ঢাকা ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
লোহাগাড়ায় দুই বাসের সংঘর্ষে কলেজছাত্রী নিহত জীব ও পরিবেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অধ্যায় থেকে ৩টি অনুশীলনীর প্রশ্ন ও  উত্তর, ২য় পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বিজ্ঞান সাতকানিয়ায় যুবলীগ নেতা হাসান মাহমুদ গ্রেপ্তার বেনাপোলে আওয়ামী লীগের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে শ্রমিক দলের বিক্ষোভ হ্যারি কেইনের ফর্মকে প্রশংসায় ভাসালেন ডেক্লান রাইস নিষিদ্ধ দলের তৎপরতা চোখে পড়া জাতির জন্য ব্যর্থতা: রেলপথমন্ত্রী ইবির কর্মচারীদের নিয়োগ যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি, আতঙ্কে নিয়োগপ্রাপ্তরা বহুমাত্রিক সম্পর্কোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে শরীয়তপুরে বিএনপির কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ পাঁচবিবিতে ট্রাকচাপায় যুবক নিহত ২৩ জুন: পাউন্ড ছাড়া সব মুদ্রার দাম কমেছে ইউসিটিসিতে ৭ম সিন্ডিকেট মিটিং অনুষ্ঠিত উখিয়ায় বিজিবির অভিযানে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা জব্দ, আটক ১ ভারতের লখনউয়ে অগ্নিকাণ্ডে ১৫ শিক্ষার্থীর মৃত্যু বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা পেল ৬ জেলার সেনা কর্মকর্তারা ২-১ গোলে জর্ডানকে হারিয়ে নকআউটের আশা জিইয়ে রাখলো আলজেরিয়া কাতারে কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ: নিহত ১৩, আহত ৬৬ ইরানের তেল নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র শিরোপার স্বপ্নে ভাসছেন না হালান্ড আশুরা উপলক্ষে ডিএমপির নির্দেশনা তৃণমূলের শীর্ষ পদ থেকে মমতাকে বাদ ১১৫ দিন পর হরমুজ অতিক্রম করল বাংলার জয়যাত্রা পর্তুগাল এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ: রবার্তো মার্তিনেস বিশ্ববিদ্যালয়ে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা বাড়াতে হবে: ইবি উপাচার্য ইউএনওর আইডি ব্যবহার করে টেন্ডার কারসাজি টেকনাফে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে সরে যেতে মাইকিং বাউফল উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি কারাগারে জাবিতে রোকনুজ্জামান খান ও বেগম রোকেয়ার জীবনকর্ম নিয়ে আলোচনা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ কুড়িগ্রামে ধানের গোলায় বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য

স্বাস্থ্য ও ঔষধ নীতির জন্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান অনন্য, অবিস্মরণীয়

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম
স্বাস্থ্য ও ঔষধ নীতির জন্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান অনন্য, অবিস্মরণীয়
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

জাতির বিবেকের বাতিঘর, আমৃত্যু সৎ সাহসী, সত্যবাদী, নিবেদিত দেশপ্রেমিক, মজলুমের প্রাণপুরুষ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান স্বাস্থ্য ও ঔষুধ নীতির জন্য অনন্য অথবা অবিস্মরণীয়। তার ৩য় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, শোকাহত স্বজন ও গুণগ্রাহীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

স্বার্থপরতা, মিথ্যাচার, উশৃঙ্খলতা পরিহার করে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা, মুক্ত গণতন্ত্র চর্চা, ন‍্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা, স্বাধীন রাজনৈতিক মতপ্রকাশের লড়াই করার দৃষ্টান্ত চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সুশাসন, নৈতিক, মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তার দর্শন চিন্তায় জনমনে প্রভাব ফেলেছিলেন। 

সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন গরিবের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে একটা শার্ট-প্যান্ট পরেছেন। আর পায়ে দিতেন ২০০ টাকার প্লাস্টিকের স্যান্ডেল।

তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘দেশের মানুষ পেট ভরে খেতে পায় না, সবাই জামা-কাপড় পরতে পারে না। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করেছি মানুষের খাওয়া-পরার সমস্যা না থাকার জন্য। এখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তাই আমাকে বিলাসিতা মানায় না।’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কোয়েপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হুমায়ুন মোর্শেদ চৌধুরী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মা হাছিনা বেগম চৌধুরী ছিলেন গৃহিণী। তার বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। বাবা-মায়ের ১০ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিনি পুরান ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ১৯৬২-৬৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

এরপর এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি লন্ডনে যান। ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা শেষে যখন চুড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেবেন, ঠিক তখনই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। পরীক্ষায় অবতীর্ণ না হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে তার উচ্চশিক্ষার ইতি ঘটে।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন একজন বিরল ধরনের; এক অর্থে অদ্ভূত মানুষ। ঢিলেঢালা শার্ট-প্যান্ট। পুরোনা বাসায়, আসবাবপত্র পুরনো। গাড়িটাও পুরনো। আমৃত্যু নিজের জন্য কিছু চাননি। দেশ ও জাতির জন্য তার অবদান বলে শেষ করা যাবে না।

জাফরুল্লাহ ভাইকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেকে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বরাবরই বলেছেন, ‘আমি দেশের মানুষের জন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই আমি বিদেশে চিকিৎসা নেবো! তা কী করে সম্ভব! আমি এই দেশে চিকিৎসা নিয়ে মরতে চাই।’

সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসাবে জীবনে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন এই গুণী ব্যক্তি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে ফিলিপাইন থেকে রমেন ম‍্যাগসাইসাই পুরস্কার, ১৯৯২ সালে সুইডেন থেকে বিকল্প নোবেল হিসাবে পরিচিত রাইট লাভলিহুড পুরস্কার, ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ এবং মানবতার সেবার জন্য কানাডা থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। ২০২১ সালে আহমদ শরীফ স্মারক পুরস্কার পান।

১৯৭১ সালে বিলেতে তার জীবনযাপনের ধরণ ছিল বিলাসবহুল। প্রাইভেট জেট চালানোর ও পানির নিচে সাঁতারের প্রশিক্ষকের লাইসেন্সও ছিলো তার। ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার বাতিক। সেই সময়েই তিনি বিলাসবহুল বিশেষ মডেলের মার্সিডিজ বেঞ্জ ব্যবহার করতেন। তাও আবার বিশেষ টায়ারের অ্যারো ডায়নামিক সিটের প্রথম গাড়ি। প্রিন্স চার্লস যে দর্জি থেকে স্যুট বানাতেন, তিনিও একই দর্জি দিয়ে নিজের স্যুট বানাতেন।

২৪ মার্চ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই সাক্ষাৎকার আইটিএন নিউজের মাধ্যমে বিলেতে বসেই দেখলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে এক বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কি ভয় পাচ্ছ না যে পাকিস্তানিরা তোমাদের হত্যা করতে পারে?’। জবাবে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘৭৭ মিলিয়ন বাংলাদেশিকে হত্যার জন্য কি তাদের কাছে যথেষ্ট বুলেট আছে?’

