তারাবি শব্দটিও আরবি। অর্থ আরাম করা বা বিশ্রাম করা। চার রাকাত নামাজ আদায় শেষে বিরতির সঙ্গে বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে এই নামাজ আদায় করা হয় বলে একে ইসলামি পরিভাষায় তারাবির নামাজ বলা হয়। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নামাজ পড়লেন। তার অনুসরণ করে অনেক লোক নামাজ পড়ল। অতঃপর পরের রাতে নামাজ পড়লেন, আরও বেশি লোক সমবেত হলো। তৃতীয় রাতে লোকেরা জমায়েত হলে তিনি (রাসুল) বাসা থেকে বের হলেন না। ফজরের সময় তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন, আমি তোমাদের আগ্রহ লক্ষ করেছি। তোমাদের সঙ্গে (তারাবির নামাজের জন্য) বের হতে আমার কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু আমি আশঙ্কা করলাম, ওই নামাজ তোমাদের জন্য ফরজ করে দেওয়া হবে। আর এ ঘটনা হলো রমজানের।’ (বুখারি, ২০১২)
এভাবেই মূলত তারাবির নামাজের প্রচলন ঘটেছে। মুসলিম নারী-পুরুষ সবার জন্য তারাবির নামাজ আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) কিয়ামে রমজানের ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন; কিন্তু তিনি বাধ্যতামূলকভাবে আদেশ দিতেন না। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি ঈমান রেখে সওয়াবের আশায় রমজানের কিয়াম (সালাতুত তারাবি) আদায় করবে, সে ব্যক্তির পূর্বকৃত সব পাপ মাফ হয়ে যাবে। (বুখারি, ২০০৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘ইমাম সাহেব নামাজ (তারাবির নামাজ) শেষ করা পর্যন্ত তার সঙ্গে যে নামাজ আদায় করবে, সে পূর্ণ এক রাত নামাজ আদায়ের সওয়াব পাবে।’ (তিরমিজি, ৮০৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তারাবির নামাজ সম্পর্কে আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুলল্লাহ (সা.) চার রাকাত নামাজ পড়তেন। আর তুমি সেই নামাজের সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করো না অতঃপর তিনি আরও চার রাকাত নামাজ পড়তেন। সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করো না (অর্থাৎ সেই নামাজ অত্যন্ত সুন্দর ও দীর্ঘ হতো)। অতঃপর তিনি তিন রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করতেন।’ (বুখারি, ১১৪৭)। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, রমজানের রাতে রাসুল (সা.) কত রাকাত নামাজ পড়তেন? উত্তরে তিনি বললেন, তিনি রমজানে এবং অন্যান্য মাসেও ১১ রাকাত অপেক্ষা বেশি নামাজ পড়তেন না। (বুখারি, ১১৪৭)
সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, ওমর (রা.) রমজানের রাতে লোকদের একত্রিত করলেন। এরপর উবাই ইবনে কাব এবং তামিম আদ-দারিকে ইমাম করে ২১, অন্য বর্ণনামতে, ২০ বা ২৩ রাকাত নামাজ পড়লেন। নামাজে প্রায় এক শ’র মতো আয়াত তেলাওয়াত করতেন এবং ভোর হওয়ার আগে তারা নামাজ শেষ করতেন। এ বর্ণনাটি সহিহ। ওমর (রা.)-এর আমলে ২০ রাকাত করে জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজ পড়ার প্রচলন শুরু হয়। (আল-ফাওয়ায়িদ; আবু বকর নিশাপুরী, পৃষ্ঠা: পৃ. ১৪)
অধিকাংশ আলেমের মতে, এ ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে নামাজ আদায়কারীর ওপর নির্ভরশীল। যদি কেউ মনে করেন, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়, তা হলে সে ১০ রাকাত তারাবি পড়ে এবং তিন রাকাত বিতর পড়বে। কারণ এটাই ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন, সে বেশিক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম, তাহলে সে ২০ রাকাতও তারাবি পড়তে পারে, কারণ এটা ইমাম আহমাদ (রহ.)-সহ বহু ইমামের মতামত। তবে তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে কোনো ধরনের তর্ক-বিতর্ক ও বিভাজন ঘটানো হারাম। (মাজমুউল ফাতাওয়া, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, ২২/২৭২)
লেখক: প্রিন্সিপাল মাদরাসা ফাতিমাতুজ জাহারা (রা.), মোহাম্মাদপুর, ঢাকা