায়।
মিলনের পর স্ত্রী ঘাসফড়িং অন্তঃসত্ত্বা হয়। এরপর মাটি খুঁড়ে সেখানে ডিম পাড়ে। পরে সেটি মাটি বা ময়লা দিয়ে ঢেকে দেয়। ডিম ফুটে কয়েক দিনের মধ্যে বাচ্চা বা নিম্ফ বেরিয়ে আসে। যতটি ডিম পাড়ে, সাধারণত তার অর্ধেক ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চা বা নিম্ফগুলোর ডানার চেহারা দেখে বোঝা যায় যে সে বৃদ্ধির কোন দশায় আছে। বাচ্চাদের কখনো প্রাপ্তবয়স্কদের মতো পূর্ণাঙ্গ ডানা হয় না। পাঁচবার খোলস বদলানোর পর সেগুলো সাবালক হয়। ডিম, নিম্ফ ও প্রাপ্তবয়স্ক এই তিনটি স্তরে এদের জীবনচক্র সম্পন্ন হয় বলে এদের জীবনচক্রকে বলা হয় অসম্পূর্ণ রূপান্তর।
বাচ্চা ও সাবালক, বুড়ো-বুড়ি সবাই পাতা ও ঘাস খায়। খাদ্য ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে এদের জীবনকাল কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত হয়। সারা বিশ্বে ১০ হাজারের বেশি ঘাসফড়িংয়ের প্রজাতি আছে। বাংলাদেশে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১২৮ প্রজাতির ঘাসফড়িং তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