বঙ্গবন্ধুর মুখে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে বাংলাদেশি শুনতে পেয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিলাসবহুল জীবনযাপন ত‍্যাগ করে প্রিয় মাতৃভূমির টানে ব্রিটেনে কর্মরত সব পরিচিত বাঙালি চিকিৎসকদের টেলিফোন করে বললেন, ‘এটি এখন প্রমাণিত যে পাকিস্তান দেশ এখন মৃত। আমরা এখন সবাই বাংলাদেশি।’ এরপরই বাঙালি চিকিৎসকদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন ‘বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে’। বলে রাখা ভালো, এই সংগঠনটি ছিল ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে গঠিত প্রথম সংগঠন।

বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে’র কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সভাপতি ও সহসভাপতি ছিলেন যথাক্রমে ডা. আবু হেনা সাইদুর রহমান ও ডা. হাকিম। কমিটিতে আরও ছিলেন ডা. আলতাফুর রহমান খান এবং স্কটল্যান্ডে জেনারেল ও কার্ডিয়াক সার্জারিতে এফআরসিএস দ্বিতীয় পর্বে প্রশিক্ষণরত ডা. এম এ মবিন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র কার্ডিয়াক সার্জন ছিলেন ডা. মবিন।

ব্রিটেনে তখন সাড়ে চার শ বাংলাদেশি চিকিৎসক ছিলেন। সিদ্ধান্ত হলো প্রত্যেক সদস্য বাংলাদেশে সহায়তার জন্য প্রতি মাসে ১০ পাউন্ড করে চাঁদা দেবেন। কিন্তু ব্রিটেনে তখন বাংলাদেশিদের মধ্যে নানান মতপার্থক্য থাকায় জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর শরণাপন্ন হয়ে তাকে নেতৃত্বদানের অনুরোধ জানান।

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। এপ্রিলে লন্ডনের হাইড পার্কে তেমনই এক পাকিস্তানবিরোধী প্রতিবাদ সমাবেশে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. এম এ মবিন প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের পাকিস্তানি পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলে বললেন, ‘আমরা নিজেদের আর পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে মনে করি না।’ এরপরই তারা দুজনেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তখন জাফরুল্লাহ চৌধুরী মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে পরামর্শ করে মুজিবনগর সরকারের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাদানে গঠিত বিভিন্ন অ্যাকশন কমিটির প্রতি লন্ডনের জনগণ ও ব্রিটিশ আইন প্রণেতাদের সমর্থন-সহানুভূতি লাভে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালের মে মাসের শুরুতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিন উড়োজাহাজে করে দিল্লি হয়ে কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। যখন তারা ভারতীয় দূতাবাসে ভিসার আবেদন করলেন, তখন তাদের পাসপোর্ট চাওয়া হয়। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বললেন, ‘আমরা তো আমাদের পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলেছি।’ 

তখন ভারতীয় দূতাবাস তাদের বিকল্প জোগাড়ের পরামর্শ দেয়। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বললেন, ‘আমরা এখন রাষ্ট্রহীন নাগরিক।’ তখন তাদের স্টেটলেস সনদ বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই সনদ জমা দিলে তবেই দিল্লির ভিসা পান তারা। এরপর দামেস্ক হয়ে দিল্লি যাওয়ার জন্য সিরিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের টিকিট কাটলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ভারতীয় দূতাবাস জানাল, তাদের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়ে গেছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দারা ইতোমধ্যেই তাদের বিষয়ে সমস্ত খবরাখবর সংগ্রহ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের যাচাই-বাছাই করছিল ভারতীয় গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া স্বাভাবিক হলেও তারা  ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি ব্রিটেন থেকে দুজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতে আসতে পারেন।

যাত্রাপথে সিরিয়ান এয়ারলাইনসের লন্ডন থেকে দিল্লিগামী ফ্লাইটটি সিরিয়ার দামেস্কে জ্বালানি নেওয়ার জন্য যাত্রাবিরতি নিয়েছিল। জ্বালানি নেওয়ার সময় সব যাত্রীকেই যেহেতু উড়োজাহাজ থেকে নামতে হয়, সেহেতু সিরিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সিরিয়ায় পাকিস্তানি দূতাবাস ও গোয়েন্দারা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিনকে আটক করার জন্য প্রস্তুত ছিল। বিষয়টি টের পেয়ে উড়োজাহাজ থেকেই নামেননি তারা দুজন।

সেসময় পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা পাইলটকে তাদের দুজনকে নামানোর জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু পাইলট ছিলেন অটল। পাকিস্তানিদের যুক্তি, এরা দুজন পলাতক পাকিস্তানি, সুতরাং আমরা তাদের আটক করতে পারি। অন্যদিকে পাইলটের যুক্তি, যেহেতু বিমান এখন রানওয়েতে, সুতরাং তাদের জন্য কোনো দেশের আইনই প্রযোজ্য হবে না। দুইপক্ষের মধ্যে টানা ৫ ঘণ্টা কথা-কাটাকাটির পরও পাইলটের দৃঢ় মনোবলের কারণে দামেস্ক বিমানবন্দর শেষপর্যন্ত বিমানটিকে ছাড়পত্র দেয়।

পরদিন ভোরে দিল্লি পৌঁছানোর পর তাদের স্বাগত জানালেন অল ইন্ডিয়া রিলিফ কমিটির চেয়ারপারসন পদ্মজা নাইড়ু। তিনি জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে বললেন, ‘প্রচুর শরণার্থী এখন ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের আশ্রয়, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। আপনাদের দুজনের এখন উচিত শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসাসামগ্রী জোগাড়ে আত্মনিয়োগ করা।’

এর পরপরই এক অদৃশ্য কারণে ভারত সরকার জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে জানিয়ে দিলো, সন্ধ্যার ফ্লাইটেই তাদের লন্ডন ফিরে যেতে হবে।

বিষয়টি জানতে পেরে সেদিন দুপুরেই তারা দুজন ভারতীয় গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে হোটেল থেকে পালিয়ে গোপনে দিল্লি থেকে বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতা যান।

কলকাতায় সাংবাদিক সাদেক খানসহ বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে দেখা হলো জাফরুল্লাহ চৌধুরীর। তারা তাকে আগরতলা চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সাদেক খান নিজে দুই নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ বরাবর একটি চিঠি লিখলেন। সেই চিঠি নিয়ে আগরতলায় যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিন। আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন ডা. জাফরুল্লাহ। 

আগরতলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ক্যাপ্টেন ডা. আখতার আহমেদের সঙ্গে দেখা হয় জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের। ডা. আখতার ও ডা. নাজিমুদ্দিন ততদিনে মেলাঘরের দারোগা বাগিচায় অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন। এরপর ডা. জাফরুল্লাহ ডা. এম এ মবিনের সঙ্গে মিলে সেখানেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট “বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল” প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি সেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যজ্ঞান দান করেন যা দিয়ে তারা রোগীদের সেবা করতেন এবং তার এই অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত হয়। 

ডা. জাফরুল্লাহরা যখন মেলাঘরে এসেছিলেন, তখন যুদ্ধে হতাহতদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় ফিল্ড হাসপাতালের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ডা. আখতার ও ডা. নাজিম পাঁচ হাজার টাকার একটি বাজেট মেজর খালেদ মোশারফের কাছে উপস্থাপন করলেন। তখন বাংলাদেশ হাসপাতালের সঙ্গে পুরোদমে যুক্ত হয়ে পড়লেন ডা. জাফরুল্লাহ ও ডা. মবিন। 

ডা. জাফরুল্লাহ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে শাখাকেও সংযুক্ত করলেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেখলেন পাঁচ হাজার টাকায় তেমন কিছু করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেখা করে ৫০ হাজার টাকার বাজেট পাস করাতে সক্ষম হলেন।

তখন বহু খোঁজাখুঁজির পর বিশ্রামগঞ্জে হাবুল ব্যানার্জির লিচু বাগানকে লিচুগাছ না কাটার শর্তে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নির্বাচিত করা হয়।

এই হাসপাতালে দুটি ওয়ার্ড রাখা হয়েছিল- সার্জিকেল ও মেডিকেল। এছাড়া ছিল ক্যাজুয়ালটি, ইমার্জেন্সি, প্যাথলজি, অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড, রিক্রিয়েশন এরিয়া, ইনফেকশাস ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন কক্ষ।

২৬ আগস্ট মেলাঘরের দারোগা বাগিচা থেকে বিশ্রামগঞ্জে স্থানান্তরিত হয় বাংলাদেশ হাসপাতাল। এরপরই শুরু হয় বাংলাদেশ হাসপাতালের সবচেয়ে সফলতম অধ্যায়।

