বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি দর্শনের মহানায়ক লালন ফকির আমাদের মনোজগতের এক অবিস্মরণীয় নাম। ১লা কার্তিক ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৯ নভেম্বর ২০২৪ মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির ১৩৪তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে কালীগঙ্গা নদীর তিরে বসেছে মিলনমেলা, মনের মানুষের সন্ধান পাওয়ার মিলনমেলা। মুলত ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর বা ১লা কার্তিকের পর থেকে এই নির্ধারিত দিনে এই স্মরণোৎসবের প্রচলন শুরু হয় যা আজও চলমান। লিখিতভাবে বাউল মতবাদ বা বাউল দর্শনের গোড়াপত্তন হয়েছিল মূলত ১৬৫০ সালের পর অর্থাৎ সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদ, নিত্যনান্দপুত্র বীরভদ্রের বাউল সাধনা ও চর্যার মধ্যদিয়ে।
মানবতার মহান সাধক মহাত্মা ফকির লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০) যার জন্ম, সৃষ্টি, সাধনা ও প্রচার-প্রসারের মধ্যদিয়ে বাউল দর্শন বা বাউল গান পরিপূর্ণতা লাভ করে অবশ্যই উচ্চারিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়। বাউল গান, বাউল সাধক ও তাদের চর্চার কথা উল্লেখ করতে গেলে আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্চাপদের কবি ও তাঁদের সৃষ্ট পদের কথা উল্লেখ করতেই হবে। চর্যাপদের প্রথম কবি লুইপা তাঁর প্রথম পদে বলছেন-
কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ॥
সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই॥
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপাখ ভিতি লেহু রে পাস॥
ভণই লুই আম্হে ঝানে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিণ্ডি বইঠা॥
অনুবাদ
শরীরের গাছে পাঁচখানি ডাল–
চঞ্চল মনে ঢুকে পড়ে কাল।
দৃঢ় করে মন মহাসুখ পাও,
কী-উপায়ে পাবে গুরুকে শুধাও।
যে সবসময় তপস্যা করে
দুঃখে ও সুখে সেও তো মরে।
ফেলে দাও পারিপাট্যের ভার,
পাখা ভর করো শূন্যতার–
লুই বলে করে অনেক ধ্যান
দেখেছি, লভেছি দিব্যজ্ঞান।
চর্যার প্রথম পদ পাঠের পর এটি দিবালোকের মত পরিষ্কার চর্যার কবিগণ দেহতত্ত্ব জ্ঞান অর্জন করে দেহ সাধনায় নিজেদের নিমগ্ন রাখতেন।
চর্যাপদকে আজকের যুগে পড়বো কেন- এই প্রশ্ন যদি মনে জাগে, তাহলে তার উত্তর এই হবে বাংলা ভাষার গঠনের ইতিহাস ও পরম্পরার প্রকৃত সূত্রটি জানতে হলে এই আত্মপ্রচার সর্বস্ব যুগে চর্যাপদের প্রকৃত পাঠ আবশ্যক।
‘বৌদ্ধ গান ও দোহা’-র মুখবন্ধে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছিলেন- “এই সকল উচু অঙ্গের ধর্মকথার ভিতরে একটা অন্যভাবের কথাও আছে। সেটা খুলিয়া ব্যাখ্যা করিবার নয়। যাহারা সাধনভজন করেন,তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই। আমরা সাহিত্যের কথা কহিতে আসিয়াছি, সাহিত্যের কথাই কহিব।’’
সাহিত্যের যে কথার দিকে তিনি আমাদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তার মধ্যে কি এই দিকদর্শন নিহিত ছিল না যে, নিজেকে না প্রচার করে উত্তীর্ণ কবিতা লেখার মূল সূত্রটি সাগরপারের কোনো ধরাধামে শুধুমাত্র নয়, আমাদের দেশেও তার শেকড় নিহিত আছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ ও আমাদের ইউনেস্কো স্বীকৃত বাউল গানের প্রচার প্রসারে জাতীয় পর্যায়ে কোনো ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল না। বর্তমানে এ শূন্যতা ঘুচতে শুরু করেছে।
আমরা জানি সংগীত বলতে গীত-বাদ্য-নৃত্য এই তিনের সমন্বিত পরিবেশনাকে বুঝি। বাউলশিল্পী একহাতে একতারা, কোমরে বায়া ও ভাবনৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে গলা ছেড়ে গান করেন।
বাউল কি কবে কখন এর উৎপত্তি?
