নিত্যপণ্যের অবৈধ মজুত বন্ধে নতুন একটি আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ইতোমধ্যে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিতরণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন-২০২৪’ নামে আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রণীত আইনের খসড়ায় শাস্তি হিসেবে ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনের প্রয়োজনীয়তায় উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে ‘দি কন্ট্রোল অব এসেন্সিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট-১৯৫৬ বলবৎ রয়েছে। বিদ্যমান আইনটির স্থলে অধিকতর যুগোপযোগী ও হালনাগাদ করতে নতুন আইনটির খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। খসড়া প্রণয়নে কৃষি, খাদ্য, শিল্প, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এবং কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতামত নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় নিত্যপণ্য বা অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় খাদ্যদ্রব্য ধান, চাল, গম, আটা, ভুট্টা, আলু, বীজ ও চারা, মসুর ডাল, ছোলা, ভোজ্যতেল ও তৈলবীজ, পেঁয়াজ, রসুন, শুকনা ও কাঁচা মরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, ধনিয়া, জিরা, আদা, হলুদ, খাবার লবণ (বিট লবণ ব্যতীত), চিনি, গুড়, মাছ, মৎস্যজাত খাদ্য, মাংস, দুধ, ডিম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিশুখাদ্য, রোগীর পথ্য এবং অনুরূপ খাদ্যদ্রব্য, ওষুধকে (ইনজেকশনসহ) অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় রাখা হয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসা ও শল্য চিকিৎসাসহ অন্য সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি, কাগজ, নিউজপ্রিন্ট, কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার, জ্বালানি তেল (পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল), গ্যাস (পাইপলাইনে সরবরাহ করা গ্যাস, এলএনজি, এলপিজি ও অন্য কোনো রূপান্তরিত পেট্রোলিয়াম) সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক দ্রব্যাদি, বিদ্যুৎ (সৌরবিদ্যুৎসহ), লোহা, ইস্পাত এবং সিমেন্টকেও অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আইনের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ভবিষ্যতে সময়ে সময়ে সরকারি আদেশ দিয়ে তালিকায় আরও যেকোনো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য অন্তর্ভুক্ত ও তালিকা থেকে যেকোনো পণ্য বাদ দিতে পারবে।
আইনের খসড়া প্রস্তাবের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, সরবরাহ, বিক্রয়, নিষ্পত্তি, অধিগ্রহণ, ব্যবহার বা ভোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে যেকোনো সময় আদেশ জারির মাধ্যমে (ক) লাইসেন্স, পারমিট বা অন্য কোনোভাবে কোনো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উৎপাদন বা প্রস্তুতকরণ, মজুত, পরিবহন, বিক্রয়, নিষ্পত্তি, অধিগ্রহণ, ব্যবহার বা ভোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। (খ) বিক্রয়ের জন্য রাখা কোনো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বিক্রয় স্থগিত বা নিষিদ্ধ করতে পারবে। (গ) কোনো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের কেনাবেচার মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে। (ঘ) কোনো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মজুতদার যেকোনো ব্যক্তিকে তার মজুত করা পণ্যের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ আদেশে উল্লিখিত মূল্যে বিশেষ ব্যক্তিবর্গ বা বিশেষ শ্রেণির ব্যক্তিদের কাছে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিক্রি করার নির্দেশ দিতে পারবে। (ঙ) কোনো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ/বণ্টন, ব্যবসায় বা বাণিজ্যে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এ সংক্রান্ত যেকোনো প্রমাণ এবং তথ্য সরবরাহ করার নির্দেশ দিতে পারবে। (চ) কোনো ঘটনা ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষভাবে কোনো স্থান, যানবাহন, জাহাজ এবং আকাশযানে প্রবেশ ও তল্লাশি করতে পারবে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কর্মকর্তা পরিদর্শনের সময় লাইসেন্স মঞ্জুর বা ইস্যু, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে ত্রুটি বা সরকারি আদেশ অমান্যের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পণ্য নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করতে পারবে।
এ জন্য ধারা (৩) উপধারা (১) এর অধীনে প্রণীত আদেশ দিয়ে সরকার, কোনো সরকারি কর্মচারী বা সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমতা অর্পণ বা দায়িত্ব দিতে পারবে।
অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ৫ ধারায় বলা হয়েছে, (১) প্রয়োজন হলে জনস্বার্থে সরকার যেকোনো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানি ও রপ্তানি উন্মুক্ত বা নিষিদ্ধ করতে পারবে। (২) অত্যাবশ্যকীয় কৃষিপণ্যের উৎপাদন মৌসুম ও স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ হ্রাস-বৃদ্ধি বিবেচনায় ভোক্তা সাধারণের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনে, ওই সব কৃষিপণ্যের আমদানি এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে মৌসুমি শুল্ক কাঠামো প্রবর্তন করতে পারবে। একই ধারার উপধারা (৪) এ বলা হয়েছে সরকার, অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য সুলভে নিম্ন আয়ের জনগণের মধ্যে বিক্রির লক্ষ্যে, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ ও অন্য যেকোনো সরকারি দপ্তর বা সংস্থাকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয়ের ক্ষমতা অর্পণ করতে পারবে।
‘অপরাধ ও দণ্ড’ সম্পর্কে প্রস্তাবিত আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি এই আইনের ৪ ধারার অধীন কোনো আদেশ লঙ্ঘন বা অমান্য করলে ৩ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে যুক্ত জলযান, যানবাহন বা পশু সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কথাও বলা হয়েছে খসড়া প্রস্তাবে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি যাকে ৪ ধারার (৪) উপধারা অনুযায়ী নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তিনি যদি তা প্রতিপালনে ব্যর্থ হন, তবে তিনি ৩ বছর মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৩ লাখ টাকা অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
খসড়ার ১১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি মিথ্যা বিবৃতি বা তথ্য দিলে, ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
১৭ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী এই আইনে যে দায়িত্ব পালন করবেন, সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা অভিযোগ আমলযোগ্য হবে না।
ধারা ১২ অনুযায়ী প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন সরকারি ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীর লিখিত প্রতিবেদন ছাড়া এই আইনের শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ কোনো আদালত আমলে নিতে পারবেন না।