যখনই হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও কোনো জিনিসের প্রয়োজন হতো, তখনই জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সদা প্রস্তুত। তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকেতে চিঠি পাঠাতেন। কেবল তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি নিজে একাধিকবার ব্রিটেনে গিয়ে হাসপাতালের জন্য চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও ঔষধের ব্যবস্থা করেছিলেন।

বাংলাদেশ হাসপাতালের সঙ্গে সর্বক্ষণ জড়িত থাকলেও সেখানে বেশিদিন থাকতে পারেননি জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কারণ পুরো যুদ্ধকালীন তাকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে অর্থ, ত্রাণ ও মেডিকেল সরঞ্জামাদি  জোগাড়, পরিকল্পনা ও তথ্য প্রদানের কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়েছিল। যে কারণে তাকে নিয়মিতই কলকাতা এবং ব্রিটেনে ছুটতে হতো। এছাড়া তাজউদ্দীন আহমেদ ও জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে প্রায়ই বৈঠক করতে হতো।

জুলাইয়ে একবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহের জন্য আগরতলা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কাজের ফাঁকে এক পরিচিত জাহাজ মালিকের কাছে তেলের ট্যাংকারের যাতায়াতের বিষয়ে খোঁজ নেন। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই একটি তেলের ট্যাংকার ডুবিয়ে দিয়েছিল মুক্তিবাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন মেজর খালেদ মোশাররফ। ডা. জাফরুল্লাহ ব্রিটেনে গিয়ে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করে অস্ত্র সহায়তা চান। জবাবে তারা এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয়, যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ দেবে।

মুক্তিযুদ্ধে সব চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বাংলাদেশ সরকার থেকে বেতন নিলেও ব্যতিক্রম ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং ডা. মবিন। তারা স্বেচ্ছায় কোনো ধরনের বেতন গ্রহণ না করে বরং নিজেদের অর্থেই ব্যয় মিটিয়েছেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরীও। সেই সময়ে তিনি সাক্ষ্য হয়েছেন এক অনন্য ঘটনার।

১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে গভীর ষড়যন্ত্র করে আসতে বাধা দেওয়া হয়। নশ্বর পৃথিবীর এই চক্রান্তের কষ্টে জেনারেল ওসমানী বাবা-মায়ের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে একটি ছোট এমএইট উড়োজাহাজে করে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন এডিসি শেখ কামাল, সেকেন্ড-ইন-কমান্ড কর্নেল আবদুর রব, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্তা ও একজন সাংবাদিক।

যাত্রার আগে ব্রিগেডিয়ার গুপ্তা বললেন, আকাশপথ সম্পূর্ণ মুক্ত। পথিমধ্যে উড্ডয়ন অবস্থাতেই একটি ভারতীয় প্লেন থেকে তাদের উড়োজাহাজে গুলিবর্ষণ করা হয়। গুলিতে তেলের ট্যাংকার ফুটো হয়ে যায়। তখন ভারতীয় পাইলট ব্রিগেডিয়ার গুপ্তার উদ্দেশে বললেন, ‘স্যার আমার হাতে মাত্র ১০ মিনিট সময় বাকি আছে। আমি কোথায় অবতরণ করব।’ বিষয়টি বুঝতে পেরে জেনারেল ওসমানী ও জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেদের জ্যাকেট খুলে হেলিকপ্টারের তেলের ট্যাংকারের চারপাশ মুড়িয়ে দিলেন যেনো গুলি না লাগে। এমন সময়েই একটি গুলি এসে লাগলো কর্নেল রবের পায়ে। ভীষণ রক্তপাত হচ্ছিল।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী দ্রুত কর্নেল রবকে শুইয়ে দিয়ে মাউথ টু মাউথ ব্রিদিং ও কার্ডিয়াক ম্যাসেজ দিতে লাগলেন। সেই সময় শেখ কামালের হাতেও গুলি লাগে। যদিও শেষ পর্যন্ত পাইলট উড়োজাহাজটিকে বিচক্ষণতার সঙ্গে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারা উড়োজাহাজ থেকে লাফ দিয়ে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি পুরোপুরি পুড়ে যায়।

১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হলেও শেষ হয়নি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর চিকিৎসাযুদ্ধ। কারণ কেবল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই থেমে যাননি জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বরং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি শামিল হয়েছেন নতুন এক মহান চিকিৎসাযুদ্ধে। যে যুদ্ধে তিনি গড়ে তুলেছিলেন গণমানুষের চিকিৎসার চিরকালীন স্বাস্থ্য ঠিকানা ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মহান ব্রত নিয়ে ঢাকার অদূরে সাভারে জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেন ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’। সরকার কতৃক অধিগ্রহণ করা ২৩ একর জমি ও জোহরা বেগম, এম এ রব, ডাঃ লুৎফর রহমানদের পারিবারিক সম্পত্তি থেকে দান করা পাঁচ একর জমিসহ মোট ২৮ একর জমিতে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

সেদিনের সেই ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বর্তমানে সারাদেশে ৪০টি মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অধীনে আছে সাতটি হাসপাতাল, ডেন্টাল কলেজ, গণবিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, মাসিক গণস্বাস্থ্য ম্যাগাজিন, বেসিক কেমিক্যাল কারখানা (দেশের সবচেয়ে বড় প্যারাসিটামল কাঁচামাল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান), গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস ও অ্যান্টিবায়োটিকের কাঁচামালের ফ্যাক্টরি।

দেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার কথা চিন্তা করে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার। সেখানে দরিদ্র মানুষেরাও সবচেয়ে কম খরচে কিডনির চিকিৎসা করাতে পারেন।

সামরিক শাসকদের সময়েই স্বাস্থ্যনীতি, ওষুধনীতি ও নারীশিক্ষা, এমনকি সে সময়ে সহজে দেশের মানুষের জন্য পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে সরকারকে রাজি করানো এবং প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণে সরকারকে প্রভাবিত করতে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

স্বাস্থ্যখাতে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অন্যতম বড় ভূমিকা ছিল আশির দশকে জাতীয় ঔষধ নীতি প্রবর্তন। এ নীতির আগে দেশের ঔষধ উৎপাদন খাত ছিলো পুরোপুরি বিদেশিদের হাতে। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর হাত ধরে ঔষধ নীতির মাধ্যমে দেশের ঔষধশিল্পের এক বিপ্লব ঘটে। যেখানে আগে দেশের ঔষধ খাত প্রায় পুরোপুরিই বিদেশিদের হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে এখন দেশীয় উৎপাদকেরাই দেশের ৯৫ শতাংশ ঔষধ উৎপাদন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত ঔষধ শতাধিক দেশে রপ্তানিও করেন দেশীয় উৎপাদকেরা।

সদ্যস্বাধীন দেশের অজস্র প্রতিকূলতাকে সামলে নিয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী যেভাবে দেশের স্বাস্থ্যখাত বিনির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তা অবিস্মরণীয়। চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এই মূল কারিগর ও দেশের মজলুম জনগণের প্রকৃত বন্ধু তিন বছর আগে স্ত্রী শিরিন হক, ছেলে বারিশ হাসান চৌধুরী, মেয়ে বৃষ্টি চৌধুরীকে রেখে ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল (মঙ্গলবার) রাতে ৮১ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ক্যাম্পাসে তাকে সমাহিত করা হয়।

শারীরিকভাবে তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন ন‍্যায় ও সত‍্য কথা বলার অবিস্মরণীয় ইতিহাস। নৈতিক-মানবিক চিকিৎসা কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্র, যা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল।

বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময়ে প্রণীত হয়েছে, যখন দেশ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ প্রেক্ষাপটে বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।

বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক হবে।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব সংগ্রহ। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো তুলনামূলক কম। ফলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে কর কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির আশঙ্কা থাকে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। তাই শুধু ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা নয়, উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

