বিদ্যমান ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন, ২০১০’ সংশোধন করে ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নামে খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) আওতায় এর ক্ষমতা, কার্যক্রম ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় যুগোপযোগী করার কথা বলা হয়েছে।
নতুন এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ট্রাস্টি বোর্ডকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে এবং এর কার্যক্রম আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর ফলে জলবায়ু অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও বিকেন্দ্রীকরণ, স্বচ্ছ ও গতিশীল হবে, ট্রাস্টি বোর্ডের ক্ষমতা বাড়বে। সরকারি পূর্বানুমোদনের বাধা দূর হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে। বিশেষ করে তহবিলের বহুমুখী উৎস তৈরির বিধান জলবায়ুসংক্রান্ত কাজে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়াতে সহায়ক হবে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর কার্যকর, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে এই অধ্যাদেশ যুগোপযোগী করা হয়েছে। সংশোধনী প্রস্তাবের সফল বাস্তবায়ন জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা লাখ লাখ মানুষের জীবনে ও বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখবে।
যেহেতু বর্তমানে সংসদ কার্যকর নেই, তাই এ-সংক্রান্ত বিষয়ে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বিবেচনা করে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে এই অধ্যাদেশ জারি করবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাব পাঠাবে।
সংশোধনীর খসড়া প্রস্তাবে ইংরেজি নাম ও সংক্ষিপ্ত রূপ যুক্ত করা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর পরিচিতি সহজ হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (Bangladesh Climate Change Trust - BCCT) এবং তহবিলের নাম জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (Climate Change Trust Fund - CCTF) রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে ট্রাস্টি বোর্ডের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পূর্বে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের ‘পূর্বানুমোদন’ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। সংশোধনীতে তা তুলে দিয়ে ট্রাস্টি বোর্ডকেই চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে তহবিল বরাদ্দ ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ট্রাস্টের উদ্দেশ্য এখন কেবল উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং ‘জলবায়ুসহিষ্ণু বাংলাদেশ বিনির্মাণ’কে মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা। খসড়ায় নতুন করে ‘দায়িত্ব ও কার্যাবলি’ নামে একটি ধারা (৬ক) যোগ করা হয়েছে, যাতে ট্রাস্টের প্রশাসনিক কাজ, তহবিল ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের দায়িত্ব স্পষ্ট করা হয়েছে।
ট্রাস্টের তহবিলে এখন শুধু সরকারি বরাদ্দই নয়, সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অন্য উৎস থেকে অর্থায়ন নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তহবিল উত্তোলনের পদ্ধতিও এখন ট্রাস্টি বোর্ড নির্ধারণ করে দেবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বোর্ডে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী এবং বিসিসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রস্তাবে কারিগরি কমিটির পুনর্গঠন সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রকল্প মূল্যায়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কারিগরি কমিটিকে আরও শক্তিশালী ও বহুত্বপূর্ণ করা হয়েছে। এতে বুয়েট, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সেন্টার (জিইজিআইএস), বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, অর্থ ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিনিধি এবং এনজিও বা বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনার (BCCSAP) আলোকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকল্প প্রস্তাব দাখিল করবে। নির্দিষ্ট নীতিমালা ও গাইডলাইন অনুসরণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
ট্রাস্টি বোর্ড এখন বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদন ও প্রকাশ করবে, যা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের প্রতি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
ট্রাস্ট এখন নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে, যা এর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।