জানালা দিয়ে প্রায়ই অনেকে ছোট ছোট ময়লা বাইরে ফেলেন। এভাবে ভবনের নিচে একসময় ময়লার স্তূপ জমে যায়। বিশেষ করে দুই ভবনের মাঝে। কারণ সেখানে খুব একটা কেউ যায় না। পরিষ্কারও করা হয় না।
এসব জায়গায় ফেলা ময়লায় ডিম পাড়ে অ্যাডিস মশা। বৃষ্টি হলেই ওই ময়লায় পানি জমে হয়ে ওঠে হটস্পট। বিস্তার লাভ করে অ্যাডিস মশা। আর তাতেই আক্রান্ত হন আশপাশের বাসিন্দারা।
অ্যাডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে লার্ভিসাইড ছিটাতে গিয়ে দুই ভবনের মাঝের ময়লা নিয়ে খুবই বিরক্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। বিভিন্ন এলাকায় দুই ভবনের মাঝে যাওয়া মুশকিল। কোথাও খুব সরু। আবার কেউ কেউ গেট বানিয়ে তালা দিয়ে রাখেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের বোতল, বোতলের মুখ, পলিথিন, চিপসের খোসা, বিস্কুটের খোসা, কসমেটিকসের মোড়ক, আইসক্রিমের কৌটা, খাবারের প্যাকেটসহ নানা কিছু ফেলা হয় জানালা থেকে। অনেক বাসার ছোট বাচ্চারা তো ফেলেই। তার চেয়ে বেশি ফেলেন বাসার গৃহিণী বা গৃহকর্মীরা। বিশেষ করে কিচেনের কাছের জানালা দিয়ে নিচে ময়লা ফেলার প্রবণতা বেশি। রান্নার সময় ছোটখাটো শুকনো ময়লাজাতীয় কিছু হলেই তা জানালা থেকে ফেলে দেন। কিন্তু তারা বুঝতেই পারছেন না এই ময়লা তাদের জন্য কতটা ক্ষতিকর। জানালা থেকে ময়লা ফেলে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছেন। নিজেরাই ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকি তৈরি করছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কীটতত্ত্ববিদ ও গবেষক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘আমরা ফিল্ডে যখন কাজ করি, তখন দুই ভবনের মাঝের এই জায়গাটায় অ্যাডিসের অনেক লার্ভা পাই। বিশেষ করে আইসক্রিমের কৌটা এবং খাবারের প্যাকেটে। দুই ভবনের মাঝের জায়গাটায় আসলে কেউ যায় না। যে কারণে ওই জায়গায় ফেলা এসব কিছুতে পানি জমে সেখানে মশা জন্মায়। আমরা যখন এটা বিভিন্ন এলাকায় পেয়ে সতর্ক করলাম। তখন তারা দুই ভবনের মাঝে টিনের চাল দিয়ে দেয়। পরে দেখা গেছে, ওই টিনের চালেই এসব ময়লা ফেলছেন। আর সেখানেই মশা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই জানালা থেকে ময়লা ফেলা যাবে না। এ বিষয়ে নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে।’
প্রতিদিন সকালে দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় লার্ভিসাইড ছিটানো হয়। কর্মীরা ঠিকমতো ছিটাচ্ছেন কি না, তা মনিটরিং করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কন্ট্রোল রুমে গিয়ে সম্প্রতি মনিটরিংয়ের সময় অবস্থান করলে দেখা যায়, অঞ্চল-৩-এর ২২ নং ওয়ার্ডে লার্ভিসাইড ছিটাচ্ছেন ডিএসসিসির কর্মীরা। এ সময় চোখে পড়ে সেখানেও দুই ভবনের মাঝে জমে থাকা ময়লার স্তূপ। দেখে মনে হয়, ওটা যেন কোনো ময়লা রাখারই নির্ধারিত স্থান। পানি জমে থাকায় খুব বেশি দূর পর্যন্ত গিয়ে লার্ভিসাইড ছিটাতে পারেননি ওই কর্মী। তবে তিনি সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।
এ দৃশ্য দেখে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ফজলে শামসুল কবির খুবই বিরক্তির সুরে বলেন, ‘দেখেন, এই হচ্ছে অবস্থা! দুই ভবনের মাঝ তো কোনো ময়লার ভাগাড় না। বাসা থেকে সিটি করপোরেশনের লোকজন ময়লা নিয়ে আসে। তা হলে জানালা থেকে কেন ময়লা ফেলতে হবে? জমে থাকা এসব ময়লা যদি বাড়ির মালিক পরিষ্কার না করেন, তাহলে আমাদের কী করণীয় আছে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে জানা যায়, প্রতিদিন দুই শিফটে প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৩ জন মশা নিধনে কাজ করেন। সকালে ৭ জন লার্ভা মারার জন্য লার্ভিসাইড ছিটানোর কাজ করেন। বিকেলে উড়ন্ত মশা মারার জন্য ফগিংয়ের কাজ করেন ৬ জনে। নিয়মিত সকালে স্ক্রিনে বসে তা মনিটরিং করা হয়।
সিটি করপোরেশনের ওই কর্মকর্তা বলেন, অনেক জায়গা আছে যেখানে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা পৌঁছাতে পারেন না। দুই ভবনের মাঝের যে জায়গাটা থাকে, সেখানে অনেক সময় গেট বানিয়ে তালা মেরে রাখেন মালিকরা। কোনো কোনো এলাকায় বলেও সেই তালা খুলে লার্ভিসাইড ছিটানো সম্ভব হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অন্য এলাকার কথা কী বলব, বনানী এলাকায় বাস করা কেউ কেউ অনেক অসচেতন। কেউ কেউ বাসাবাড়ির ময়লা যেখানে-সেখানে ফেলেন। অনেক টাকা বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকেন, অথচ ময়লা ফেলার জন্য ২০০-৪০০ টাকা দিতে তাদের সমস্যা।’ এই কর্মকর্তা বলেন, মোহাম্মদপুরের নতুন হাউজিংগুলোর বেশির ভাগ এলাকায় দুই ভবনের মাঝে এমন ময়লা-আবর্জনা দেখা যায়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই পলিথিন, আইসক্রিমের কৌটা, খাবারের প্যাকেটে পানি জমে হটস্পট বেড়ে যায়। কোকাকোলার সিপির মধ্যে পর্যন্ত জমা পানিতে অ্যাডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। তাই নগরবাসীকে সতর্ক হতে হবে। তারা যদি সচেতন না হন তাহলে যত চেষ্টাই করা হোক না কেন তা সফল হবে না।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ফজলে শামসুল কবির বলেন, জানালা থেকে যাতে ময়লা না ফেলা হয়, সে জন্য বাড়িওয়ালাদের উদ্যোগ নিতে হবে। তারা ভাড়াটিয়াদের যদি কড়া ভাষায় বলে দেন, জানালা থেকে ময়লা ফেললে বাসায় থাকতে দেওয়া হবে না অথবা ধরা পড়লে জরিমানা দিতে হবে কিংবা যারা ফেলবেন তাদের পরিষ্কার করে দিতে হবে, তাহলে জানালা থেকে ময়লা ফেলার প্রবণতা কমে আসবে। যেসব এলাকায় দুই বাড়ির মাঝে ময়লা জমে আছে সেখানকার বাড়িওয়ালাদের উদ্যোগ নিয়ে সেই ময়লা পরিষ্কার করে ফেলার পরামর্শ দেন তিনি।
দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নিজ নিজ জায়গা থেকে সবার এগিয়ে আসতে হবে।