আমরা যখন বাউলের উৎপত্তি ও তার অর্থ খুজতে শুরু করি তখন আবার আমাদের চর্যায় ফিরে আসতে হয়। অনেক গবেষক মনে করেন চর্যায় ব্যবহৃত বাজুল শব্দ থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি। ড. আহমদ শরীফ তাঁর ‘বাউলতত্ত্ব’ গ্রন্থে বাউল সাধনার প্রাচীনত্বের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লিখেছেন- চর্যাপদে বর্ণিত ‘বাজিল’, ‘বাজুল’ শব্দ থেকেই ‘বাউল’ শব্দটি রূপ লাভ করেছে। আর চর্যাপদের ‘বাজিল’ বা ‘বাজুল’ শব্দটি মূলত দেহসাধনা গুরু ‘বজ্রকুল’ বা ‘বজ্রগুরু’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন সংস্কৃত বাতুল শব্দ থেকে বাউল শব্দের উদ্ভব। বাতুল শব্দের অর্থ পাগল, খ্যাপা বা উন্মাদ অর্থাৎ যারা সত্যিকারের বাউল তাঁরা সর্বদা সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে খুজতেই ব্যাকুল বা পাগল থাকে। অনেক গবেষকের ভাষ্য বাউল সাধক বিশ্বাস করেন বায়ু ও উল এই দুয়ের সমন্বয়ে বাউল। বায়ু শব্দের অর্থ বাতাস আর উল শব্দের অর্থ সন্ধান করা অর্থাৎ বাউল শব্দের অর্থ বাতাসের সন্ধান করা। মহাত্মা ফকির লালন শাহের গানেও তা প্রমাণিত।
সাঁইজির ভাববাণী -
‘‘হাওয়া দমে দেখ তারে আসল বেনা
কে বানাইলো এমন রংমহল খানা।’’
অন্য একটি ভাববাণীতে সাঁইজি লিখেছেন-
‘‘ধরো চোর হাওয়ার ঘরে ফাদ পেতে
সে কি সামান্য চোরা ধরবি কোনা কানছিতে।’’
চর্যাপদের কবি ও বাউল সাধকদের সাধন পদ্ধতি ও জীবনাচার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাউল সাধনা মুলত দেহ কেন্দ্রিক সাধনা। এই বিশ্বাস থেকেই বাউলদের উচ্চারণ-
‘‘যাহা আছে দেহ ভান্ডে
তাহা আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে।’’
লালন শিষ্য বাউলসাধক দুদ্দু শাহ্ বলেন-
‘‘যে খোজে মানুষে খোদা
সেইতো বাউল।’’
বাউল সাধনা, বাউলশিল্পী ও বাউল চিন্তার সাথে যারা জড়িত তাদের জোর দাবি মক্কা-মদিনা বা গয়া-কাশি নয় সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব এই মানবদেহের ভিতর। বাউল তত্ত্ব মতে মানব শরীরের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। যে নিজের শরীরের প্রতি যত্নশীল তিনি একজন মানবিক মানুষ।
এ প্রসঙ্গে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন-
‘‘দেহ জ্ঞান দিব্য জ্ঞান দেহ প্রীতি শুদ্ধ প্রীতি’’ -(দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত বাঙালির গান ১৯০৫)
লালন ফকির বা বাউলসাধকদের দর্শন বিবেচনায় তাঁদের মধ্যে দুটি বিষয় স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদ। বাউলরা যেমন আধ্যাত্মিক সাধনা দিয়ে পরোকালে মুক্তি পেতে চাই তেমনি ইহজগতের মুক্তির জন্য তারা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয় মানুষ তথা মানবতাবাদকে।
বাউল সাধক রশিদ উদ্দীন বলেন-
‘‘মানুষ ধরো মানুষ ভজ
শোন বলিরে পাগল মন
মানুষের ভিতরে মানুষ
করিতেছে বিরাজন।’’
লালন সাঁইজির ভাববাণী-
‘‘মানুষ ছাড়া খ্যাপারে তুই মূল হারাবি
মানুষ ভোজলে সোনার মানুষ হবি।’’
বাউল দর্শন ও এর নান্দনিকতা এতটাই শক্তিশালী যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৯০ সালে যখন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনা করতে আসেন তখন তিনি বাউল দর্শনে প্রভাবিত হয়ে পরিণত হন রবীন্দ্র বাউলে। বাউল দর্শন ও বাউল গানে প্রভাবিত হয়ে কবিগুরু ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রধ করার জন্য লালন শিষ্য গগন চন্দ্র দামের বিখ্যাত গান-
‘‘আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।’’