বেসরকারি খাত দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিগত সহায়তা দেওয়া বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

একটি বাজেটের সাফল্য কেবল বরাদ্দের পরিমাণে নয়, বরং তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটকে হতে হবে বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

লেখক: রাষ্ট্রচিন্তক; সিলিকন ভ্যালি, আমেরিকা

প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

রাষ্ট্র যখন আধুনিকতার মহাসড়কে পা বাড়ায়, তখন তার নাগরিকরা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তিতে ভোগেন। আমরা ধরে নিই, প্রযুক্তির ছোঁয়া আমাদের জীবনকে আরও শৃঙ্খলিত, স্বচ্ছ এবং নিরাপদ করবে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ক্যামেরা’ সংযোজনের খবরটি যখন চাউর হলো, সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহল তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, মানবীয় দুর্নীতির অবসান এবং ঘুষ-বাণিজ্যের অবসান ঘটানোর জন্য এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কিন্তু এই স্বস্তির আয়ুষ্কাল যে এতটা সংক্ষিপ্ত হবে, তা হয়তো রাষ্ট্র বা নাগরিক–কেউই ভাবেনি। বিজ্ঞানের চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী, প্রযুক্তির যেমন আলো আছে, তেমনি রয়েছে এক অন্ধকার চোরাগলির অপচ্ছায়া। এআই ক্যামেরা চালু হওয়ার সংবাদের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের এক বিশাল অংশের নাগরিকের মুঠোফোনে হানা দিতে শুরু করেছে এক অভিনব আপদ। ‘এআই ক্যামেরায় আপনার গাড়ির ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, এত টাকা জরিমানা নিম্নোক্ত লিংকে ক্লিক করে পরিশোধ করুন’ এমন বার্তা বা এসএমএস দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি অত্যন্ত চতুর, সুসংগঠিত এবং প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন সাইবার অপরাধী চক্র। এটি কেবল একটি সাধারণ জালিয়াতি নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল রূপান্তর, ডেটা নিরাপত্তা এবং নাগরিক মনস্তত্ত্বের ওপর এক বিরাট আঘাত। স্মিশিং: যখন আতঙ্কই অপরাধীদের প্রধান অস্ত্র সাইবার নিরাপত্তার পরিভাষায় এই অপরাধটিকে বলা হয় ‘স্মিশিং’ (Smishing), যা মূলত এসএমএস এবং ফিশিংয়ের একটি মারাত্মক মেলবন্ধন। অপরাধীরা এখানে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার করছে না, তারা মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করছে।

আমাদের সমাজে ‘মামলা’ বা ‘আইনি জটিলতা’ শব্দ দুটি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের তীব্র ভীতি ও অস্বস্তি তৈরি করে। একজন সাধারণ চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী যখন হঠাৎ মেসেজ পান যে তার অজান্তে তার গাড়ির নামে মামলা হয়েছে এবং দ্রুত টাকা না দিলে লাইসেন্স বাতিল বা বড় ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তখন তার যৌক্তিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা সাময়িকভাবে লোপ পায়। অপরাধীরা ঠিক এই ‘আতঙ্কের মুহূর্তটি’ ব্যবহার করে। তারা মেসেজের নিচে যে শর্ট লিংক বা ভুয়া পেমেন্ট গেটওয়ের লিংক যুক্ত করে দেয়, আতঙ্কিত নাগরিক নিজের অজান্তেই সেখানে ক্লিক করেন। সেখানে গিয়ে বিকাশ, রকেট, নগদ বা কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিয়ে যখনই তিনি টাকা স্থানান্তর করেন, তখনই তিনি পাতানো ফাঁদে পা দেন। অনেক ক্ষেত্রে শুধু জরিমানার টাকা কেটেই ক্ষান্ত হয় না এই চক্রটি; ওটিপি বা পিন হাতিয়ে নিয়ে পুরো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে দেওয়ার নজিরও মিলছে। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি নিখুঁত ‘ডিজিটাল ডাকাতি’।

ডেটাবেজের শুভঙ্করের ফাঁক: তথ্য পাচার হচ্ছে কোথায়? এই পুরো অপরাধ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার এবং রহস্যময় দিকটি হলো–তথ্যপ্রাপ্তি। একটি অপরাধী চক্র কীভাবে জানল যে নির্দিষ্ট একটি মোবাইল নম্বরের বিপরীতে অমুক ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিবন্ধিত রয়েছে? এখানে দুটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সমীকরণ সামনে আসে, যা রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় ডেটাবেজের নিরাপত্তাহীনতা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে নাগরিকদের যে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্যের (মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, গাড়ির চেসিস নম্বর) ডেটাবেজ রয়েছে, তা কি আসলেই নিরাপদ? অতীতেও বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটের ডেটা ফাঁসের খবর আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। এই ক্ষেত্রেও কি কোনো অসাধু চক্র বা হ্যাকার গোষ্ঠী সেই তথ্য অপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছে? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি। নির্বিচার আক্রমণ (Brute Force/Random Attack): যদি ডেটা ফাঁস না-ও হয়ে থাকে, তবে অপরাধীরা হয়তো লটারির মতো নির্বিচারে হাজার হাজার নম্বরে এই বার্তা পাঠাচ্ছে। আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ মোটরসাইকেল ও গাড়ি রয়েছে। ফলে প্রতি হাজার মেসেজের মধ্যে যদি ৫০ জন গাড়ির মালিকও এই ফাঁদে পা দেন, তবেই অপরাধীদের উদ্দেশ্য সফল। যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের এই উন্মুক্ততা প্রমাণ করে যে, আমরা ‘স্মার্ট’ হওয়ার স্লোগান দিলেও আমাদের ডিজিটাল দেয়ালগুলো কতটা নড়বড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা এবং সামাজিক সচেতনতার খরা ডিজিটাল অপরাধের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতাও কম দায়ী নয়। যখন একটি নতুন প্রযুক্তি (যেমন এআই ক্যামেরা) সড়ক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন তার অনুষঙ্গ হিসেবে নাগরিকদের সচেতন করার যে ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন ছিল, তা উধাও। বিআরটিএ বা ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ থেকে কেন শুরুতেই জোর গলায় বলা হলো না যে–‘সরকারি কোনো মামলার মেসেজ কোনো সাধারণ ১১ ডিজিটের মোবাইল নম্বর থেকে যাবে না এবং কোনো মেসেজে সরাসরি পেমেন্ট লিংক দেওয়া থাকবে না?’ এই স্পষ্ট বার্তার অভাবে সাধারণ মানুষ প্রতারক আর সরকারের পার্থক্য করতে পারছে না। এর পাশাপাশি আমাদের দেশের নাগরিকদের প্রযুক্তিগত শিক্ষার হার অত্যন্ত শোচনীয়। আমরা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে শিখেছি, ইন্টারনেট ডেটা কিনতে শিখেছি, কিন্তু ‘সাইবার হাইজিন’ বা ডিজিটাল নিরাপত্তা সচেতনতা শিখিনি।

