বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল বলেছেন, ‘ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে। সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি। সরবরাহও কমায়নি।’ তারপরও গতকাল ৬টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে মিলেনি পেট্রল, অকটেন। ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির পর এই সংকট আরও বেড়েছে। তেল পেতে হাহাকার দেখা গেছে। অথচ দেশেই পর্যাপ্ত পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার বলার পরও সরকার আগে বেশি করে গ্যাস উত্তোলনে মনোযোগ দেয়নি। আমদানির দিকে বেশি নজর দেয়। তাই বিশ্ব জ্বালানিসংকটের ছাপ পড়েছে বাংলাদেশে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রল উৎপাদন করা হয়। কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত পেট্রলের পরিমাণ অনেক সময় দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি হয়ে যায়। এই পেট্রলের সঙ্গে আমদানি করা অকটেন বুস্টার মিশিয়ে অকটেন তৈরি করা হয়। ফলে দেশে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটা দেশেই উৎপাদিত হয়। আর অকটেনের সিংহভাগও দেশে উৎপাদিত হয়।
বাংলাদেশে পেট্রল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন। দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রল, অকটেনসহ প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন।
কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পর পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা আসে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান এই নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় বাংলাদেশেও জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
বিপিসির হিসাবে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত আকারে এনে দেশে পরিশোধন করা হয়, বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৬ মার্চ সরকার তেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দেয়। ঈদের আগে ভোগান্তি এড়াতে সেই সীমা তুলে নেওয়া হয়। তারপরও ভোগান্তি কমেনি চালকদের।
ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ৭ দিন ছুটি শেষে গতকাল মঙ্গলবার সরকারি-বেসরকারি সব অফিস খুলেছে। রাজধানীসহ সারা দেশে জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার পড়ে গেছে। ডিপো থেকে তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন গতকাল বন্ধ ছিল। ৪ থেকে ৬টি পাম্পে ঘুরেও চাহিদা মতো তেল পাননি বলে ভুক্তভোগীরা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন।
রাজধানীর আসাদ গেটের সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনে জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ফিলিং স্টেশনটিতে জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষায় ছিল মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহন। ঈদের আগের তুলনায় এই সারি ছিল চোখে পড়ার মতো। পাম্পের চারিদিক ঘিরে লাইন দেখা যায়।
এই পাম্পে প্রাইভেট কারের চালক লিমন সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘোরাঘুরি করে এখানে আসি। দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর ৪০ লিটার তেল পাই। ভোগান্তি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।’
মোটরসাইকেল চালক ও ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তা মো. রাব্বিল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অফিস সময় হলেও অনেক অপেক্ষার পর ইচ্ছামতো তেল পেলাম। সিস্টেমের পরিবর্তন হওয়া দরকার। কারণ মন্ত্রী বলেছেন, তেলের সংকট নেই। তার পরও এখানে দীর্ঘ লাইন।’ অন্য চালকদেরও একই অভিযোগ। তেল পেতে চরম ভোগান্তি। এই পাম্পের ম্যানেজার সজীব শংকর খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডিপো থেকে তেল পেলেই চালকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। না পেলে পাম্প বন্ধ থাকছে।’
তবে আসাদ গেটের অপর পাম্প তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল দেওয়া বন্ধ ছিল। এই পাম্পে তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের লাইন চন্দ্রিমা উদ্যান ছাড়িয়ে যায়। প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা হতে দেখা গেছে।
বেলা ৩টায় প্রাইভেটকার চালক মোতালেব খবরের কাগজকে বলেন, ‘উত্তরা-১৮ থেকে ৫ পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে এখানে সকাল ৮টায় এসে দেখি পাম্প বন্ধ। কিন্তু গাড়িতেও তেল নেই। তাই অপেক্ষায় আছি। কখন পাব জানি না।’
কল্যাণপুরের গাড়িচালক শাহ আলম বলেন, ‘সকাল ৬টায় বের হয়েছি। খালেক ফিলিং স্টেশন, ট্রাস্টসহ ৫টা ঘুরেও কোথাও তেল পাইনি। এখানে এসে আটকে আছি।’
এভাবে অসংখ্য চালক তেল না পাওয়ার ভোগান্তির কথা জানান।
এই পাম্পের ক্যাশিয়ার ফাত্তাহ আজিজ বলেন, ‘সকালে তেল শেষ হয়ে গেছে। ব্যাংক বন্ধ থাকায় আগে টাকা জমা দেওয়া যায়নি। মঙ্গলবার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। তাই তেল আসতে দেরি হচ্ছে।’
একই চিত্র দেখা যায় মিরপুর রোডে দারুস সালাম এলাকায় সোহরাব সার্ভিস স্টেশন, খালেক সার্ভিস স্টেশনসহ অন্য পাম্পেও। এসব ফিলিং স্টেশনের সংশ্লিষ্টরা একই অভিযোগ করে জানান, ঈদের পরে ২ দিন ব্যাংক বন্ধ থাকায় টাকা জমা দেওয়া যায়নি। তাই ডিপো থেকে তেল পেতে দেরি হচ্ছে। এ জন্য পরিবহনে তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ বছর ২৫ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল সচিবালয়ে বলেছেন, ‘ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে। পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি। সরবরাহও কমায়নি। তাই পেট্রলপাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন ধরে জ্বালানি তেল সংগ্রহের কোনো যৌক্তিকতা নেই। গত বছরের তুলনায় এই বছর ২৫ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ঈদের দিন ও ঈদের পরের দিন ডিপোগুলো বন্ধ থাকায় তেল সরবরাহ করা হয়নি। এ জন্য হয়তোবা পেট্রলপাম্পগুলোতে তেলের স্বল্পতা থাকতে পারে।’
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
জ্বালানি তেলের সংকটের ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ও বুয়েটের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার মনে হয় ডিপো থেকেই তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এ জন্য ফিলিং স্টেশনে আসতে দেরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণেই মানুষের আশঙ্কা থেকে তেলের চাহিদা বাড়ছে। যেহেতু ক্রুড অয়েল থেকে এবং গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রল উৎপাদন করা হয়। আবার পেট্রলকে রূপান্তর করে অকটেন তৈরি করা হয়। তাই গ্যাস উৎপাদনে বেশি নজর দিলে এত চাপে পড়তে হতো না। তবে যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকট শুরু হয়েছে, তাই যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তির খবর আসবে না।’
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘ফিলিং স্টেশনে চালকরা তেল পাচ্ছেন না, মানে রাতের অন্ধকারে কালোবাজারে তা চলে যাচ্ছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে অসাধু চক্র। তাই জনগণের ভোগান্তি কমাতে সরকারকে আরও কঠোর ও সিরিয়াস হতে হবে। সরকার তেল বিক্রির ব্যাপারে কিছু আদেশ জারি করেছে। সেগুলোর প্রতিপালন হচ্ছে কি না তা দেখা দরকার। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে বলে আসছি বাপেক্সকে দায়িত্বশীল করতে। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে। কিন্তু সরকার সেই দিকে মন দেয়নি। আমদানির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। তাই সংকট কাটছে না।’