এর অবিকল সুরে বিশ্বকবি রচনা করেন
‘‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’’ যা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়।
বাংলাদেশের বাউল সুর কবিগুরুকে যেমন প্রভাবিত করেছে আমরাও তেমন আমাদের এই বাউল সুরের জাতীয় সংগীতকে আমাদের মন ও মননে আপন করে নিয়েছি। এর সুর আমাদের প্রাণের বিণায় চেতন-অবচেতনে বেজে ওঠে।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাউল ভাবধারায় কতটা প্রভাবিত হয়েছিলেন তা তার এই গানটার ভিতর দিয়ে বোঝা যায়-
‘‘আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল, আমার দেউল আমারি এই আপন দেহ।
আমার এ প্রাণের ঠাকুর নহে সুদূর অন্তরে মন্দির-গেহ।।
সে থাকে সকল সুখে সকল দুখে আমার বুকে অহরহ,
কভু তায় প্রণাম করি, বক্ষে ধরি, কভু তা’রে বিলাই স্নেহ।।
ভুলায়নি আমারি কুল, ভুলেছে নিজেও সে কুল,
ভুলে বৃন্দাবন গোকুল মোর সাথে মিলন বিরহ।
সে আমার ভিক্ষা-ঝুলি কাঁধে তুলি’, চলে ধূলি-মলিন পথে,
নাচে গায় আমার সাথে একতারাতে, কেউ বোঝে, বোঝে না কেহ।’’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লন্ডনের হিবার্টে তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন আমি পূর্ববঙ্গের দুজন লোককবির লেখায় এমন মহাদর্শন খুঁজে পেয়েছি যা অনেক নামকরা দার্শনিকের লেখাতেও পাওয়া যায় না। তিনি ভারতীয় দর্শন মহাসভার আলোচনায় মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির সাথে পাশ্চাত্যের কবি পার্সি বিশি শেলির (পি বি শেলি ১৭৭২-১৮২২) দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা করে জয়ের রায় লালন সাঁইজিকে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ বাউল ও লোকশিল্পী সংস্থা মনে করে বাউল গানের মহাদর্শন, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদ যে নান্দনিকতা, সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ও কালোত্তীর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে আমরা যদি যথাযথভাবে এর আন্তর্জাতিকায়ন ঘটাতে পারি তাহলে একদিন লালন ফকির, জালাল উদ্দীন খাঁ, বিজয় সরকার, হাসন রাজা, শাহ্ আব্দুল করিম, রশিদ উদ্দীন, ভবা পাগলার ভাববাণী জালাল উদ্দীন রুমি, ভলটেয়ার, সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটলের বাণীর মত বিশ্বদর্শনের বাণী হিসেবে গণ্য হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বাউল ও লোকশিল্পীদের উপরে যে অনাক্রমণ অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটছে তার গভীরে মূলত ভিন্ন দেশের ভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনাচার বাংলাদেশের জাতিগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটি অপচেষ্টা মাত্র। এতে আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা পৃথিবীর সব ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই- আলাদা আলাদা দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি গড়ে ওঠেছে। কোনো দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও জোরালো ও গ্রহণযোগ্য করে বিশ্বের এক মডেল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারি সেই লক্ষ্যে সবাইকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করার আহ্বান করছি।
আমরা বিশ্বাস করি একদিন এ বিশ্ব হবে মানবিক বিশ্ব, একদিন এ পৃথিবী হবে বাউল মতাদর্শের।
লেখক: লালন গবেষক ও কণ্ঠশিল্পী
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বাউল ও লোকশিল্পী সংস্থা।