গত কয়েক বছর ধরে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার সিন্ডিকেটের দখলে। এ সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্য দাম পায় না চামড়া সংগ্রহকারীরা। বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারি উদ্যোগে চামড়া সংরক্ষণে আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও সরকারের সেদিকে নজর নেই বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু তাই নয়, চামড়া খাতের অন্যান্য সংকট কাটিয়ে উঠতেও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিগত দিনের মতোই সরকারি নীতিনির্ধারকরা বক্তব্য দিতে আর পরিকল্পনা করতেই ব্যস্ত।
- চামড়ার বাজার সিন্ডিকেটের দখলে
- সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না
- চামড়া সংরক্ষণে আধুনিক ব্যবস্থা নেই
গত এক যুগ ধরে কোরবানির চামড়া বিক্রির চিত্র প্রায় একই। চামড়া সংগ্রহকারীরা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে পারেন না। কৌশলে বেশির ভাগ ট্যানারির মালিক ও আড়তদার চামড়া কিনতে সময় ক্ষেপণ করেন। এতে চামড়া পচে যেতে থাকে। বাধ্য হয়েই অনেক সংগ্রহকারী তাই কম দামে বিক্রি করে দেন। অনেক সময় দাম এত কম ধরা হয় যে, সংগ্রহকারীদের পরিবহন খরচও উঠে না। ফলে চামড়া বিক্রি না করে তারা ফেলে দেন। অনেক সময় মাটির নিচে পুঁতে ফেলেন।
সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চামড়া সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা নেই। ট্যানারিতে কাঁচা চামড়া ও প্রক্রিয়াজাত চামড়া সংরক্ষণে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ফলে এসব পণ্য নষ্ট হয় না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার ওপর নির্ভর করে এদেশের চামড়া শিল্প গড়ে উঠেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের পরই চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। এ শিল্পের ওপর নির্ভর করে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। অথচ সরকারকে এই খাতের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিসিকের বিভিন্ন শিল্প নগরীতে খালি প্লটে চামড়া সংরক্ষণের জন্য কারখানা করা সম্ভব। এ বিষয়ে সরকারকে অনেক বছর ধরে বলে এলেও এখনো পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এবারও চামড়া বিক্রি নিয়ে সেই আগের চিরচেনা অব্যবস্থাপনা দেখা যাবে বলে আশঙ্কা করছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীলরা কোরবানির চামড়া বিক্রি নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে দেখেছি। সংগ্রহ থেকে বাজারজাত পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিগত সরকারদের দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের জন্য তেমন কিছু চোখে পড়েনি।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার চামড়া বিক্রিতে অস্থিরতা এড়াতে সরকার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছে। চামড়া ছাড়ানোর ৮-১০ ঘণ্টার মধ্যে সঠিক পরিমাণে লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য জোর দিয়েছে সরকার। চামড়া সংরক্ষণের জন্য ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিনামূল্যে বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় ব্যবসায়ী, মসজিদ ও মাদ্রাসার মাধ্যমে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সমগ্র বিষয় নজরদারি করা হচ্ছে। এবার প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন মসজিদ ও মাদ্রাসার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি টেলিভিশন, পত্রিকা ও লিফলেটের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির খবরের কাগজকে বলেন, বিগত সরকারগুলোর অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে চামড়া সংরক্ষণ থেকে বিক্রি–সব ক্ষেত্রেই অনিয়ম দেখা গেছে। চামড়া খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে। এবারের কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার চেষ্টা করছে।
তবে চামড়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সরকারের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে চামড়া খাতে গতি আসছে না। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ট্যানারির মালিকরা চেষ্টা করবে সরকারের বেঁধে দেওয়া মূল্যে চামড়া কিনতে। তবে কোনো চামড়া সংগ্রহকারী বেশি দামে চামড়া কিনলে আমাদের পক্ষে আরও বেশি দাম দিয়ে কেনা সম্ভব হবে না।
ব্যবসায়ী এই নেতা আরও বলেন, সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘এলডব্লিউজি’ সনদ পাচ্ছে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনা কমিয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়েছে। এ বিষয়ে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।