সংসদ নির্বাচনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী মহলে যখন নানা গুঞ্জন ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক সেই সময় দেশ ছেড়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় ছিলেন। গত শুক্রবার সকালে তিনি একটি ফ্লাইটে জার্মানি চলে যান।
খবরটি জানাজানি হলে সচিবালয় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও কয়েকজন উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা, এমনকি পুলিশের আইজি বাহারুল আলমও দেশ ছাড়ছেন বলে গুঞ্জন ওঠে। যদিও গতকাল রবিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, উপদেষ্টারা কেউ দেশ ছাড়ছেন না। তারা নতুন সরকারের মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এমনকি আইজিপি বাহারুল আলমও জানিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগে ও পরে প্রশাসনের ভেতরে রদবদল, পদত্যাগ ও বিদেশযাত্রার ঘটনাগুলোকে বর্তমান সরকার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা এটিকে ‘সেইফ এক্সিট’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকভাবে দেশত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
বিদেশে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, ছেলের স্কুলে প্যারেন্টস মিটিং এবং স্ত্রীর চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজনেই তিনি ছুটি নিয়ে পরিবারের কাছে যাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় পরিবারকে সময় দিতে না পারায় এখন কিছুটা সময় দিতে চান বলেও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি টানা কর্মব্যস্ততার কারণে শারীরিক ক্লান্তি, অনিয়মিত ঘুমের কারণে বিশ্রামের প্রয়োজনের কথাও বলেন তিনি। উপহার পাওয়া কিছু বই সঙ্গে নিয়েছেন জানিয়ে বিশ্রামের ফাঁকে সেগুলো পড়ার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত ব্যক্তি বলেও দাবি করেন তিনি।
এর আগে তার অধীনে থাকা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সেসব বিষয়ে কোনো ফয়সালা না করে হুট করে তার দেশ ছাড়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ব্যাখ্যার পরও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা থামেনি, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দেশত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে লাল (কূটনৈতিক) পাসপোর্ট জমা দিয়ে সবুজ (সাধারণ) পাসপোর্ট নেওয়া বা আবেদন করার তথ্য সামনে আসায় জল্পনা আরও বাড়ে। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করা হলেও দায়িত্ব শেষে তা জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে একাধিক ব্যক্তির পাসপোর্ট পরিবর্তনের খবর রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সচিবালয়ের একাধিক ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগে ও পরে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে দেশত্যাগ ও পাসপোর্ট পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লাল পাসপোর্ট জমা দিয়ে সবুজ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন বা ইতোমধ্যে সংগ্রহ করেছেন।
সে তালিকায় রয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, শিল্প, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, খাদ্য ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা এবং সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
এ ছাড়া লাল পাসপোর্ট বাদ দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট পেতে চান উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সালেহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী রফিকুল আবরার, আসিফ নজরুল, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ফারুক-ই-আজম, ফরিদা আখতার, সেখ বশির উদ্দিন, শারমীন এস মুরশিদ, নূরজাহান বেগম এবং মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ‘সেফ এক্সিট’-এর বিষয়টি সবার নজরে আনেন এনসিপির আহ্বায়ক ও সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। গত বছরের শেষ দিকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের অনেককেই বিশ্বাস করাটা ছিল বড় ভুল। তাদের প্রতি আস্থা রেখে প্রতারিত হতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টারা অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে ফেলেছেন, তারা নিজেদের সেইফ এক্সিটের কথা ভাবছেন।’
এর পর থেকেই উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের ‘সেফ এক্সিট’-এর বিষয়টি আলোচনায় আসে। যদিও উপদেষ্টারা বরাবরই এ বিষয়টি অস্বীকার করে গেছেন। গতকাল রবিবার এ বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
আসলে উপদেষ্টাদের কেউ কি সেফ এক্সিট নিচ্ছেন কি না–এমন প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা রিজওয়ানা বলেন, ‘কোনো উপদেষ্টা যদি দায়িত্বের পরে বিদেশে যান, তাকে কি ঘোষণা দিয়ে যেতে হবে? বিলেতে আমার অলরেডি একটা ইনভাইটেশন আছে এপ্রিল না মে মাসে, আমার সেটাও মনে নাই। আমি সেখানে যাব। আর আমি কি এটা ঘোষণা দিয়ে যাব যে ভাই আমি অত তারিখে অমুক মিটিংয়ের জন্য অমুক দেশে যাচ্ছি, এটা তো কেউ ঘোষণা দেবে না। এগুলো হচ্ছে কী? দেশে একটা গ্রুপ আছে, যেখানে সবকিছুতেই একটা নাটকীয়তা, একটা উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা থাকে। এটা তারই প্রয়াস। এটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্কই নেই, বরং আমাদের অ্যাপ্রিশিয়েট করা উচিত ছিল যে দেড় বছর তিনি তার পরিবারকে রেখে এসে দেশের জন্য কাজ করেছেন।’