দেশের কারা ব্যবস্থাপনায় নতুন মাইলফলক হিসেবে এবার ঢাকার কেরানীগঞ্জে চালু হতে যাচ্ছে সর্বাধুনিক ‘বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার’। এটি প্রায় পাঁচ বছর আগে মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে উদ্বোধন করা হয়েছিল। ওই সময়ে ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হলেও জনবল সংকটসহ নানা কারণে তখন সেটি চালু করা হয়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্তৃপক্ষ মহিলা কারাগারের নাম পাল্টে এটিকে ‘বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগারে’ রূপান্তর করেছে। এখানে নারী-পুরুষদের মধ্য থেকে বিশেষ বন্দিদের রাখা হবে। এরই মধ্যে ওই বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে।
কারাসংশ্লিষ্টরা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, আগামী ১৫ মে বা তার পর পরই যেকোনো দিন কারাগারটির কাজ শুরু করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে নির্মিত এই কারাগারটি ৩০০ বন্দির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন। এই কারাগারের ব্যবস্থাপনায় ইতোমধ্যে নিয়োগ বা পদায়ন করা হয়েছে একজন সিনিয়র জেল সুপার ও একজন জেলারসহ প্রশিক্ষিত শতাধিক নারী-পুরুষ কারারক্ষীকে। কারা অভ্যন্তরে আরও রয়েছে- ডে-কেয়ার সেন্টার, পাঠাগার, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, ওয়াশিং প্ল্যান্ট। এমনকি মানসিকভাবে অসুস্থ বন্দিদের জন্যও থাকছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ আলাদা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা।
এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা যেহেতু বিশেষ কারাগার তাই বিশেষ বন্দিদেরই রাখা হবে। এখানকার নিরাপত্তা এবং অন্য বিষয়গুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি-সরঞ্জামসংবলিত করে তৈরির চেষ্টা চলছে, যাতে এটি মডেল কারাগার হিসেবে পরিচিতি পায়। আগামীতে এর আদলে যাতে অন্য কারাগারগুলোকে আমরা সাজাতে পারি, সেই চেষ্টা করা হবে।’
‘ঢাকা মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার’ নাম পরিবর্তন করে ‘বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার’ করার প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন্স বলেন, ‘এটি মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে তৈরি হলেও জনবল সংকটের কারণে আগে সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া বর্তমানে আমরা মনে করছি, মহিলা বা নারী বন্দির চেয়ে পুরুষ বন্দির সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও কাশিমপুর কারাগারে ধারণক্ষমতার অনেক বেশি বন্দি থাকছেন এই মুহূর্তে। এই কারণে মূলত মহিলা কারাগারের বদলে নারী ও পুরুষ বন্দিদের জন্য এটিকে বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।’
কারা অধিদপ্তরের একাধিক পদস্থ কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেছেন, এই বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগারটিকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে রয়েছে আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি, যার মধ্যে রয়েছে বডি স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার ও আর্চওয়ে গেট। কারাগারে বন্দি প্রবেশে তল্লাশি করা হবে, যাতে কেউ মাদকদ্রব্য, মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো ক্ষতিকর বস্তু নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে। পুরো কারাগারটি পর্যবেক্ষণ করা হবে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে। এ ছাড়া বন্দিরা যাতে অবৈধ যোগাযোগ করতে না পারেন, সে জন্য থাকবে পর্যাপ্ত মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক জ্যামার।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) মো. জাহাঙ্গীর কবির খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগারটি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বন্দিরা নিরাপদ, সুস্থ ও পুনর্বাসনমূলক পরিবেশ পাবেন। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে নজরদারি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়েছে। কারাগারটি চালু হলে বন্দি ব্যবস্থাপনায় যেমন স্বস্তি ফিরবে, তেমনি বন্দিদের কষ্টও লাঘব হবে।’
এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘খুব শিগগির ঢাকার কেরানীগঞ্জে সর্বাধুনিক ‘বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার’টি চালু হতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৫ মে বা তার পর পরই কারাগারটি চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে কারাগারটির জন্য একজন সিনিয়র জেল সুপার ও একজন জেলার নিয়োগ বা পদায়ন সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি কারাগারটির ব্যবস্থাপনায় আপাতত ১০০ প্রশিক্ষিত কারারক্ষীও নির্বাচন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে কারারক্ষীর সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।’
কারা অধিদপ্তরের অপর একজন কর্মকর্তা জানান, বিশেষায়িত এই কারাগারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিদের রাখার ব্যবস্থা করা হবে। আলোচিত মামলার আসামি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব বন্দিকে রাখতে কারাগারটির ভেতরেই ‘হাই সিকিউরিটি’ সম্পন্ন সেল তৈরি করা হয়েছে। মানসিকভাবে অসুস্থ বন্দিদের জন্য রাখা হয়েছে একটি ‘মেন্টাল ওয়ার্ড’। বন্দিদের চিকিৎসার জন্য ভেতরে রয়েছে তিনতলাবিশিষ্ট কারা হাসপাতাল। এ ছাড়া বন্দিদের কর্মসংস্থানমূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে অভ্যন্তরে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জে নারী বন্দিদের জন্য ‘ঢাকা মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার’ উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু লোকবল সংকটসহ নানা কারণে গত পাঁচ বছরেও কারাগারটি চালু হয়নি। তবে এই সংকট কাটিয়ে নতুন দিগন্তের সূচনায় শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে বিশেষায়িত কারাগারটি। সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই কারাগারের নাম পরিবর্তন করে ‘বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার’ নামকরণ করা হয়েছে।
বুধবার (৭ মে) দুপুরে কেরানীগঞ্জে গিয়েও দেখা যায়, বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগারের নামফলক প্রস্তুত করাসহ নানা সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ চলছিল।