একটি অচেনা লিংকে ক্লিক করার আগে যে ডোমেইন নেম চেক করতে হয় (যেমন .com -এর জায়গায় .xyy বা .top থাকা মানেই সেটি ভুয়া), এই সাধারণ জ্ঞানটুকু দেশের সিংহভাগ মানুষের নেই। অপরাধীরা নাগরিকদের এই সরলতা বা অজ্ঞতারই চূড়ান্ত ফায়দা তুলছে। রাষ্ট্রের স্মার্টনেস বনাম অপরাধীদের চাতুর্য আমরা যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন এই ধরনের সাইবার ক্রাইম পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর জনগণের আস্থা ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকরা প্রযুক্তির যেকোনো নতুন উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করবেন। আজ যদি এআই ক্যামেরার নাম করে টাকা ডাকাতি হয়, তবে কাল হয়তো ই-পাসপোর্ট, ডিজিটাল ব্যাংকিং বা স্মার্ট এনআইডি কার্ডের নাম করেও একই কাজ হবে। অপরাধীরা প্রতিনিয়ত তাদের চাতুর্য এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ঘটাচ্ছে, অথচ আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাইবার ইউনিটগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে সনাতনী তদন্ত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এই চক্রগুলোকে শুধু একটি নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর বা বিকাশ অ্যাকাউন্ট ট্র্যাক করে ধরা সম্ভব নয়, কারণ তারা ভুয়া বা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম এবং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে। এদের ধরতে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তিগত নজরদারি ও আন্তর্জাতিক মানের সাইবার ফরেনসিক ল্যাব। উত্তরণের পথ: তিন স্তরের প্রতিরোধ এই সর্বগ্রাসী ডিজিটাল জালিয়াতি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক–এই তিন পক্ষকেই একযোগে কাজ করতে হবে। প্রথমত, কঠোর আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনকে অনতিবিলম্বে এই চক্রের আইপি অ্যাড্রেস এবং ভুয়া পেমেন্ট গেটওয়েগুলো চিহ্নিত করে ডোমেইনগুলো ব্লক করতে হবে।

এই চক্রের মূলহোতাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই সাহস না পায়। দ্বিতীয়ত, ডেটা অডিট ও তথ্য অধিকারের সুরক্ষা: বিআরটিএ এবং ট্রাফিক বিভাগের ডেটাবেজ অবিলম্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন আইটি টিম দ্বারা ‘সিকিউরিটি অডিট’ করা উচিত। নাগরিকদের তথ্য চুরির সঙ্গে যদি ভেতরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকেন, তবে তাকে কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, গণসচেতনতার মহাবিপ্লব: টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশের প্রতিটি পেট্রল পাম্প ও ট্রাফিক সিগন্যালে বড় বড় বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। মানুষকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে, ট্রাফিক মামলার বৈধ মেসেজ কেবল নির্দিষ্ট ‘Masking’ (যেমন–ডিএমপি বা বিআরটিএ) নামেই আসবে এবং মামলার সত্যতা যাচাইয়ের একমাত্র স্থান হলো সরকারের নিজস্ব অফিশিয়াল পোর্টাল। শেষ কথা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরার ব্যবহার যুগের দাবি এবং একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর সুফল দেশের মানুষ পাক–সেটিই কাম্য। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালে যদি একদল সাইবার অপরাধী সাধারণ মানুষের পকেট কাটার মহোৎসবে মেতে ওঠে এবং রাষ্ট্র যদি তা নির্বিকার চিত্তে চেয়ে চেয়ে দেখে, তবে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক।

প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য, শোষণের জন্য নয়। ডিজিটাল অপরাধীদের চেয়ে রাষ্ট্রকে সব সময় দুই কদম এগিয়ে থাকতে হবে। সরকার যদি দ্রুত এই ‘এআই ক্যামেরা’র ভুয়া মামলার প্রতারক চক্রকে দমনে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ সাধারণ মানুষের কাছে এক মূর্তিমান অভিশাপ ও আতঙ্কের কারণ হয়েই থাকবে। আমরা একটি নিরাপদ সড়ক যেমন চাই, তেমনি একটি নিরাপদ এবং সাইবার-শত্রুমুক্ত ডিজিটাল পরিবেশও আমাদের নাগরিক অধিকার।

লেখক: শিক্ষার্থী ফুলছড়ি সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা
[email protected]

বাবা দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি বাবা-মাকে হারাচ্ছি, নাকি তাদের সঙ্গে সময়ের সংযোগ হারাচ্ছি!

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
বাবা দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি বাবা-মাকে হারাচ্ছি, নাকি তাদের সঙ্গে সময়ের সংযোগ হারাচ্ছি!
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

আজ বাবা দিবস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ছবি, শুভেচ্ছা, স্মৃতিচারণ আর আবেগঘন বার্তায় ভরে উঠবে দিনটি। কেউ বাবার সঙ্গে তোলা পুরোনো ছবি পোস্ট করবেন, কেউ লিখবেন বাবার ত্যাগের গল্প, কেউ হয়তো বাবাকে হারানোর বেদনা জানাবেন। কিন্তু এই আবেগঘন দিনের মাঝখানে আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়–আমরা কি সত্যিই আমাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, নাকি আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে প্রজন্মগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বসবাস করছে!

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পরিবর্তনের অসম গতি। প্রযুক্তি, যোগাযোগ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাপনের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কিন্তু পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক অভিযোজনের কাঠামো সেই একই গতিতে বদলাতে পারছে না। ফলে একই পরিবারের ভেতরেও তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য দূরত্ব।

আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তে জানতে পারে, অনলাইনে কাজ করতে পারে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু সেই একই তরুণের বাবা হয়তো এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন একটি চিঠি পৌঁছাতে সপ্তাহ লেগে যেত, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হতো, আর জীবনের স্থিতিশীলতাই ছিল সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ।
এখানেই টানাপোড়েনের সূত্রপাত।

অনেক সময় আমরা এই পার্থক্যকে প্রজন্মগত সমস্যা বলে দেখি। মনে করি বাবা বুঝতে পারেন না, সন্তানও বুঝতে চায় না। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। একই সমাজে এখন একাধিক সময় পাশাপাশি অবস্থান করছে। একজন বাবা যে অভিজ্ঞতার পৃথিবীতে বড় হয়েছেন, তার সন্তান বড় হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। ফলে একই ঘটনাকে তারা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।
বাবা যখন নিরাপদ চাকরির কথা বলেন, সন্তান তখন নতুন সুযোগের কথা ভাবে। বাবা যখন স্থায়িত্ব চান, সন্তান তখন পরিবর্তনকে স্বাভাবিক মনে করে। বাবা যখন পারিবারিক বন্ধনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, সন্তান তখন ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।

এই পার্থক্যকে বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটাকে সময়ের পার্থক্য হিসেবে বুঝতে হবে।
কিন্তু এই বোঝাপড়ার দায় শুধু বাবা-মায়ের নয়, সন্তানেরও।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে পরিবারনির্ভর ছিল। বার্ধক্যের নিরাপত্তা, মানসিক আশ্রয়, অসুস্থতার সময়ে সহায়তা কিংবা জীবনের শেষ বয়সের সঙ্গ–সবকিছুর কেন্দ্র ছিল পরিবার। আমাদের বাবা-মা সেই বিশ্বাস নিয়েই জীবন কাটিয়েছেন যে, একদিন সন্তানরাই তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হবে।
কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা এবং অভিবাসনের কারণে পরিবার এখন আর আগের মতো ভৌগোলিকভাবে একসঙ্গে নেই। সন্তান চাকরির জন্য ঢাকায়, বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে। কেউ বিদেশে, কেউ অন্য শহরে। প্রযুক্তি যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু সহাবস্থানের অভাবও তৈরি করেছে।
ফলে বাবা-মায়ের জীবনে একটি নতুন ধরনের নিঃসঙ্গতা জন্ম নিচ্ছে।

অনেক সময় তারা অর্থের অভাবে নয়, মানুষের অভাবে কষ্ট পান। প্রয়োজনের অভাবে নয়, গুরুত্ব হারানোর অনুভূতিতে ভোগেন। তাদের সন্তান হয়তো নিয়মিত টাকা পাঠায়, কিন্তু মাসের পর মাস মন খুলে কথা বলে না। ওষুধের খরচ দেয়, কিন্তু এক কাপ চা নিয়ে পাশে বসে না। প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু সব সময় সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করতে পারেনি।
এই বাস্তবতায় বাবা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত দায়িত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করা।

