ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’ হাদি হত্যা মামলার বাদীকে নিয়ে বোনের প্রশ্ন? জয়পুরহাট সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির টহল জোরদার রাজনীতি এক ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে: মির্জা ফখরুল হজ শেষে দেশে ফিরলেন ২৯৬৯৪ হাজি নারায়ণগঞ্জে ১৭ বন্যপাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত হান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির তথ্য ফাঁস, ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ নায়িকা মিমির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট, শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি! দোয়া গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনসহ মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা কটাক্ষের শিকার আনুশকা কলকাতার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ হাকিম চট্টগ্রামে কাফনের কাপড় পরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল হরোস্কোপের গোলকধাঁধায় ভবিষ্যৎ ভাবনা বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা সরকারের নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে পাবনায় ২০০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী সবার সহযোগিতায় বাসডুবিতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী নতুনধারার ‘কেমন বাজেট চাই’ শীর্ষক গোলটেবিল লক্ষ্মীপুরে হাসপাতালে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরকে বলাৎকার, ওয়ার্ডবয় আটক জিয়া স্মৃতি জাদুঘর শিগগিরই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী চীনের ইভি প্রযুক্তিতে গাড়ি বানাবে ভারতের টাটা পাটগ্রাম সীমান্তে পুশইন ঠেকালো বিজিবি, বিএসএফকে কড়া প্রতিবাদ হবিগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা-ছেলের মৃত্যু দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও সীমান্তে পুশইনের আশঙ্কা: বিজিবির নজরদারি জোরদার
Nagad desktop

টেকনাফে মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৫ পিএম
টেকনাফে মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

কক্সবাজার জেলার সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে মানব পাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য। বিজিবি, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ  ও র‌্যাবের অভিযানে ভিকটিম উদ্ধার ও পাচারকারীরা আটক হলেও থেমে নেই মানবপাচার। পাচারকারীদের খপ্পড়ে পড়ে উপজেলার বহু মানুষ নিঃস্ব হয়েছে। সাগরে প্রায়ই মানববোৱঝাই ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটছে। এতে বাড়ছে স্বজনহারা পরিবারের সংখ্যা।

টেকনাফ পৌর শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরত্বে বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়ায় মো. ইউসুফের বাড়ি। তার বড় ছেলে মো. রিদুয়ান (২৭) একটি ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। পথে ট্রলারটি সাগরে ডুবে যাওয়ার পর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। সেই শোকে পাথর বাবা ইউসুফ।

রিদুয়ানের বাবা মো. ইউসুফ বলেন, ‘আমার  ৪ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে সবার বড় সন্তান রিদুয়ান। সে ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি আসে। এরপর এলাকার এক ব্যক্তির খপ্পরে পড়ে গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে কচ্ছপিয়া এলাকার আরেক অন্যতম মানব পাচার চক্রের সদস্য দালাল জাফরের মাধ্যমে সাগরপথে বড় ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা করে। ট্রলারে ওঠার পরও দালালের মাধ্যমে কথা হয় তার সঙ্গে।’

মো. ইউসুফের দাবি, ৯ এপ্রিল বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে ২৫০ জনের মধ্যে জীবিত উদ্ধার হয় ৯ জন। কিন্তু তাতে রিদুয়ান নেই। এখন ছেলের লাশের অপেক্ষায় বাবা।

নিখোঁজ রিদুয়ানের মা শাহিনা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে বিয়ে করেছে এখনো এক বছর হয়নি। তার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যায় সে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে কোনো খবর পাচ্ছি না আমার ছেলের। দালালের মাধ্যমে যেতে চেয়েছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সাগরে মাঝপথেই ডুবে গেল সে স্বপ্ন। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি আমার ছেলের লাশটি চাই। আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, সে জন্য দালালদের খুঁজে বের কঠিন শাস্তি দেওয়া হোক।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাচারকারীরা টেকনাফের বিভিন্ন উপকূলীয় নৌঘাট ও সংলগ্ন এলাকাকে নিয়মিতভাবে মানব পাচারের কাজে ব্যবহার করছে। 

চিহ্নিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবরাং ইউনিয়নের শাহ পরীরদ্বীপ, মিস্ত্রিপাড়া, ঘোলাচর, পশ্চিমপাড়া এবং সাবরাং কাটাবনিয়া নৌঘাট, খুরেরমুখ, মুন্ডার ডেইল, বাহারছড়া নৌঘাট। এ ছাড়া নোয়াখালীপাড়া নৌঘাট, শীলখালী নৌঘাট, বড় ডেইল নৌঘাট, কচ্ছপিয়া নৌঘাট, মাথাভাঙ্গা নৌঘাট এলাকাও ব্যবহৃত হচ্ছে। একইভাবে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, তুলাতলী নৌঘাট, লম্বরী নৌঘাট, হাবিবছড়া নৌঘাট, রাজরছড়া নৌঘাট এবং মিঠাপানির ছড়া নৌঘাটও এ ধরনের কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। 

বাংলাদেশ কোস্টগার্ড শাহ পরীরদ্বীপ বিসিজি আউটপোস্টের কোস্টগার্ডের চিফ পেটি অফিসার এম শামছুল আলম মিয়ার বাদী হয়ে করা এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ৯ এপ্রিল দুপুর ১টায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইড আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় কয়েকজন মানুষকে দেখতে পায়। তারা ড্রাম ও কাঠের টুকরা ধরে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। পরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে জাহাজটি। অভিযানে মোট ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি এবং এক নারীসহ ৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক ছিলেন। উদ্ধারকৃতরা টেকনাফ এবং উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। এফবি তানজিনা সুলতানা নামক একটি বড় ফিশিং বোটে করে তারা গত ৪ এপ্রিল অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পথে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বোটটি ডুবে গেলে তারা সমুদ্রে ভাসতে থাকেন। পরে উদ্ধারকৃতদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। 

কোস্টগার্ডের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, উদ্ধারকৃত ৯ জনের মধ্যে ৬ জন মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত এবং বাকি ৩ জন পাচারের শিকার। এ তথ্যের ভিত্তিতে ১১ এপ্রিল রাত ১টা ৪৫ মিনিটে কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে ৬ মানব পাচারকারীকে আটক করে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, শাহ পরীরদ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ সদর, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে যুবকসহ সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে দালালদের মাধ্যমে পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব স্থাপন বা দাওয়াতের কথা বলে তাদের ফাঁদে ফেলা হয়, পরে কৌশলে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তুলে নেওয়ার পর ভুক্তভোগীদের পাহাড়ি এলাকায় ঝুপড়ি ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। এরপর তাদের একটি অংশকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। স্থানীয়দের মতে, মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন নৌঘাটগুলোকে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় আনলে মানব পাচার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি পাচারকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পাচারকারীদের একটি চক্রে ২০-৩০ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এদের কেউ কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আস্তানায় নিয়ে যায়, আবার কেউ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে নৌকায় করে সাগরের মাঝপথে পাঠিয়ে দেয়। চক্রের বড় গডফাদাররা গোপন আস্তানায় অবস্থান করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অধিকাংশ অর্থ লেনদেন করা হয় বিকাশের মাধ্যমে।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের মুন্ডার ডেইল, সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া, কচ্ছপিয়া এবং রাজারছড়া এলাকা থেকে দালালের মাধ্যমে ছোট ছোট নৌকায় করে তাদের একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। প্রায় ২৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। যাত্রার প্রায় চার দিন পর এটি আন্দামান সাগরের দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর তারা পানির ড্র্রাম, তেলের ট্যাংক, ফোম ও কাঠ ধরে প্রায় দুই দিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় থাকেন। পরে একটি বাংলাদেশি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে এবং কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। এ ঘটনায় এখনো অনেক যাত্রীর খোঁজ না মেলায় স্বজনদের মধ্যে গভীর শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

এ ছাড়া জানা যায়, ভিকটিমরা মায়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী, যারা টেকনাফ এলাকায় অবস্থান করছিল। তাদের আর্থসামাজিক দুর্বলতা ও অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা এবং পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে অপহরণ, জোরপূর্বক শ্রম আদায় এবং নারী পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত। মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইন ২০১২-এর ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আটককৃতদের সঙ্গে আরও ১০-১৫ জন অজ্ঞাতনামা সদস্য একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা বিভিন্ন প্রলোভন যেমন উন্নত জীবনযাপন, উচ্চ বেতনের চাকরি এবং অবিবাহিত নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা করছিল।

আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া একমাত্র নারী উখিয়ার জামতলী ক্যাম্প-১৫-এর বাসিন্দা রাহেলা বেগম জানান, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে তার খালাতো ভাই ক্যাম্প থেকে দালাল চক্রের আস্তানায় নিয়ে যান। এরপর গত ৪ এপ্রিল তারা মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন। তিনি বলেন, যাত্রার চার দিন পর হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলে ট্রলারটি ডুবে যায়। ওই ট্রলারে প্রায় ২০ জন নারী ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি একটি ফোম ও কাঠ ধরে কোনোভাবে ভেসে থাকেন। পরে একটি জাহাজ তাকেসহ আরও ৯ জনকে উদ্ধার করে।

রাহেলা বেগম আরও জানান, এই দুর্ঘটনায় তার খালাতো ভাই মারা গেছেন এবং ট্রলারে থাকা আরও অনেকে সাগরে ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগরে নৌকাডুবিতে উদ্ধার হওয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দার মো. রফিক জানান, উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ২ এপ্রিল তাকে বাড়ি থেকে বের করে নেওয়া হয়। পরে একটি ঘরে আটকে রেখে তার মুখ, হাত ও পা বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর দুই দিন পর গভীর রাতে একটি ছোট ট্রলারে তুলে সাগরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে আরেকটি বড় ট্রলারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে প্রায় ২৪০ জন ভুক্তভোগী এবং ২০ জন দালাল ছিল বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ এপ্রিল সকাল ৫টার দিকে হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হয়। একের পর এক ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। অনেকেই মারা যান, কেউ কেউ পানিতে ভেসে থাকেন। তিনি একটি পানির বোতল ধরে ভেসে থাকেন। পরদিন একটি তেলবাহী জাহাজ ভাসমান অবস্থায় থাকা ৯ জনকে উদ্ধার করে।

নিখোঁজ ভিকটিম সাদেকের মা সাবরাং ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মদিনা বেগম জানান, তার একমাত্র ছেলে মো. সাদেক নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সাবরাং আলীর ডেইল এলাকার আব্দুল আমিন তার অজান্তে জোর করে ছেলেকে ট্রলারে তুলে দেয় এবং পরে ফোনে বিষয়টি জানায়। 

মদিনা বেগম বলেন, তিনি তখন জানান তার ছেলে স্কুলপড়ুয়া এবং বিদেশ যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করা থাকলেও সে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাবে না। কিন্তু দালাল আব্দুল আমিন তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, টাকা বেশি লাগবে না, মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিলেই হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত বছর একইভাবে একজনকে পাঠিয়ে দ্বিগুণ অর্থ, প্রায় ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে ওই দালাল। তিনি জানান, তার ছেলে মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী ছিল না। কয়েক দিন পর তিনি জানতে পারেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি ট্রলার ডুবে গেছে। এরপর দালাল আব্দুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে জানায়, ট্রলারটি ডাকাতের কবলে পড়েছে এবং আড়াই লাখ টাকা দিলে তার ছেলেকে উদ্ধার করা হবে। মদিনা বেগম অভিযোগ করেন, টাকা দেওয়ার পর থেকে ওই দালাল মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখে এবং তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমি দালাল আব্দুল আমিনের কাছ থেকে আমার ছেলেকে জীবিত বা অন্তত তার লাশ ফিরে পেতে চাই। পাশাপাশি এদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৪ নভেম্বর রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লম্বরী এলাকার মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় দালাল ফয়সালের লিজকৃত জায়গার সুপারি বাগানে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা জোরপূর্বক রোহিঙ্গা নারী-শিশুকে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রেখেছে- এমন সংবাদে থানা-পুলিশের একটি টিম সেখানে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ৪ জনকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে রোহিঙ্গা ৩ জন নারী, ৯ জন শিশুসহ ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ফয়সাল (২৫), আজিমুল্লাহ (২৭), ইসমাইল (২৬), ফেরদৌস আক্তার (৩৮), মো. ইউনুছ (২১), মো. রফিক (১৯), সাইফুল্লাহসহ (৪০) অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জন দালাল চক্রের সক্রিয় সদস্যরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। আরও জানা যায়, গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর  রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ লম্বরী সাইফুলের বাড়ি থেকে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ৩০ ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে থানার পুলিশ। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২২ জন পুরুষ, ৭ জন নারী ও একজন শিশু ছিল। 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সাইফুল, ইসমাইল, ফয়সাল, ইয়াছিন, গফুর ও নুর নবী মাঝিসহ একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা এবং স্কুল-কলেজপড়ুয়া বাংলাদেশি তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফে নিয়ে আসে। এরপর তাদের পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়।

স্থানীয়রা আরও জানান, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় এসব সন্ত্রাসী চক্র পাচার, অপহরণ ও জিম্মি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাম্প্রতিক নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ভিকটিমদের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের একাধিক সূত্রে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কথিত মানব পাচারকারীর নাম উঠে এসেছে। অনেকের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অপহরণ, ডাকাতি, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ট্রলারডুবির ঘটনায় পাচারকারীরা আত্মগোপনে রয়েছে। তাদের ধরতে প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। 

সরেজমিনে গিয়ে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রিদুয়ান, সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এনায়েত উল্লাহ (১৭), একই এলাকার ফিরুজ (২৫), মো. রাসেল (২৬), আরাফাত (২৬) ও মো. আব্দুল মাহবুদ (৩০) এবং সাবরাং ৪ নম্বর ওয়ার্ড সিকদারপাড়া এলাকার সাদেকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নিখোঁজ হওয়ার বিস্তারিত জানা যায়। পরিবারগুলোর বরাত দিয়ে জানা যায়, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী অসাধু পাচারকারী তাদের চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে নানা প্রলোভন দেখিয়ে লোকজন সংগ্রহ করে এবং অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। সেখানে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরিবারগুলোর দাবি, ভয় ও আতঙ্কের কারণে অনেক সময় তারা মুখ খুলতে পারেন না। পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিভিন্ন এলাকায় তাদের সদস্য ছড়িয়ে রয়েছে, যা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন করে তুলেছে।

সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া এলাকার বাসিন্দা, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ মো. রাসেলের মা হামিদা খাতুন বলেন, ‘স্থানীয় দুই মানব পাচারকারী তার ছেলেকে একই এলাকার বাসিন্দা জাফরের হাতে তুলে দেয়। এ খবর জানার পর তিনি জাফরের কাছে গিয়ে হাত জোড় করে, এমনকি পায়ে ধরে অনুরোধ করেন যত টাকা লাগে আমি দেব, শুধু আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন। কিন্তু তার আকুতি-মিনতি সত্ত্বেও জাফর তার ছেলেকে আর ফেরত দেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। যারা এ ধরনের মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি সরকারের কাছে তার নিখোঁজ ছেলে রাসেলকে দ্রুত খুঁজে বের করে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানান।

সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া এলাকার বাসিন্দা, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ ফিরুজের স্ত্রী জান্নাতুল ইমা বলেন, ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার স্বামী ঘর থেকে বের হন। প্রায় এক ঘণ্টা পর ফোন করে বলেন, ‘আমি চলে যাচ্ছি, দোয়া করিও।’ এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় তার স্বামীও থাকতে পারেন, কারণ এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে না।

জান্নাতুল ইমা বলেন, ‘আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, যারা প্রলোভন দেখিয়ে আমার স্বামীকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক।’ 

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নৌকাডুবিতে নিখোঁজদের বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি বাংলাদেশের বাইরে সংঘটিত হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং নিখোঁজদের স্বজনদের কাছ থেকে একাধিক মানব পাচারকারীর নাম উঠে এসেছে।

তিনি আরও জানান, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে পাচারকারীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তিনি জানান, সর্বশেষ টেকনাফ উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন শাহ পরীরদ্বীপ কোনাপাড়া এলাকার ইসমাইল, দক্ষিণপাড়ার ফারুক ও সাবরাং মুন্ডাল ডেইল এলাকার ইব্রাহিম। গত রবিবার গভীর রাতে শাহ পরীরদ্বীপ ও সাবরাং এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী
আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিইআরসি

সরকার গত বুধবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দাম নির্ধারণের এক দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী (লাইফলাইন) প্রান্তিক গ্রাহক এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম আগের হারেই থাকছে। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিম্ন আয়ের বা বসতিতে বসবাস করা গ্রাহকরাও এই সুবিধা পাবেন না। কারণ তারা পরিবার নিয়ে কমপক্ষে দুটি ঘরে বসবাস করেন। অন্ধকার এড়াতে ও একটু স্বস্তি পেতে দুটি ফ্যান, দুটি লাইট, একটি টিভি ও একটি ফ্রিজ ব্যবহার করেন। এতে মাসে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের ব্যবহার হয়, যা কমপক্ষে ১৯২ ইউনিটে গিয়ে দাঁড়াবে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ ১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

ডিপিডিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষ অনেক বিলাসী হয়ে গেছেন। কাজেই যে মানুষটি বসতিতে থাকেন বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন তিনিও দুটি রুম নিয়ে থাকেন। পরিবারের একটু স্বস্তির জন্য দুটি ফ্যান ব্যবহার করেন। ফ্রিজ ব্যবহার করেন। অধিকাংশ পরিবার সারা দিন টিভি দেখে। কাজেই পুরো মাসে এসব পরিবারে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতেই পারে। এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিল আসবে। এ জন্য তাকে প্রতি মাসে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।’

বিইআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা বহাল থাকবে। জুন থেকে এ হার কার্যকর হবে। এর আগে গত বুধবার বিইআরসি খুচরা বিদ্যুতের যে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছিল, সেখানে প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে প্রান্তিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৬৯ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ৯২ পয়সা বেশি গুনতে হতো।

বিইআরসি জানায়, বুধবার জারি করা আদেশে নির্ধারিত এ দুই শ্রেণির মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য ৪ জুন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো আবেদন করে। পরে শুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২(খ) ও ৩৪ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ (খুচরা) ট্যারিফ প্রবিধানমালার বিধান অনুযায়ী বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না করে আগের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহারের ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর আয় কমবে। সেই ঘাটতি সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করতে হবে। তবে বুধবার জারি করা খুচরা বিদ্যুতের নতুন দাম-সংক্রান্ত আদেশের অন্য সব অংশ অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। এর ফলে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ঘোষিত নতুন মূল্যহার বহাল থাকছে। শিল্প, বাণিজ্যিক, সেচ ও অন্যান্য গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রেও নতুন দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করে বিইআরসি। পরে বুধবার বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বেশি ইউনিট ব্যবহারকারীদের মতো আবাসিক গ্রাহকদের সব স্তরেই দাম বাড়ানো হয়েছিল। তবে প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এই দুই শ্রেণির বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। তার পরও নিম্ন আয়ের গ্রাহকরা সেই সুবিধা পাবেন না। কারণ সারা দেশে অধিকাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল আসে ৫০ থেকে ৭৫ ইউনিটের।

জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০১ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০২ পিএম
জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

আধুনিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ। ঘর-বাড়ি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সব ক্ষেত্রই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয় ধ্বংস, গাছপালা নিধন, খাল-নদী-নালা ভরাট করে গড়ে ওঠা আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এর অপচয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, পরিবর্তিত জীবনযাত্রা এবং পরিকল্পনাহীন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। এর আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে, যা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। বছর বছর বাড়ছে বিদ্যুতের দাম।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, জনপ্রিয় ইংরেজি প্রবাদ ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’, এখনো যথেষ্ট পালনীয়। এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাও, তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠো’। পাঠ্যবইয়ের এই শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়, সব বয়সী মানুষের জন্যই এখন সমানভাবে প্রযোজ্য। কেননা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনধারা ও অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণে মানুষ রাত জেগে থাকতে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের জীবনেও। গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা বা অনলাইন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার কারণে তাদেরও সকাল শুরু হয় দেরিতে।

একসময় শিক্ষার্থীরা ভোরে উঠে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসে পড়াশোনা করত। কিন্তু এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর পড়তে বসে। ফলে ফ্যান, লাইট বা এসির ব্যবহার প্রয়োজন হয়। ফলে যে কাজ একসময় প্রাকৃতিক পরিবেশে সম্পন্ন হতো, তা এখন অনেকটাই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে দিন-রাতে সমান তালে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে।

এ ছাড়া বিদ্যুতের অপচয়ের আরেকটি বড় ক্ষেত্র সরকারি ও বেসরকারি অফিস। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা অফিসে পৌঁছানোর আগেই কক্ষের লাইট, ফ্যান এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) চালু করে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অফিস শেষ হওয়ার পরও এসব যন্ত্র দীর্ঘ সময় চালু থাকে। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে লাখের বেশি অফিস রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য অপচয়ও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একই চিত্র দেখা যায়– হাসপাতাল, ব্যাংক, মার্কেট, শপিং মল এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনেও। দিনের আলো পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম আলোর ব্যবহার অব্যাহত থাকে। অনেক ভবনে জানালা থাকা সত্ত্বেও ভারী পর্দা টেনে রাখা হয়, ফলে দিনের বেলায়ও লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এতে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

নানা সংকটে ভবন নির্মাণের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। শহরাঞ্চলের নতুন অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে ক্রমেই কমে আসছে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের ব্যবহার। বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এই দেশে শীতপ্রধান দেশের মতো ভবন নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বহু ভবন নির্মিত হচ্ছে শীতপ্রধান দেশের নকশার আদলে। ফলে পর্যাপ্ত বাতাস ও সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ থাকছে না সেসব ভবনে। এতে বাসিন্দাদের সারা বছর ফ্যান, এসি ও বৈদ্যুতিক আলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে স্থানীয় আবহাওয়া ও পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হলে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।

ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রবণতা কমে গেছে। অনেক সময় দেখা যায়, উপাসনালয়ে মানুষের সংখ্যা কম থাকলেও একাধিক ফ্যান, এসি ও লাইট দীর্ঘ সময় ধরে চালু রাখা হয়। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বাসাবাড়িতেও বিদ্যুতের অপচয় উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। অনেক পরিবারে দিনে এবং রাতে অপ্রয়োজনীয় লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়। ব্যবহারের পর টেলিভিশন, কম্পিউটার, চার্জার কিংবা অন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করা হয় না। সবার মাঝে ধারণাটা এমন যে– ‘আমার বিল তো আমি দিই, সমস্যা কোথায়?’ প্রকৃত সত্য হলো, ভোক্তার এই বিল জমা দেওয়ার পরও রাষ্ট্রকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে জনগণের করের টাকা থেকে।

নগরবিদদের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে আহ্বান করা যেতে পারে। অযথা বিদ্যুৎ ব্যবহার থেকে সরে আসার জন্য সতর্কতামূলক প্রচারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ধনাঢ্যদের প্রতি বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির উৎসের সন্ধান করার আহ্বান জানানো যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের শহরগুলোতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার বাড়াতে এবং বিদ্যুতের অপচয় কমাতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা দরকার। ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক করা, যাতে পাশের ভবন আলো-বাতাসে বাধা না দেয়। একই সঙ্গে ভবনের দেয়ালে জানালার সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা, যা দিনের আলো ঘরের ভেতরে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। ভবনের উচ্চতা ও চারপাশের ফাঁকা জায়গার অনুপাত এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে ভবনের ভেতর, যা বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে দেবে।’

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা না গেলে সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিপুল অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হয়। গত বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বৈঠকে জানানো হয়, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। 

প্রতিবছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও আর্থিক ক্ষতির সমাধান হচ্ছে না। গত বুধবারও নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। চলতি জুন মাস থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে।

এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সময় পাইকারি পর্যায়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় উন্নীত হবে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি গুনতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় কমানো গেলে জাতীয় পর্যায়ে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। 

সংকট সমাধান করতে লাভের চেয়ে গ্রাহককে গুরুত্ব দিতে বললেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে বড় সংকট রয়েছে। এ খাতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘চোরদের নিয়ন্ত্রণে’। এসব চোর ভোক্তাবিরোধী এবং গণবিরোধী। তাই সংকটের সমাধান হচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর জন্য বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু ঘাটতি কি কমেছে? উল্টো প্রতিবছর বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে কম খরচে উৎপাদন এবং সরকারকে মুনাফা অর্জনের চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। তারা দাম বাড়াতে চায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের হয়ে দাম কমানোর জন্যও আইন করা প্রয়োজন। আর যারা চুরি করে কাঠামোগতভাবে সংকট তৈরি করে রেখেছে সেই চোরদের ধরে ধরে বিচার করতে হবে, না হলে এই ঘাটতি থেকেই যাবে।’

খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়
ছবি: সংগৃহীত

ভূমি হস্তান্তরসংক্রান্ত নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অস্থায়ী নকলনবিশদের পদোন্নতি ঘিরে ঘুষ লেনদেনের তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়। গত ৭ এপ্রিল খবরের কাগজে ‘ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে পদোন্নতি-বাণিজ্য/টাকা দিলেই নাম ওপরের দিকে, না দিলে বাদ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ভবন পরিদর্শনে যান তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইন ও বিচার বিভাগের সহকারী সচিব (সিভিল জজ) মো. জিয়া উদ্দীন। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদোন্নতি পেতে ইচ্ছুক নকলনবিশদের কাছ থেকে দফায় দফায় ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা দিলেই তালিকার ওপরের দিকে নাম উঠে আসে, আবার টাকা না দিলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। গত দুই বছরে কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও দাপ্তরিকভাবে দুটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে ঘুষ লেনদেন বিষয়ে পদোন্নতির তালিকায় থাকা নকলনবিশদের তাদের বক্তব্য লিখে এনে সরেজমিনে হাজির থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দীন। যাতে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশরা নির্ভয়ে তাদের বক্তব্য পেশ করতে পারেন। নির্দেশনা অনুসারে অন্তত ১১ জন নকলনবিশ তাদের লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থিত হওয়ার আগেই ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে বক্তব্য দেওয়ার জন্য নকলনবিশদের মৌখিকভাবে জানানো হয়। ফলে নির্দিষ্ট ফরম্যাট মেনে একই ধরনের বক্তব্য পেশ করেছেন ১১ জন নকলনবিশ। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে অস্থায়ী নকলনবিশরা রাজস্ব খাতে স্থায়ী নকলনবিশ হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি জেলায় জেলা রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে নিয়োগ পদোন্নতি ও বাছাই কমিটি রয়েছে। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সভাপতিত্বে ওই কমিটির বৈঠকে গত দুই বছরে পদোন্নতির যোগ্যদের কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও গত বছরের ১৬ মার্চ দাপ্তরিকভাবে প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবিত পদোন্নতির ওই তালিকায় ১০ জন অস্থায়ী নকলনবিশের নাম আনা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশদের ১০ বছরের কাজের বিবরণ ও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। কাগজপত্র সরবরাহের জন্য তিন দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ওই তালিকায় নকলনবিশ মো. শামীম, মোসা. পারভীন আক্তার, মো. আতাউর রহমান, মোসা. কামরুন নাহার, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শফিকুর রহমান, মোসা. আনোয়ারা আক্তার, মো. আবু সাঈদ মিয়া, মোসা. মাসুদা আক্তার ও মো. মারুফ আহম্মদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কোনো কারণ উল্লেখ ছাড়াই কয়েক মাস পদোন্নতির বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে আরও কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হয়। তবে দাপ্তরিকভাবে ওই তালিকাগুলো প্রকাশ করা হয়নি। পরে একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দাপ্তরিকভাবে আরেকটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এবারও নকলনবিশদের প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পাঁচ দিন সময় বেঁধে সাব-রেজিস্ট্রারদের চিঠি দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। এই তালিকায় ১১ জন নকলনবিশের নাম উল্লেখ করা হলেও আগের তালিকা থেকে মো. শামীম ও আতাউর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়। তালিকায় নতুন যুক্ত হন বেলাল হোসেন, মনির হোসেন ও পারুল আক্তার। এই তালিকা আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। 

