মেয়াদ শেষের মাত্র কয়েক দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিস্তৃত পরিসরে বাণিজ্য চুক্তি করেছে। এটি শুধু শুল্কই কমায়নি। এ ধরনের চুক্তির ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে এমন কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যাতে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও ডিজিটাল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বাড়ার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। ভবিষ্যতে চীন, রাশিয়া, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সহযোগিরাও যদি একইভাবে চাপ দিয়ে চুক্তি করতে চায়, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্লেষকরা এ রকমই মনে করছেন।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিগুলো এভাবে করল যে, বাংলাদেশকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলা হয়েছে। বাজেটের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তির প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী ছিল।’ তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা কিংবা বিশেষ সহকারী হলেও, আসলে তারা বিভিন্ন কোম্পানির লবিস্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।’
নতুন সরকারের প্রতি বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এ চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।’
চুক্তির শর্তে বলা হয়, বাংলাদেশ যদি চীন বা রাশিয়ার মতো নন-মার্কেট দেশের সঙ্গে কোনো মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে আবার বাংলাদেশের ওপর শাস্তিমূলক ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ৩৭ থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলো বাংলাদেশের প্রতি কী মনোভাব নেবে বা তার পরিপ্রেক্ষিতে আগামীতে সম্পর্ক কেমন হবে, সেটা চিন্তায় রাখতে হবে।
চুক্তির শর্তে, রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় ১৪টি বোয়িং কেনার ওয়ার্কঅর্ডার দিলেও এখনো এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি হয়নি। এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করতে শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে অবশেষে চুক্তিটি অন্তর্বর্তী সরকার করে যেতে পারেনি। একদিকে বাংলাদেশের জাতীয় ঋণ বেড়েছে। এখন যদি বোয়িং বিমান কেনার জন্য আরও ঋণ নিতে হয় এবং সে অনুযায়ী বাণিজ্যিক সুবিধা না পাওয়া যায়, তাহলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বোয়িং কেনার ক্ষেত্রে প্রায় ৪০ শতাংশ কমিশন দিয়ে থাকে কোম্পানিটি। কিন্তু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে কোনো কমিশন দিতে রাজি হয়নি কোম্পানিটি। শেষ পর্যন্ত ১০ শতাংশ কমিশন চেয়েও পায়নি বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। কেন পায়নি সে বিষয়ে সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায় থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার কমিশন নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা করতে চেয়েছিল। এ নিয়ে বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সাফিকুর রহমান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। সম্প্রতি গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় সাবেক এমডি সাফিকুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের চাপে অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে ২৫টি বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় নাখোশ হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবশালী দেশগুলো। বিশেষ করে, ইউরোপের যেসব দেশ উড়োজাহাজ কোম্পানি ‘এয়ারবাস’-এর শেয়ারহোল্ডার। তাদের এই অসন্তুষ্টির বিষয়টি সরাসরি প্রকাশ করেন ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ। তিনি রাখ-ঢাক না করেই বলেন, ‘ইউরোপ থেকে এয়ারবাস না কিনে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা পেতে বাংলাদেশকে বেগ পেতে হবে। কেননা, বোয়িং কেনার অনেক আগে থেকেই এয়ারবাস বিক্রির ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন মালিকানা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বোঝানোর চেষ্টা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং কেনা হলেও ইউরোপ থেকে এয়ারবাসও কেনা হবে।’
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, পারমাণবিক চুল্লি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামসহ জ্বালানি কিনতে এমন কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ চুক্তি করতে পারবে না, যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ভবিষ্যতে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে পারমাণবিক খাতে জ্বালানি চুক্তি করতে গেলে কঠিন প্রতিবন্ধতার মুখে পড়বে বাংলাদেশ। তবে অতীতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতায় পড়বে না।
এসব বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে জানান, চুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে– রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ও মোটরযান, যানবাহনের যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়াবিন, দুগ্ধজাত খাদ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, বাদাম ও বিভিন্ন ফল। কিন্তু চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য সেফগার্ড দেখি না। কেননা আমরা পরিষ্কার নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসব পণ্য কেনার ক্ষেত্রে আমরা গুণগত মান ও কম দামে পাচ্ছি কি না।
তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী আমরা যেসব পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছি বা আগে থেকে এসব পণ্য যেসব দেশ থেকে কিনতাম সেসব দেশ কী ভাবছে। তারা কী মনে করতে পারে যে, বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে অন্য কোনো চুক্তিতে রাজি করানো সম্ভব। যদি এটা হয়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ নিজের ভারসাম্য হারাবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমরা যেসব পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছি তাতে বাংলাদেশ লাভবান হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ জানান তিনি।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও সামরিক সরঞ্জাম কেনার চেষ্টা করবে এবং কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে কেনাকাটা কমাতে হবে, যা আসলে চীনকেই বোঝানো হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তবিষয়ক যে নীতি গ্রহণ করবে, বাংলাদেশকে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যযুদ্ধে বাংলাদেশকে কার্যত একই অবস্থানে দাঁড়াতে হবে।