বর্তমান প্রজন্মের কর্তব্য শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, মানসিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার দামি কোনো বস্তু নয়, বরং সময়, মনোযোগ এবং সম্মান।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আবার সম্পর্কনির্ভর হয়ে ওঠে। যে বাবা একসময় সন্তানের হাত ধরে রাস্তা পার করিয়েছেন, একসময় সেই বাবাই সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। যে মানুষটি একসময় পরিবারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনিই একসময় পরিবারের আলোচনার বাইরে পড়ে যান।
এটা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটা একটি সামাজিক সংকট।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য তাই কয়েকটি দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, নিয়মিত যোগাযোগকে অভ্যাসে পরিণত করা। ব্যস্ততার যুগে সময়ের অভাব বাস্তব, কিন্তু পাঁচ মিনিটের আন্তরিক কথোপকথনও অনেক সময় গভীর মানসিক শক্তি দেয়। প্রতিদিন না পারলেও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া সম্পর্কের নিরাপত্তা তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাবা-মাকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক মনে না করা। সময় বদলেছে, কিন্তু অভিজ্ঞতার মূল্য কমে যায়নি। প্রযুক্তিগত জ্ঞান হয়তো নতুন প্রজন্মের বেশি, কিন্তু জীবনের জ্ঞান এখনো প্রবীণদের কাছেই বেশি।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল ব্যবধান কমানো। অনেক বাবা-মা প্রযুক্তির জগতে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেন। তাদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা, অনলাইন সেবা ব্যবহারে সহায়তা করা কিংবা ধৈর্য নিয়ে শেখানোও এক ধরনের পারিবারিক দায়িত্ব।
চতুর্থত, বার্ধক্যকে পারিবারিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন পরিকল্পনা করা হয়, তেমনি বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও সচেতন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ, দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, আর পরিবারকে এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবে বাবা-মা কোনো অতীতের প্রতিনিধি নন, তারা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। সময় বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, পেশা বদলাবে, জীবনযাপনের ধরন বদলাবে, কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রয়োজন–ভালোবাসা, সম্মান এবং আপনজনের উপস্থিতি কখনো বদলায় না।
বাবা দিবস তাই শুধু একজন বাবাকে শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়। এটা আমাদের সামাজিক বিবেককে প্রশ্ন করার দিন। আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করছি, যেখানে প্রবীণরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবেন? আমরা কি এমন পরিবার গড়ে তুলছি, যেখানে প্রজন্মের পার্থক্য দূরত্বে নয়, সংলাপে রূপ নেবে?

পরিবর্তন অনিবার্য। জীবনও তাই। কিন্তু পরিবর্তনের এই দ্রুত সময়ে যদি আমরা বাবা-মায়ের হাত ছেড়ে দিই, তাহলে উন্নয়নের অনেক অর্জনও শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ থেকে যাবে।
কারণ, একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি তার প্রযুক্তির গতি দিয়ে নয়, বরং সে তার প্রবীণ মানুষদের কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা দিতে পারে–সেই মানদণ্ডেই পরিমাপ করা হয়।
আজ বাবা দিবসে তাই সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে একটি ফোনকল, একটি দীর্ঘ আলাপ, একটি আন্তরিক কুশল জিজ্ঞাসা কিংবা একটি প্রতিশ্রুতি–সময়ের পরিবর্তন যত দ্রুতই হোক, বাবা-মা যেন কখনো নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

মোহভঙ্গের বাংলাদেশ: যখন বুঝলাম সর্বনাশ হয়ে গেছে

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম
মোহভঙ্গের বাংলাদেশ: যখন বুঝলাম সর্বনাশ হয়ে গেছে
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ কখনো কখনো স্বৈরাচার নয়; বরং স্বৈরাচারকে পরাজিত করার নামে এমন এক শক্তির উত্থান, যারা মুক্তির ভাষা ধার করে মানুষের সামনে হাজির হয়, কিন্তু ক্ষমতায় এসে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত আরও গভীরভাবে ধ্বংস করে। ইতিহাস বারবার আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে। জনগণ অনেক সময় যে শক্তিকে মুক্তিদাতা মনে করে বরণ করে নেয়, পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সেই শক্তিই নতুন শৃঙ্খলের কারিগর।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সেই তিক্ত সত্যকেই আবার সামনে এনেছে। একসময় অনেকেই মনে করেছিলেন, দেশের সব সংকটের মূল কারণ একজন ব্যক্তি, একটি দল অথবা একটি সরকার। তারা বিশ্বাস করেছিল, তাদের বিদায়ের মধ্য দিয়েই যেন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরে আসবে। রাষ্ট্রের জটিল সংকটকে তারা সরল সমীকরণে নামিয়ে এনেছিল। মনে করেছিল, শাসক বদলালেই মুক্তি আসবে।

আজ সময়ের দূরত্ব থেকে ফিরে তাকালে প্রশ্ন জাগে–তারা কি ভুল করেছিল? যে শাসনব্যবস্থাকে আমরা প্রতিদিন গালি দিয়েছি, তাকে হয়তো স্বৈরাচার বলার যথেষ্ট কারণ ছিল। মতপ্রকাশের সংকোচন ছিল, বিরোধী রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি আদর্শিক ভিত্তিও ছিল। মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা–এসব অন্তত রাষ্ট্রীয় বয়ানের অংশ ছিল।

আজ সেই বাস্তবতাকে রোমান্টিক করে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটিও সত্য অনেকেই বুঝতে পারেনি, ইতিহাসে সব কর্তৃত্ববাদ এক রকম নয়। উন্নয়নবাদী কর্তৃত্ববাদ, সামরিক কর্তৃত্ববাদ, ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদ কিংবা ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদ–এসবের চরিত্র এক নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন জনগণ একটি কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আরও ভয়ংকর কর্তৃত্ববাদের পথ প্রশস্ত করে।

গণতন্ত্রের নামে যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে, তারা যদি গণতন্ত্রকে কেবল একটি সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেই পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ প্রকাশ্য স্বৈরাচারকে মানুষ সহজে চিহ্নিত করতে পারে; কিন্তু গণতন্ত্রের পোশাক পরা ফ্যাসিবাদ অনেক বেশি ধূর্ত, অনেক বেশি পরিকল্পিত এবং অনেক বেশি বিধ্বংসী। আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই বিপদের লক্ষণ স্পষ্ট। একটি সমাজকে দখল করতে হলে প্রথমে তার ইতিহাসকে দখল করতে হয়। তাই আমরা দেখছি ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার প্রতিযোগিতা চলছে। মুক্তিযুদ্ধকে খণ্ডিত করা হচ্ছে, স্বাধীনতার ইতিহাসকে দলীয় ইতিহাসে রূপান্তর করা হচ্ছে, আবার অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদেরও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে।

ইতিহাসের এই বিকৃতি কেবল অতীতের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; এটি ভবিষ্যতের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র।
কারণ যে জাতি তার ইতিহাস হারায়, সে জাতি তার রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাও হারায়। একসময় যে সমাজে মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের সংগ্রামের প্রতীক, সেখানে আজ মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি রাজনৈতিক পক্ষের সম্পত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্তরসূরিদের নতুন ভাষা, নতুন পোশাক ও নতুন কৌশলে পুনর্বাসনের পথও তৈরি করা হচ্ছে।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পৃথিবীর বহু দেশে ফ্যাসিবাদ এভাবেই কাজ করেছে। তারা প্রথমে ইতিহাসের ভাষা বদলায়, তারপর সংস্কৃতির ভাষা বদলায়, শেষে রাষ্ট্রের ভাষা বদলায়। বাংলাদেশেও আমরা সেই রূপান্তরের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ জনস্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। রাজনীতির জায়গা দখল করছে করপোরেট স্বার্থ, আন্তর্জাতিক শক্তির চাপ এবং অগণতান্ত্রিক গোষ্ঠীগত প্রভাব। জনগণের ভোট, অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রশ্নগুলোকে দুর্বল করে দিয়ে এক ধরনের অভিভাবকতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