সে সময় ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ঘুষ লেনদেনের বিষয় অস্বীকার করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদোন্নতি নীতিমালার আলোকে নকলনবিশদের ১০ বছরের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু তালিকায় যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ সন্তোষজনক নয়।’

তারা (নকলনবিশ) কি কাজ করেন না? এমন প্রশ্নের উত্তরে জেলা রেজিস্ট্রার বলেন, নকলনবিশদের কাজই হলো ‘বালামে দলিল লিপিবদ্ধ করা, দলিলের অবিকল নকল (সার্টিফায়েড কপি) করা।’ কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে লোকবল কম থাকায় তাদের দিয়ে অন্য কাজও করা হয়। ফলে তাদের মূল কাজের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়। এখন মোহরার-টিসি মোহরারসহ অন্তত ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। নীতিমালা অনুসারে প্রকৃত যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য নতুন তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশে উল্টো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার কর্মীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের ফলে দেশে চলমান ৮ শতাংশের ওপর থাকা মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। 

বিদ্যুৎ খাতের অপচয় ও চুরি বন্ধ না করে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে সব শ্রেণির গ্রাহক পর্যায়ে এই দাম বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আপত্তি সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) প্রস্তাবে প্রান্তিক গ্রাহক ও কৃষিতে দাম বাড়ানোর কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্রশিল্প বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শওকত আলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দেশে চলমান মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি এখন ৮ শতাংশের ওপরে (বিগত মাসগুলোতে যা ছিল প্রায় ৮.২২ শতাংশ)। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘যুগোপযোগী নয়’ বলে আখ্যা দেন অধ্যাপক শওকত আলী। আগে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৫ টাকা ২৬ পয়সা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সায়। এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতেও বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।

ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত সেবার জন্য মানুষ কিছুটা বাড়তি টাকা দিতেও রাজি থাকে। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামীণ গ্রাহকরা বাড়তি দাম দিয়েও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ গেলে আর আসার নাম থাকে না, সেবার মানও অত্যন্ত নাজুক। এই অবস্থায় যদি লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে দেশের বাজারে অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অধ্যাপক শওকত আলী বলেন, ‘কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কমলেও আমাদের দেশে সেই অনুপাতে দাম কমানো হয়নি। উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে কৃষি ও পরিবহন খাত রেহাই পাবে না বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এর পাশাপাশি পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আর পরিবহন খরচ বাড়লে তার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়বে সাধারণ পণ্যের ওপর, যার ফলে বাজারে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।’

দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশেও তেলের দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে সরকার উল্টো অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করেছে।’ জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হলে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখা জরুরি ছিল।

অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এমনিতেই দেশের ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতি ৮ ডিজিটের (৮ শতাংশ) ওপরে, গত মাসের আগের মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। এখন নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে বাজারে এবং ইনফ্লেশন আরও বাড়বে।’

খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে নতুন দাম ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণের প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পিডিবির (পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আরইবির (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) প্রস্তাবে এই দাম বাড়ানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘গ্রাহকরা ভালো সেবার জন্য বেশি টাকা দিতে রাজি থাকেন। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামের সাধারণ গ্রাহকরা এমনিতেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার। বিদ্যুৎ গেলে আর আসতে চায় না। এই অবস্থায় সেবার মান না বাড়িয়ে হুট করে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি যোগ করেন, যদি এই বাড়তি দাম দেওয়ার পরও লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে সাধারণ মানুষ তা মেনে নেবেন না।

কৃষি খাতে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ১১ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই অধ্যাপক। তার মতে, কৃষকরা ইরিগেশন বা সেচব্যবস্থার জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এই দুই খাতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এসএমই খাতের অবস্থা দেশের বাজারে এমনিতেই নাজুক, তার ওপর এই বাড়তি বিদ্যুতের বিল তাদের আরও বড় সংকটে ফেলবে।

বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহনসহ প্রতিটি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কাঠামোর সমালোচনা করে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এবারের বিদ্যুতের দাম একদম নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত–সব পর্যায়েই বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে।’ তিনি সরকারের দ্বিমুখী নীতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একদিকে সরকার কৃষকদের ধান চাষ বা কৃষিকাজের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও টাকা দিচ্ছে, আর অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

