বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ ও বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করবে– অর্থ কীভাবে ও কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে তার ওপর।
যদি এই অর্থ উৎপাদনমুখী–বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), রপ্তানিমুখী শিল্প, কৃষি ও শ্রমঘন খাতে সঠিকভাবে পৌঁছায়, তাহলে এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে নীতিগত জটিলতা, শুল্ক ও কর ব্যবস্থার জটিলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা– এসব ঠিক না হলে শুধু অর্থ ঢেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন বলে জানিয়েছেন তারা।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, কর্মসংস্থান বা প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা শুধু ঋণের অভাব নয়। ফ্যাক্টরি চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে নানা কারণে– বাজারে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা, জ্বালানিসংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা–বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনা। ফলে শুধু অর্থের জোগান দিলেই যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে, সে নিশ্চয়তা নেই।
এই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজেও আবার বিস্তারিত কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে। তবে এই অর্থ কীভাবে বিতরণ হবে, কোন খাতে কত যাবে¬–এসব বিষয় বিস্তারিত সার্কুলারের মাধ্যমে জানানো হবে। সুদের হার নিয়েও কিছু ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, যথাযথ নজরদারি না থাকলে এই ধরনের বড় তহবিল সীমিত কিছু ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যেতে পারে। এতে আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়তে পারে, মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারেও অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ার যে প্রত্যাশা, তা পূরণ না-ও হতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। গভর্নর অন্তত সমস্যার অস্তিত্ব স্বীকার করছেন এবং অনিয়ম–বিশেষ করে ঋণ অনিয়ম বা এনপিএল-কে যে তিনি স্পষ্টভাবে ‘চুরি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। সাধারণত এমন স্বীকারোক্তি খুব কমই দেখা যায়। এটি বাস্তবতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এই ঋণ কর্মসূচি মনিটরিংয়ের কথা বলা হলেও, সেখানে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। কারণ এই ধরনের ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
একই বিষয়ে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে ঋণের অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ্য বাস্তবায়নে সঠিক দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে ঋণের টাকা পৌঁছাতে পারলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে। তাহলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে।
দেশের ব্যবসায়ীরাও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে এই প্যাকেজের অর্থঋণ কারা পাবেন, কীভাবে পাবেন সেই বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দরকার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলেও এটি একমাত্র শর্ত নয়। বর্তমানে দেশে মূলত উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা, উচ্চ সুদের হার, ডলারসংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, আমদানি সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। এ জন্য আমরা সরকার এবং গভর্নরকে সাধুবাদ জানাই। তবে এই প্রণোদনা প্যাকেজ কারা পাবে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ আগেই অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলোর মেশিন অনেকে বিক্রি করে ফেলেছেন। তাই যে শিল্প-কলকারখানাগুলো বন্ধের পথে বা রুগ্ণ সেগুলোকে সহায়তা দেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও যেন সহজ শর্তে এই সহায়তা পায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ দেশে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করেন ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই। প্রণোদনার অর্থ যদি উৎপাদন বাড়াতে, নতুন বিনিয়োগ আনতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া বা সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে কয়েক লাখ নতুন ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ দিলেই হবে না, বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় প্রণোদনার সুবিধা প্রকৃত উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছাতে বিলম্ব হয় বা বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেদিকে নজর না দিলে প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না।
প্রবৃদ্ধির দিক থেকে দেখলে, এই প্যাকেজ স্বল্পমেয়াদে বাজারে চাহিদা বাড়াতে এবং বিনিয়োগে কিছুটা আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। উৎপাদন ও ভোগ—দুই ক্ষেত্রেই গতি এলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু প্রণোদনা নয়, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে, গত শনিবার বন্ধ কারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বন্ধ কারখানাগুলো পুনঃঅর্থায়ন ও পুনরায় চালুর কাজে ব্যবহার করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই প্যাকেজের মাধ্যমে ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গ্রাহক পর্যায়ে বড় শিল্পের ঋণের সুদের হার হবে ৭ শতাংশ। তবে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে সুদের হার কিছুটা বেশি হতে পারে। এই তহবিল থেকে বৃহৎ শিল্প, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং কৃষি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হবে।