বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন সবসময়ই জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর একটি মৌলিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু এ দেশের মানুষ একাধিকবার প্রত্যক্ষ করেছে নির্বাচনি প্রহসন, ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট ও সহিংসতার মতো ঘটনা। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন, কার্যক্রম এবং বৈশিষ্ট্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যারা যখনই ক্ষমতায় থেকেছে তারা তখনই তাদের মতো করে নির্বাচন পরিচালনার চেষ্টা করেছে। লক্ষ্য ছিল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা। অবশ্য রাজনীতিতে ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ কৌশল চালাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি নেতিবাচক পথে কিংবা প্রক্রিয়ায় হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করা যায় না।
১৯৯০ সাল-পরবর্তী সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রায় আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তা প্রত্যাশিত মাত্রায় মসৃণতা লাভ করেনি। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপনির্বাচন এবং স্থানীয় পর্যায়ের অসংখ্য নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এমনকি এ-সংক্রান্ত রাজনৈতিক বিরোধ বাংলাদেশে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। ক্রমেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি অনেক সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, যেখানে তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে নির্বাচন আয়োজন পর্যন্ত বেশ কিছু কার্যক্রমের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। কাগজে-কলমে এ রোডম্যাপ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও বাংলাদেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে এটি কার্যকর করতে গেলে বিপুল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এবারের নির্বাচন আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। সিইসি সম্প্রতি বলেন, ‘নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আরও অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। যেকোনো ধরনের নতুন চ্যালেঞ্জ আসলে সেটা মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের মূল কথাই থাকবে পেশাদারিত্ব, পেশাদারিত্ব এবং পেশাদারিত্ব। নিরপেক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং নিরপেক্ষতা। ১০০ ভাগ আইন মেনে কাজ করতে হবে।’
বর্তমান পরিস্থতি বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকটের মেঘ পুরোপুরি কেটে যায়নি। তবে পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনের টকশো, গোলটেবিল, সভা-সেমিনার- সর্বত্রই এখন আলোচনার প্রধান বিষয় নির্বাচন। দু-একটি রাজনৈতিক দল এখনো কিছু শর্ত দিচ্ছে এবং শর্ত পূরণ না হলে নির্বাচন বর্জন করার হুমকি দিচ্ছে। এগুলোকে অবশ্য রাজনৈতিক সুবিধা আদায় বা দর-কষাকষির কৌশল হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। মূল স্রোতের রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাই ও অন্যান্য নির্বাচনি প্রস্তুতির পাশাপাশি রাজনৈতিক জোট গঠনে এখন অনেক বেশি তৎপর লক্ষ করা যাচ্ছে। এমন নানা ধরনের মত-ভিন্ন মত এবং অনৈক্য পরিস্থিতি আমাদের ক্রমেই শঙ্কিত করে তুলছে। যেসব রাজনৈতিক দল বর্তমানে মাঠে নেই, তারা তো এমনিতেই বিদ্যমান মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে আছে। আর যেসব দল মাঠে সরব রয়েছে তারা যদি নিজেরা কোনো বিষয়ে একমত না হয়ে বিভেদ তৈরি করতে থাকে তাহলে রাজনীতির সংকট আরও বাড়তে পারে- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই সবার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এ বিষয়ে নতুন করে কোনো প্রশ্ন তৈরি হোক- সেটি কেউই চায় না। নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে তারাই চালাবে পাঁচ বছর। সেই পাঁচ বছরে যদি তারা ব্যর্থ হয়, না পারে, আবার নির্বাচন হবে। নির্বাচনে জনতা তাদের বাদ দিয়ে দেবে, অন্য দলকে দেবে। কাজেই এ বিষয়ে কোনো তর্কবিতর্ক স্থায়ী হওয়া উচিত নয়। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটাই স্থায়ী বিতর্ক। কেউ ক্ষমতায় গেলে পরবর্তীতেও কীভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা যায় সেটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রবণতা হিসেবে আমরা লক্ষ্য করেছি। এ কারণেও একদল অন্য দলের প্রতি আস্থা রাখতে পারে না। ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রবণতা এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রবণতা স্থায়িত্ব পেত তাহলে এ শঙ্কা ক্ষমতার পালা বদলের রাজনীতি ন্যায্য এবং কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠত। এমনকি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার নিশ্চয়তা না পেলে নির্বাচন বর্জনের প্রবণতাও বাংলাদেশে পুরোনো এক সংস্কৃতি হিসেবে অনেকটা স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। এসব কিছুর ঊর্ধ্বে ওঠার এখনই সময় এসেছে। দেশের সব রাজনৈতিক দলকে যথাযথ গণতান্ত্রিক কমিটমেন্ট সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