এই ধারণার মূল কথা হলো–জনগণ নাকি নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করতে সক্ষম নয়; তাই কিছু ‘বিশেষজ্ঞ’, কিছু ‘সুশীল’, কিছু ‘মহৎ ব্যক্তি’ জনগণের হয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো গণতন্ত্র টিকে না। জনগণকে অক্ষম প্রমাণ করার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণের অধিকারও কেড়ে নেয়।
আরও উদ্বেগজনক হলো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের পরিবর্তন। একটি জাতির আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে তার ভাষা, গান, সাহিত্য, ইতিহাস ও স্মৃতির ওপর। যখন এসবের জায়গায় বিভাজন, বিদ্বেষ ও পরিচয়-সংকটকে উসকে দেওয়া হয়, তখন সমাজের ভেতরে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়। আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন রাজনৈতিক মতভেদকে ক্রমশ অস্তিত্বের প্রশ্নে রূপান্তর করা হচ্ছে। ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। যুক্তির জায়গা দখল করছে গালাগালি, গবেষণার জায়গা দখল করছে গুজব, আর রাজনীতির জায়গা দখল করছে উন্মত্ততা।
এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

একজন বামপন্থি হিসেবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের সংকট কেবল ব্যক্তি বা দলের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্রের সংকট। শাসক বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে–এই ধারণা বহুবার ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের প্রয়োজন রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করা, অর্থনীতিকে জনগণের নিয়ন্ত্রণে আনা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে মুক্তচিন্তার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক করা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেই পথের বদলে ব্যক্তিপূজা ও ব্যক্তিবিদ্বেষের চক্রে আটকে গেছি।

ফলে এক শাসকের পতনে আমরা উল্লাস করি, আরেক শাসকের উত্থানে আবার হতাশ হই। এই চক্র ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। বাংলাদেশের মুক্তি কোনো ব্যক্তি, কোনো ত্রাতা, কোনো বিদেশি শক্তি কিংবা কোনো অলৌকিক নেতৃত্বের হাতে নেই। বাংলাদেশের মুক্তি নিহিত আছে তার শ্রমিকের মধ্যে, কৃষকের মধ্যে, ছাত্রের মধ্যে, নারীর মধ্যে, সাংস্কৃতিক কর্মীর মধ্যে এবং সংগ্রামী জনগণের মধ্যে। কারণ ইতিহাসে জনগণই শেষ কথা।
আজ তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা কোথায় ভুল করেছি, কেন ভুল করেছি, কাদের ওপর অন্ধ বিশ্বাস করেছি, কেন রাষ্ট্রের মৌলিক প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করেছি–এসব নিয়ে সৎ আলোচনা প্রয়োজন। মোহভঙ্গ কষ্টের বিষয়। কিন্তু মোহভঙ্গ ছাড়া সত্যকে দেখা যায় না। সম্ভবত আমরা এখন সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।

আমরা দেখছি, শাসক বদলেছে; কিন্তু শোষণ রয়ে গেছে। স্লোগান বদলেছে; কিন্তু বৈষম্য রয়ে গেছে। মুখ বদলেছে; কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র খুব বেশি বদলায়নি। এ কারণেই আজ প্রশ্ন উঠছে–আমরা কি সত্যিই মুক্তির পথে এগিয়েছি, নাকি নতুন এক অন্ধকারের দিকে হাঁটছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।

কারণ একটি জাতির সর্বনাশ কখনো একদিনে ঘটে না। সর্বনাশ ধীরে ধীরে আসে। ইতিহাস বিকৃত হওয়ার মধ্যে দিয়ে আসে। সংস্কৃতি বিকৃত হওয়ার মধ্যে দিয়ে আসে। গণতন্ত্রকে দুর্বল করার মধ্যে দিয়ে আসে। জনগণকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আসে। আর যখন মানুষ বুঝতে পারে সর্বনাশ হয়ে গেছে, তখন অনেক ক্ষতিই ইতোমধ্যে ঘটে যায়। তবু আশা আছে। কারণ ইতিহাসের শেষ কথা কখনো ফ্যাসিবাদ নয়, কখনো কর্তৃত্ববাদ নয়, কখনো শোষণ নয়। ইতিহাসের শেষ কথা মানুষ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হবে জনগণের সংগ্রাম, গণতন্ত্রের পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে।
সেই লড়াই এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

লেখক: সহকারী ব্যবস্থাপক, নতুন দিগন্ত

অরণ্যের অন্ত্যজ কথা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
অরণ্যের অন্ত্যজ কথা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

...ঝড়, জল আর কালবৈশাখীর ঝঞ্ঝা বুকে নিয়ে যখন নতুন বছরের সূর্য ওঠে, তখন এক বুক শঙ্কা আর প্রার্থনা নিয়ে ‘গ্রাম রক্ষা’র মন্ত্রণায় মগ্ন হন লক্ষ্মণ মুন্ডা। শহর ছাড়িয়ে আট ক্রোশ দূরের মুন্সীবাজার, সেখান থেকে মহাসড়ক পেরিয়ে আরও দেড় ক্রোশ ধূলিমলিন পথ ভাঙলে তবেই দেখা মেলে করিমপুর চা বাগানের। মনু ভ্যালির এই গহীন কোণে কেবল মুন্ডারাই নন; কড়া, ভূমিজ, রিকিয়াসনসহ হরেক রকম আদিম জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান। ধর্মবিশ্বাসে বৈচিত্র্য থাকলেও বঙ্গাব্দের শুরুতে এসে তারা সবাই এক মোহনায় মেশেন। সেই মোহনার নাম ‘গ্রাম পূজা’। বছরের এই একটা সময়ে সব বিভেদ ভুলে প্রকৃতির আদিম উপাসনায় মেতে ওঠেন প্রান্তিকের এই মানুষ।

নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তার মানুষ মূলত প্রকৃতিরই সন্তান। তাদের উপাস্য আলাদা, পূজার নাম ভিন্ন, এমনকি একই দেবতাকে তারা ডাকেন নানাবিধ নামে। এই বৈচিত্র্যই যেন তাদের আধ্যাত্মিক পরিচয়কে আরও বিমূর্ত এবং রহস্যময় করে তোলে। সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তনে তাদের বহু প্রাচীন আচার আজ বিলুপ্তির পথে। তবু বাপ-ঠাকুরদার স্মৃতি আর বুনো সংস্কৃতির শেকড়টুকু আঁকড়ে ধরে আজও তারা টিকে আছেন পরম মমতায়।

 

কাদা-মাটির বেদি ও পঞ্চভূতের দর্শন

শহুরে জাঁকজমকপূর্ণ পূজার সঙ্গে তাদের কোনো মিল নেই। এদের পূজার সব উপকরণই অকৃত্রিমভাবে মেলে প্রকৃতির আঁচল থেকে। কাদা-মাটির বেদিতে কোনো জৌলুসপূর্ণ প্রতিমা থাকে না; কচি বাঁশের কাঠামোয় লাল সুতা বেঁধে, বুনো জবা আর দুধসাদা কাঠমালতি গুঁজে তারা অবয়ব দেন মনের ভেতরের দেবতাকে। তারা বিশ্বাস করেন প্রকৃতিই পরম মাতা। মা যেমন তার সন্তানকে স্তন্যপানে পরিপুষ্ট করেন, প্রকৃতিও তেমনি ফল, ফুল আর জলে তৃপ্ত করে মানবজাতিকে। তাদের আদিম বিশ্বাস মাটি, জল, বাতাস, আকাশ ও আগুন–এই পঞ্চভূতের আশীর্বাদেই মানবদেহের নির্মাণ এবং এর ভেতরেই অবসান। অঞ্চলভেদে কেউ আরাধনা করেন রাম, কৃষ্ণ বা কালীর; কেউ মাতেন ‘জাহের বঙ্গা’র বন্দনায়। মহামারি থেকে বাঁচতে অলমিক সমাজ যে ‘মাত্তালাম’ পূজা করে, তা মূলত শীতলা দেবীরই রূপ। আবার কালী বা বনদুর্গার পূজাকে তারা বলে ‘আমতেলি’। এই পূজার সুরের মিল পাওয়া যায় উত্তর জনপদের অমড়িয়া মালপাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর ‘আমলোবান’ পূজায়। মুন্ডাদের প্রধান দেবতা ‘জাহের বঙ্গা’ মূলত তাদের গ্রাম দেবতা। তার সন্তুষ্টির ওপরই নির্ভর করে গ্রামের আগামী বছরের নিরাপত্তা ও ফসলের প্রাচুর্য।