সরকারি বাসে বেসরকারি থাবা, পকেট ভরছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১০:১৫ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ১০:১৬ এএম
সরকারি বাসে বেসরকারি থাবা, পকেট ভরছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) এখন যেন একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সিন্ডিকেটের অবাধ লুটপাটের চারণভূমি। সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও আধুনিকায়ন নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, স্রেফ পকেট ভারী করতে রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল পজ মেশিনের টিকিট বুকিং ব্যবস্থা। অ্যানালগ পদ্ধতিতে হাতে লিখে টিকিট বিক্রি করে যাত্রীপ্রতি বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার শাটল বাস থেকেও প্রতিদিন গায়েব করা হয়েছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব।

এই প্রাতিষ্ঠানিক হরিলুটের পেছনে খোদ বিআরটিসি চেয়ারম্যান, পরিচালক ও অপারেশন্‌স বিভাগের শীর্ষ কর্তাদের সরাসরি যোগসাজশ ও সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। 

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ দায়িত্বশীলরা পুরো বিষয় সম্পর্কে ‘ওয়াকিবহাল’ এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারপরও মাঠপর্যায়ে বহাল তবিয়তে রয়েছে এই চক্র।

বিতর্কিত পিএসের ‘ঘনিষ্ঠ’ মাহতাব সিন্ডিকেটের তাণ্ডব

রাজধানীর গুলিস্তান এবং ফুলবাড়িয়ায় এখন নির্দিষ্ট কোনো ডিপো নেই। সে কারণে কখনো মতিঝিল, কখনো যাত্রাবাড়ী বা অন্য ডিপো থেকে বাস এনে রুট পরিচালনা করা হচ্ছে। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে সেই বাসগুলো বিভিন্ন কোম্পানির ব্যানারে পরিচালনা করা হচ্ছে। এই বাসগুলোর মেরামত ও যন্ত্রাংশ সংযোজন; তেল নেওয়ার কাজগুলো দেখভাল করেন মতিঝিল বা যাত্রাবাড়ী ডিপোর কর্মকর্তারা। অথচ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই বিআরটিসির কর্মকর্তাদের কাছে। রুটে বাস চলাচলে যে লভ্যাংশ অর্জিত হচ্ছে, তারও সঠিক হিসাব দিচ্ছে না ইজারাদার। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিআরটিসির অপারেশন্‌স বিভাগের ব্যবস্থাপক নূর-ই-আলম এবং উপ-ব্যবস্থাপক (নির্মাণ) মো. মনিরুজ্জামানের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় সেখানকার সি-ক্যাটাগরির চালক মো. মাহতাবুল ইসলাম ওরফে মাহতাব গড়ে তুলেছেন এক বিশাল সিন্ডিকেট। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত পিএস হাফিজুর রহমান লিকুর ‘ঘনিষ্ঠজন’ পরিচয়ে মাহতাব এখন গুলিস্তান-দাউদকান্দি এবং গুলিস্তান-নারায়ণগঞ্জ রুট একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। মাহতাবের সঙ্গী হিসেবে রনি ও বিল্লাহর নাম জানিয়েছেন একাধিক পরিবহন মালিক। বিআরটিসির শ্রমিক-কর্মচারী লীগের একসময়ের সহ-সম্পাদক মাহতাব এখন বিএনপি-সমর্থিত শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এভাবেই তিনি বিআরটিসিতে চাকরি করেও সেই প্রতিষ্ঠানের বাসই ইজারা নিয়ে ‘সব মহলকে’ সন্তুষ্ট করে আলাদাভাবে ব্যবসা করছেন।

এখানেই শেষ নয়। গুলিস্তান-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস পরিচালনা করে ঢাকা নগর পরিবহন। মাহতাব সিন্ডিকেটের কারণে এই রুটে নির্বিঘ্নে বাস পরিচালনা করতে পারছে না ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএ।

মাহতাব ও তার সঙ্গীরা একাধিকবার ঢাকা নগর পরিবহনের কাউন্টারে ভাঙচুর ও হামলা চালিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিসির আইডি কার্ড ধারণ করে এই হামলা চালানো হয়। এর কিছু ভিডিও ফুটেজও সংগ্রহ করেছে খবরের কাগজ। নারায়ণগঞ্জে ঢাকা নগর পরিবহনের কাউন্টারে ভাঙচুরের পর ফতুল্লা থানায় জিডিও করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে মাহতাব খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকা নগর পরিবহন কাউন্টারের কারণে আমরা বিআরটিসির বাস পরিচালনা করতে পারছি না। বিআরটিসির বাসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে এই বাস। আমরা যাত্রী নেব না?’ ভাঙচুরের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের মধ্যে কোনো গ্যাঞ্জাম নাই। সব ঠিক আছে।’

বিআরটিসির বাস ইজারা নিয়ে পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো তো আমরাই (বিআরটিসির কর্মচারী) পরিচালনা করছি।’ এ সময় মাহতাবকে রনি ও বিল্লাহর মতো আরও ক’জন সঙ্গীর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তারাও আমাদের সঙ্গে থাকে। দাউদকান্দি ও নারায়ণগঞ্জ রুট চালাতে (পরিচালনা) একার পক্ষে কতটা সম্ভব?’ বিআরটিসির স্টাফ হয়ে কীভাবে নিজেই বাস ইজারা নিয়ে রুট পরিচালনা করছেন, এ প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করেও তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।

ইজারার মাধ্যমে বেশ কয়েকটি রুটে বাস পরিচালনা করছে বিআরটিসি। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিনিয়ত নিয়ম লঙ্ঘন করছে। যে রুটে এসব বাস পরিচালনা করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে (যাত্রী ও পণ্যপরিবহন কমিটি বা আরটিসি) কিছুই জানাচ্ছে না সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। 

গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়ার অনিয়ম নিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা বিআরটিসির ম্যানেজার নূর-ই-আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি কোনো মন্তব্য করব না। কারণ আমি এই সেক্টরের (গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নই। বিআরটিসির নানা বিষয় নিয়ে যে অভিযোগ করছেন, তা নিয়ে বলার জন্য আমি যথোপযুক্ত ব্যক্তি নই। আমার মনে হচ্ছে, কেউ আপনাদের ভুল তথ্য দিচ্ছে। গত ৩৩ মাস ধরে বিআরটিসিতে আমি কোনো ডেস্কেই নেই।’ আরেক অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান খবরের কাগজের বার্তার কোনো উত্তর দেননি।

ডিজিটাল সিস্টেম অচল করে অ্যানালগে ডাকাতি, জিম্মি সাধারণ যাত্রী

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় যেখানে সরকারি গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের জোর চেষ্টা চলছে, সেখানে বিআরটিসির ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তান সিবিএস-২ কাউন্টারে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ডিজিটাল পস মেশিনের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি সচল থাকলেও হঠাৎ করে গত ৯ ফেব্রুয়ারি সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

বর্তমানে সম্পূর্ণ অ্যানালগ পদ্ধতিতে হাতে লিখে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাতে লেখা টিকিট খবরের কাগজের হাতে এসেছে।

ফুলবাড়িয়ার বাস মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদযাত্রা উপলক্ষে যাত্রী সাধারণের অতিরিক্ত চাপকে কেন্দ্র করে কাউন্টারের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা বন্ধ করেছে। সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিতেই এই কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা। 

বিআরটিসির অফিশিয়াল চার্ট অনুযায়ী ঢাকা-বরিশাল রুটে সর্বোচ্চ ভাড়া ৭৩০ টাকা নির্ধারিত। তবে কাউন্টারে টিকিট প্রতি ৮০০ টাকা বা তারও বেশি আদায় করা হচ্ছে। পস মেশিন সচল থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই অসৎ উদ্দেশ্য থেকে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি গাড়ি থেকে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ হাজার অতিরিক্ত টাকা যাত্রীদের পকেট থেকে জোর করে নেওয়া হচ্ছে। এই টাকা কাউন্টারের লোকজন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে। এর ফলে সরকারি কোষাগার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। 

বিআরটিসির পরিচালক (প্রশাসন) রাহেনুল ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নন বলে দাবি করেন। তিনি জানান, বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। বিআরটিসির বাসে শিগগির ই-টিকিট ব্যবস্থা চালু হবে। 

বাণিজ্য মেলার শাটল বাসে ‘টিকিট জালিয়াতি’, রাজস্ব লুট 

৩০তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার দর্শনার্থীদের জন্য নিয়োজিত শাটল বাস সার্ভিস থেকে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব চুরির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিআরটিসির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এই চোর সিন্ডিকেটের পেছনে বিআরটিসির দুজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম ঘুরেফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দায়িত্বপালনকারী বিআরটিসির বিভিন্ন বাসের ট্রিপ-শিট এবং টিকিট বিক্রির খতিয়ানও এসেছে খবরের কাগজের হাতে। 

এরপর বিআরটিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে খবরের কাগজ। তারা জানান, বাণিজ্য মেলার টিকিট জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এই পুরো প্রক্রিয়াটি দেখভাল করছেন রাজধানীর জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে তারা মেলা প্রাঙ্গণ এবং কুড়িল বিশ্বরোড কাউন্টারে যান। সেখানে পজ মেশিন জালিয়াতি করে টাকা চুরি করেন। 

সাধারণ দিনগুলোতে ৬-৭টি মেশিন সারানো হলেও শুক্র, শনি এবং অন্য সরকারি ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়কে কাজে লাগিয়ে ৮ থেকে ১০টিরও বেশি পজ মেশিন এন্ট্রি ছাড়াই পরিবর্তন করা হয়।

এখানেই শেষ নয়, বাণিজ্য মেলায় বিশেষ শাটল বাস সার্ভিস চালু করতে ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ব্যয়ের খতিয়ান থেকে দেখা যায়, বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করা হয়েছিল ডেকোরেশন ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনায়। এর মধ্যে লাইটিং ও ডেকোরেটর খাতে ১০ লাখ টাকা, বিবিধ খরচ ৮ লাখ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপ্যায়নে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিপুল অঙ্কের টাকা কোথায় কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে বিআরটিসির সাধারণের মধ্যেও কৌতূহল রয়েছে।

বিআরটিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘২৯তম বাণিজ্য মেলায় ১৫ লাখ টাকার মতো উত্তোলন করা হয়েছিল। তাতেও টাকা বেঁচে গিয়েছিল। ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে–এটা জেনে আমরাও অবাক হয়েছি।’

সব ভুয়া, সব মিথ্যা: বিআরটিসির চেয়ারম্যান

এসব অনিয়ম সম্পর্কে জানতে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করে খবরের কাগজ। তাকে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হয়। এর তিন দিন পরে ফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সব অভিযোগ মিথ্যা। কেউ আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে এমন অভিযোগ দিচ্ছে।’ প্রতিবেদক তাকে এসময় জানান, বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নথিতেই এসব অভিযোগের বিষয়ে বলা হয়েছে। তখন আব্দুল লতিফ মোল্লা রাগত স্বরে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সব ভুয়া। ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে আপনি প্রশ্ন করছেন।’ পরে এই প্রতিবেদক তার কার্যালয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে বার্তা পাঠান। কিন্তু তিনি তাতে সাড়া দেননি।