হাদিসের ভাষায় কালিমা, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত হলো—ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক পাঁচটি ভিত্তি। আর রমজান মাস হলো, পূর্ণ এক বছরে মাত্র ত্রিশটি ফরজ রোজা আদায় করা। সিয়াম সাধনা এবং তাকওয়া তথা খোদাভীতি অর্জন করার মাস। গুনাহসমূহকে বর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভের মাস।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন— হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর (রমজানের) রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। তথা আল্লাহভীতি অর্জন করতে পারো। (সুরা বাকারা : ১৮৩)
আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার আশা নেই এমন কে আছে? কাজেই আমাদেরকে স্মরণে রাখতে হবে, আল্লাহর নৈকট্য লাভের অপূর্ব এক মৌসুম হলো মাহে রমজান। জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করাই হলো মুমিন বান্দার জীবনের এক পরম পাওয়া। আর এ মাসেই রয়েছে গুনাহ থেকে মুক্তির ঘোষণা এবং তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি লাভ করার ঘোষণা।
আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ এবং গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার জন্য তাকওয়া অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। তথা আল্লাহর ভয় এবং পরকালীন শাস্তি ও জবাবদিহিতা থেকে বাঁচতে, আল্লাহর বিধান মেনে চলা, হারাম থেকে বিরত থাকা এবং হালাল বিষয়াবলিকে প্রাধান্য দেওয়াই হলো আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া। আল্লাহর বিধান পালনে হারাম কার্যাবলি পরিহার করাই তাকওয়া। আল্লাহভীতি অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। একমাত্র আল্লাহভীতিই পারে মানুষকে যাবতীয় অন্যায়-অনাচার, পাপাচার ও দুর্নীতি থেকে বিরত রাখতে। আর রমজান হলো এই তাকওয়া অর্জন তথা আল্লাহভীতি অর্জনের মাস। উপর্যুক্ত এ আয়াত থেকে আমরা আরও একটি বিষয় জানতে পারি তা হলো—রোজা শুধু আমাদের জন্যই ফরজ বা আবশ্যক নয়। বরং পূর্ববর্তী আরও অনেক জাতির জন্যও এটি আবশ্যক ছিল।
রোজার বিনিময় সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে রাসুল (সা.) বলেন—আল্লাহতায়ালা বলেন– আদম সন্তানের প্রতিটি আমলই তার (নিজের) জন্য। তবে রোজার ব্যাপারটি ভিন্ন। আর রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব। (বুখারি: ১৮০৫)
এ ছাড়া রোজা ও কিয়ামুল লাইলের বিনিময়েও রয়েছে গুনাহ মাফের ঘোষণা। গুনাহ বা পাপ করেনি- এমন মানুষ খুব কমই আছে বললে ভুল হবে না। তাই আমাদের প্রত্যেকের জন্য উচিত হবে, গুনাহ থেকে মুক্তিলাভের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এ মাসকে মূল্যায়ন করা। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য চেষ্টা করা।
বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন—যে ব্যক্তি রমজানের রাতে ইমানসহ পুণ্যের আশায় রাত জেগে (তারাবি ও তাহাজ্জুদ আদায়ের মাধ্যমে) ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ্গুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারি : ৩৭)
এমনিভাবে সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইমানসহ পুণ্য লাভের আশায় রমজানের সিয়াম—রোজা পালন করে, তার পূর্বের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (সহিহ বুখারি : ৩৮)। উপর্যুক্ত হাদিস দুটিও আমাদেরকে স্পষ্ট করে যে, মাহে রমজানে রোজা রাখা এবং রাত জেগে তারাবি ও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার মাধ্যমেই রয়েছে গুনাহ মাফের ঘোষণা। তাই রমজানের রোজা রাখার বিষয়ে আমাদের প্রত্যেককেই সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একইভাবে রাতের ইবাদতের প্রতিও মনোযোগী হওয়া জরুরি। কারণ, এ দুটি আমলের বিনিময়ে রয়েছে গুনাহ মাফের ঘোষণা।
আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের রোজা, তারাবি ও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার সুযোগ দান করুন। এ দুটি আমলের মাধ্যমে গুনাহমুক্ত জীবনলাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর