ভ্যাট আইনকে ব্যবসাবান্ধব করতে প্রথমে ৫৫২ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তিনবার সংশোধন করায় তা ৬৯০ কোটি টাকায় ঠেকে। নির্ধারিত চার বছরে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে আড়াই বছর সময় বাড়ানো হয়। এতে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫০ শতাংশ। ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ বাস্তবায়ন (ভ্যাট অনলাইন)’ নামে প্রকল্পের বাস্তব চিত্র এটি। এ প্রকল্পের আওতায় অন্য কাজের সঙ্গে প্রকল্প কর্মকর্তাদের যাতায়াতের জন্য চারটি গাড়িও কেনা হয়। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ অনেক আগে শেষ হলেও পরিবহন পুলে গাড়িগুলো জমা হয়নি। সেই গাড়িগুলোর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এসব গাড়ি কারা কীভাবে ব্যবহার করছেন, তার কোনো তথ্য পায়নি আইএমইডি। বিশ্বব্যাংকের ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সার্বিক ব্যাপারে জানতে প্রকল্প পরিচালক ও কমিশনার (কাস্টমস এক্সসাইজ ও ভ্যাট) কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব টাকা লাগেনি। তাই খরচ কম হয়েছে। পরামর্শক খাতে ১৪৩ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছিল। আমার আগের পিডিরা ৫০ কোটি টাকা খরচ করেছেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর পরামর্শক খাতে কোনো টাকা খরচ করিনি। এ জন্য টাকা কম খরচ হয়েছে। তবে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক অটোমেশনের পুরো কাজ হয়েছে। সবাই উপকার পাচ্ছেন।’ গাড়ি জমা না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি আমার অথরিটি (কর্তৃপক্ষ) এনবিআরের কাছে গাড়ি বুঝিয়ে দিয়েছি।। তারা পরিবহন পুলে জমা দিয়েছে কি না আমি জানি না। এটা তারা জানে।’
এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘নতুন ভ্যাট আইন, ২০১২-এর আওতায় অটোমেশনের প্রকল্প ছিল এটি। কিন্তু পরে আইন পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পের কাজ দেরি হয়েছে। কিছুটা বিফলে গেছে। কিন্তু পরিবহন পুলে গাড়ি জমা হয়নি- এটা দুঃখজনক। কেন জমা হয়নি এনবিআর তা বলতে পারবে। এই অনিয়মের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এটা উদ্বেগের বিষয়। এভাবে চলতে থাকলে অন্যরাও নিয়ম ভাঙবে।’
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ-আইএমইডি চলমান প্রকল্পের সঙ্গে সমাপ্ত প্রকল্পেরও মনিটরিং ও মূল্যায়ন করে। নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এজেন্সি বা সংস্থা বা অধিদপ্তর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে প্রকল্প সমাপ্তকরণ রিপোর্ট (পিসিআর) তৈরি করে আইএমইডিতে জমা দেবে। তারপর সেই প্রকল্পটি আইএমইডি মনিটরিং করে দেখে যে উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পটি মনিটরিং করা হয়। এ প্রকল্পটি ২০১৩ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। প্রথমে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর অনুমোদন দেওয়া হয়। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু এ সময়ে কাজের কাজ কিছু হয়নি। পরে সময় বাড়ানো হয় আড়াই বছর। অর্থাৎ ২০২১ সালের জুনে শেষ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। এভাবে সময় বাড়ানো হয়েছে ৪৮ শতাংশ। প্রথমে খরচ ধরা হয়েছিল ৫৫২ কোটি টাকা। তিনবার সংশোধন করে সেই খরচ দাঁড়ায় ৬৯০ কোটি টাকায়। কিন্তু প্রকৃত খরচ হয়েছে ৩৪৮ কোটি টাকা।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল- মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইনকে ব্যবসাবান্ধব করা। রাজস্ব ফাঁকি চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ভ্যাট প্রশাসনকে অধিকতর আধুনিক, সুশৃঙ্খল ও সেবাধর্মী করা। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে ব্যবসায়ীরা ভালোই উপকৃত হয়েছেন। তারা সরাসরি না গিয়ে ঘরে বসেই ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন। অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না।
প্রথমে প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট পলিসির সদস্য ব্যারিস্টার জাহাঙ্গীর হোসাইন। এরপর সদস্য রেজাউল হাসান ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি। তৃতীয় নম্বর পিডি হিসেবে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন কমিশনার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান। এ ছাড়া ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সর্বশেষ পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কমিশনার (কাস্টমস এক্সসাইজ ও ভ্যাট) কাজী মোস্তাফিজুর রহমান। তারা সবাই পিডি হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। তাই অনেক কিছুর ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণাও নেই।
জানা গেছে, মূল্য সংযোজন আইন ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ ১০১৭ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে অনলাইন ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, অনলাইন রিটার্ন সাবমিশন করতে পারছেন। এর ফলে করদাতারা অনলাইনে মূসক নিবন্ধন গ্রহণ, অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কর পরিশোধে সক্ষম হচ্ছেন। এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এনবিআরের বিভাগীয় দপ্তরের আওতাধীন সার্কেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে শুল্ক ও আয়কর অনুবিভাগের অটোমেশন কার্যক্রম চালু হওয়ায় ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে করদাতাদের এবং নতুন নিবন্ধনযোগ্য মূসক প্রদানকারীদের অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন, রিটার্ন দাখিল, ই-পেমেন্ট ও রাজস্ব আদায় আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ২৭ আগস্ট বাস্তবায়িত কার্যক্রম মনিটরিং করে আইএমডি থেকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে প্রথমে ৫৫২ কোটি টাকা খরচ ধরা হলেও সংশোধন করে ৬৯০ কোটি টাকায় আনা হয়। কিন্তু খরচ হয়েছে ৩৪৮ কোটি টাকা বা ৫০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তবে পিসিআরে অঙ্গভিত্তিক বাস্তব বা ভৌত অগ্রগতি উল্লেখ করা হয়নি। প্রকল্পটির ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ১১টি অডিট আপত্তি রিপোর্ট অনিষ্পন্ন রয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চারজন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হওয়ায় তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা খরচ করে চারটি গাড়ি কেনা হয়েছে। এরমধ্যে তিনটি মাইক্রোবাস ও একটি কার। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে পরিবহন পুলে গাড়ি জমা দিতে হয়। কিন্তু এই প্রকল্পে তার ব্যত্যয় হয়েছে। গাড়িগুলো কোথায়, কারা ব্যবহার করছেন তা জানা যায়নি। বিধি মোতাবেক প্রকল্পের যানবাহন ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা খরচ করে বিপুল আসবাবপত্র কেনা হলেও তার গায়ে কোনো লেবেল দেওয়া হয়নি।