আগামী নির্বাচনে যদি সত্যিই ফেব্রুয়ারিতে হয়, তাহলে সামনের সময়টা খুবই কম। এমনকি যে সময় আছে তা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, আর এ ক্ষেত্রে বহুমুখী সংকট থেকেই যাবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। খালি চোখে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য দেখতে পাচ্ছি না।
বাংলাদেশের তরুণ ভোটাররা নির্বাচনের অন্যতম বড় শক্তি। তাদের প্রত্যাশা উন্নত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুযোগ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। কিন্তু রাজনীতির মূল স্রোতে তাদের চাহিদা প্রতিফলিত হয় না বললেই চলে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তরুণদের কেবল প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে না। অথচ তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছাড়া জন-আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে যদি শুধু একটি ভোটাধিকার কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে তা মানুষের গভীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে না।
এমনকি সুশীল সমাজ, নাগরিক সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে। গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা নির্বাচনি অনিয়ম উন্মোচনে সহায়তা করতে পারে। যদি নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছভাবে কাজ করে এবং রাজনৈতিক দলগুলো ন্যূনতম আস্থার ভিত্তিতে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, তবে এ নির্বাচন একটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে আশঙ্কার জায়গাও আছে। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো যদি তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা না করে এবং নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে নির্বাচন আবারও বিতর্কিত হয়ে পড়তে পারে। তখন জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হবে, যা ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করবে। একইভাবে, নির্বাচনি সহিংসতা ও অর্থের প্রভাব যদি রোধ করা না যায়, তবে সাধারণ ভোটারদের অংশগ্রহণ কমে যাবে। ভোটাররা যদি মনে করেন তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই, তবে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন অসম্ভব হয়ে উঠবে।
জন-আকাঙ্ক্ষার নির্বাচনের মূল শর্ত হলো অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র। জনগণকে শুধু ভোট দেওয়ার জন্য ডাকা হবে, আর তাদের মতামত ও দাবি উপেক্ষিত হবে- এটি জনগণ আর মেনে নেবে না। তাই প্রয়োজন নির্বাচনি সংস্কার। প্রার্থিতা যাচাই, স্বচ্ছ সম্পদ ঘোষণা, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নির্বাচনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ- এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে, যাতে জনগণ দেখতে পায় তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতাও এখানে অপরিসীম। তারা যদি শুধু ক্ষমতা দখল বা ধরে রাখার রাজনীতি চালিয়ে যায়, তবে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না। প্রয়োজন সমঝোতা, সংলাপ ও আপস। একে অপরকে শত্রু ভেবে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও তরুণ প্রজন্ম চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য হয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে।
অবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি ভোটাভুটি নয়, বরং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের একটি সুযোগ। এ সুযোগ কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি শক্তিশালী ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতে পারবে। আর যদি রাজনৈতিক বিভাজন ও অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙা না যায়, তবে এ নির্বাচনও জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হবে। তাই নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। জন-আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন কোনো কাগুজে স্লোগান নয়; এটি জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশার এক বিশাল পরীক্ষা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে, তা হবে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
.jpg)