 

বিদঘুটে বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এক নীরব দ্রোহ

সনাতন হিন্দু সমাজের সঙ্গে এই নৃগোষ্ঠীর মৌলিক তফাৎটা গড়ে ওঠে পূজার পৌরোহিত্যে। সমতলের মানুষ যেখানে চক্রবর্তী বা কুলীন ব্রাহ্মণের ওপর পূজার ভার সঁপেন, সেখানে এই প্রান্তিক মানুষ বেছে নেন পাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মানুষকে। শ্রদ্ধাবনত এই পদের নাম ‘অসাই’। এই ‘অসাই’ নির্বাচন কেবল একটি ধর্মীয় নিয়ম নয়, এটি আসলে আমাদের তথাকথিত মূলধারার সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব ও কড়া প্রতিবাদ। প্রবল জাত্যভিমান আর ছুঁতমার্গের দেয়াল তুলে আমরা যুগে যুগে এই মানুষের ব্রাত্য করে রেখেছি। আমাদের সামাজিক মণ্ডপগুলোয় তাদের ঠাঁই হয়নি। আমাদের অবহেলা আর তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে এই অন্ত্যজ শ্রেণিটি সমাজ থেকে ক্রমশ দূরে সরতে সরতে আজ ঠাঁই নিয়েছে গহীন অরণ্যের প্রান্তে। আর তাই, শহুরে বর্ণপ্রথার সেই বিদঘুটে অহংকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা নিজেদের ‘অসাই’ নিজেই বেছে নেয়।

 

 

স্বকীয় কৃষি ও জল-প্রকৃতির মিতালী

প্রকৃতির এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের নিজস্ব ও অভিনব কৃষি অর্থনীতি। চা কলোনির পাশে এক চিলতে ধানি জমি, ছোট পুকুরের মাছ কিংবা বাড়ির কোণের আম-কলা-লেবু বাগানই এখন তাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। দেবতাকে তারা অন্য কোথাও থেকে কিনে আনা নৈবেদ্য দেয় না, উৎসর্গ করে নিজেদের ফলানো টাটকা ফসল। আমরা যখন সমতলে বসে উন্নত বীজ, সেচ আর রাসায়নিক কীটনাশক নিয়ে প্রতিনিয়ত হাহাকার করি, তখন এই প্রান্তিক মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব জৈব পদ্ধতিতে, নিজস্ব বীজতলার রক্ষণাবেক্ষণ করে ফলিয়ে চলছেন বিষমুক্ত ফসল। তাদের এই অভিনব কৃষি পাঠশালা আধুনিক বিজ্ঞানকেও চমকে দেওয়ার মতো। একই চিত্র তাদের জল ব্যবস্থাপনায়। সুপেয় জলের তীব্র সংকটে যখন ঝিরি বা নালার অস্বচ্ছ জলই তাদের ভরসা, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে তাদের প্রাচীন কুটির শিল্প। পূজার দিনগুলোয় মাটির কলসি ও ভাঁড়ের কদর বাড়ে। প্লাস্টিকের এই যুগে জল সংরক্ষণের জন্য মাটির কলসির এই পুনরুত্থান যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি ঐতিহ্যবাহী।

 

ক্যান্টনমেন্টের চেয়েও ছিমছাম এক স্বর্গভূমি

এই নৃগোষ্ঠীর পাড়ায় পাড়ায় ঘুরলে তাদের গৃহ ব্যবস্থাপনার নান্দনিকতায় মুগ্ধ হতে হয়। মেঠো পথে কোনো ঝরা পাতার আবর্জনা নেই, ঝোপঝাড়ের বিশৃঙ্খলা নেই। কাদা-মাটির লেপা উঠানগুলো এতটাই তকতকে যে, এক পলকে ভুল করে সামরিক সেনানিবাস বা কোনো পরিকল্পিত আধুনিক আবাসন বলে ভ্রম হতে পারে! বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের চুক্তিটা যেন অলিখিত। ঘরের পাশের সুবিন্যস্ত পুকুরগুলো বাস্তুতন্ত্রের একেকটি জীবন্ত উদাহরণ। সাপের উপদ্রব থাকা বড় জলাশয়গুলোয় মানুষের নামা নিষেধ। সেখানে ফোটা লালপদ্ম, শাপলা বা ভাঁটফুল ছেঁড়া পাপ–কেউ এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে না। প্রকৃতির প্রতি এই পরম শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তৈরি হয় তাদের নিজস্ব লোকজ স্তব ও স্তুতি। বৈদিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো তাদের নেই, কিন্তু লোকমুখে প্রচলিত পৌরাণিক কেচ্ছা আর সুরের মায়ায় তারা অনন্য। কোনো এক কালবৈশাখীর ঝরঝর বৃষ্টির রাতে যখন দেশোয়ালি বা নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ভাষায় এই জনপদের মায়েরা সুর তোলেন, বোনেরা গীত গান–তখন ভাষা না বুঝেও চোখ ভিজে আসে। স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার কী আকুল ও ঐকান্তিক প্রয়াস!

 

উৎসবের রং ও অন্তিম বাস্তবতা

এদের উৎসবে রং এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বসনে ও ভূষণে বিচিত্র রঙের ছোঁয়া। আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের প্রহর ভেদে বদলে যায় উৎসবের এই রং। তবে তাদের উৎসবের পোশাকের সুতায় হাত দিলে টের পাওয়া যায় অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক নিষ্ঠুর কশাঘাত। সস্তা সিনথেটিক বা পলিয়েস্টারের কাপড়ে ঢাকা পড়ে যায় তাদের উৎসবের জৌলুস। একটু সচ্ছলতার মুখ দেখলে তবেই গজ কাপড় কিনে শার্ট বা মায়েরা বছরে বড়জোর একটা তাঁতের শাড়ির বিলাসিতা করতে পারেন। তবু এই অভাব, অবহেলা আর প্রান্তিকতার ভেতরেও তাদের উৎসবের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। সমতলের তথাকথিত সুশীল সমাজের মতো জাত্যভিমান বা ছুঁতমার্গ নেই ওদের ডেরায়। সেখানে সবার একটাই পরিচয়–মানুষ। শহুরে বাবুদেরও তারা বুকে টেনে নেয়, মেতে ওঠে উদ্বাহু নৃত্যগীতে। কারণ তারা জানে, মানুষ আর প্রকৃতির চেয়ে বড় সত্য এই চরাচরে আর দ্বিতীয়টি নেই। প্রান্তিকের এই বুনো উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শেকড়কে ভুলে আমরা যতই যান্ত্রিক হই না কেন, দিনশেষে আমাদের ফিরতে হবে প্রকৃতির এই আদিম পাঠশালাতেই।

 

লেখক: সাংবাদিক, আলোকচিত্রী

 

 

বিশেষ কৃতজ্ঞতা

হরেন্দ্রনাথ সিং, পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, রাজশাহী

পরিমল সিংহ বাড়াইক, সভাপতি, চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্ট

লক্ষ্মণ মুন্ডা, সাধারণ সম্পাদক, মুন্ডা সমাজ কল্যাণ পরিষদ

নৃপেন মুন্ডা, চা শ্রমিক নেতা, দরগাবিল, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ

ছোটন সর্দার, অমড়িয়া মালপাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, নাটোর