হিজরি দ্বিতীয় বছরের ১৭ রমজান মদিনার অদূরে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর নামক স্থানে মুসলমানদের সঙ্গে কাফেরদের প্রথম সন্মুখ যুদ্ধ হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ বদরের যুদ্ধ নামে পরিচিত। তা ছিল নবীন ইসলামি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্নে অতীব তাৎপর্যপূর্ণ।
আল্লাহ বলেন, ‘দুটি দলের পরস্পর সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। একদল আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছিল, অন্যদল কাফের ছিল, তারা তাদের চোখের দেখায় দ্বিগুণ দেখছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয়ই এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের জন্য শিক্ষা রয়েছে। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩)
আল্লাহ বলেন, ‘এবং আল্লাহ তোমাদের হীন অবস্থায় বদর যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করেছেন, সুতরাং আল্লাহকে ভয় করে চলো, যেন তোমরা শোকরগুজার হতে পারো।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১২৩-১২৬)
মুসলমানদের হাতে বন্দি শত্রু সৈন্যরা পরবর্তীকালে সাক্ষ্য দেয় যে, যুদ্ধের সময় তারা মুসলমান বাহিনীকে দ্বিগুণ অবস্থায় দেখে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সমর কৌশলে এবং আল্লাহর সাহায্যে তা সম্ভবপর হয়েছিল। যুদ্ধের প্রাক্কালে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের সাহায্য করব এক সহস্র ফেরেশতা দিয়ে, যারা একের পর এক আসবে। আল্লাহ তা করেন শুধু শুভ সংবাদ দেওয়ার জন্য এবং এ উদ্দেশ্যে যাতে তোমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করে; এবং সাহায্য তো শুধু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৯-১০)
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণকারীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ইসলামের প্রসার-প্রয়াসকে অঙ্কুরেই সমূলে ধ্বংস করার জন্য মক্কায় কোরাইশ বংশের অধিপতিরা বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তাদের এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেয় স্থানীয় ইহুদি ও অদূরবর্তী কিছু খ্রিষ্টান। আবু সুফিয়ান ছিলেন বড় ব্যবসায়ী। তার ব্যবসা কাফেলা সিরিয়ার পথে যাতায়াত করত। আবু সুফিয়ানের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিখ্যাত কোরাইশ নেতা ও যোদ্ধা আবু জাহেলের সক্রিয় অংশগ্রহণে বদর প্রান্তরে এ যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়।
ইসলামের প্রতিষ্ঠালগ্নে, যখন এর শত্রুরা ছিল প্রবল ও পরাক্রমশালী, তখন সংখ্যায় স্বল্পতা হেতু মুসলমানরা ছিল স্বাভাবিকভাবেই হীনবল। সে সময় আল্লাহর সাহায্য ছিল অপরিহার্য। মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে অভয়বাণী আসায় সংখ্যায় ও সামর্থ্যে তিন গুণ শক্তিশালী শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় শামিল হওয়া সম্ভব হয়েছিল। বদরের যুদ্ধে নবদীক্ষাপ্রাপ্ত মুসলমানদের আল্লাহর সাহায্যে সূচিত বিজয় প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘(আল্লাহ) সত্যকে সত্য, অসত্যকে অসত্য প্রতিপন্ন করেন।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৮)
হিজরি দ্বিতীয় সনে সুরা বাকারার ১৮৩-১৮৫ ও ১৮৭ আয়াত অবতীর্ণ হলে মুসলমানদের জন্য রোজা পালন আবশ্যকীয় (ফরজ) ঘোষণা করা হয়। সে বছরই বদর যুদ্ধের সময় মুসলমানরা প্রথমবারের মতো রমজান মাসে রোজা পালন করছিলেন। রমজান মাসে বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা শৈর্য, বীর্য, ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিল।
বিপদে-আপদে সমরে, ষড়যন্ত্রে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা ও তা পাওয়ার মতো গৌরবের কিছু নেই। তাকওয়া বা খোদাভীতি এ সাহায্য প্রার্থনা ও প্রাপ্তিতে এক অনুপম প্রেরণার উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। রমজান মাসে রোজার মধ্যে বদরের যুদ্ধের ঘটনা নবীন ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার প্রেক্ষাপটে এক অবিনাসী প্রত্যয় ও প্রতীতি দান করেছিল। ইতিহাসের সাক্ষ্য এই ইসলামের চরমতম সংকটকাল অতিক্রমে রমজানের মহিমা বিশেষ শক্তি জোগায়।
লেখক: সরকারের সাবেক সচিব ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর