কক্সবাজার জেলার সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে মানব পাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য। বিজিবি, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে ভিকটিম উদ্ধার ও পাচারকারীরা আটক হলেও থেমে নেই মানবপাচার। পাচারকারীদের খপ্পড়ে পড়ে উপজেলার বহু মানুষ নিঃস্ব হয়েছে। সাগরে প্রায়ই মানববোৱঝাই ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটছে। এতে বাড়ছে স্বজনহারা পরিবারের সংখ্যা।
টেকনাফ পৌর শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরত্বে বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়ায় মো. ইউসুফের বাড়ি। তার বড় ছেলে মো. রিদুয়ান (২৭) একটি ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। পথে ট্রলারটি সাগরে ডুবে যাওয়ার পর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। সেই শোকে পাথর বাবা ইউসুফ।
রিদুয়ানের বাবা মো. ইউসুফ বলেন, ‘আমার ৪ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে সবার বড় সন্তান রিদুয়ান। সে ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি আসে। এরপর এলাকার এক ব্যক্তির খপ্পরে পড়ে গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে কচ্ছপিয়া এলাকার আরেক অন্যতম মানব পাচার চক্রের সদস্য দালাল জাফরের মাধ্যমে সাগরপথে বড় ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা করে। ট্রলারে ওঠার পরও দালালের মাধ্যমে কথা হয় তার সঙ্গে।’
মো. ইউসুফের দাবি, ৯ এপ্রিল বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে ২৫০ জনের মধ্যে জীবিত উদ্ধার হয় ৯ জন। কিন্তু তাতে রিদুয়ান নেই। এখন ছেলের লাশের অপেক্ষায় বাবা।
নিখোঁজ রিদুয়ানের মা শাহিনা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে বিয়ে করেছে এখনো এক বছর হয়নি। তার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যায় সে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে কোনো খবর পাচ্ছি না আমার ছেলের। দালালের মাধ্যমে যেতে চেয়েছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সাগরে মাঝপথেই ডুবে গেল সে স্বপ্ন। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি আমার ছেলের লাশটি চাই। আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, সে জন্য দালালদের খুঁজে বের কঠিন শাস্তি দেওয়া হোক।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাচারকারীরা টেকনাফের বিভিন্ন উপকূলীয় নৌঘাট ও সংলগ্ন এলাকাকে নিয়মিতভাবে মানব পাচারের কাজে ব্যবহার করছে।
চিহ্নিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবরাং ইউনিয়নের শাহ পরীরদ্বীপ, মিস্ত্রিপাড়া, ঘোলাচর, পশ্চিমপাড়া এবং সাবরাং কাটাবনিয়া নৌঘাট, খুরেরমুখ, মুন্ডার ডেইল, বাহারছড়া নৌঘাট। এ ছাড়া নোয়াখালীপাড়া নৌঘাট, শীলখালী নৌঘাট, বড় ডেইল নৌঘাট, কচ্ছপিয়া নৌঘাট, মাথাভাঙ্গা নৌঘাট এলাকাও ব্যবহৃত হচ্ছে। একইভাবে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, তুলাতলী নৌঘাট, লম্বরী নৌঘাট, হাবিবছড়া নৌঘাট, রাজরছড়া নৌঘাট এবং মিঠাপানির ছড়া নৌঘাটও এ ধরনের কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
বাংলাদেশ কোস্টগার্ড শাহ পরীরদ্বীপ বিসিজি আউটপোস্টের কোস্টগার্ডের চিফ পেটি অফিসার এম শামছুল আলম মিয়ার বাদী হয়ে করা এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ৯ এপ্রিল দুপুর ১টায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইড আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় কয়েকজন মানুষকে দেখতে পায়। তারা ড্রাম ও কাঠের টুকরা ধরে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। পরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে জাহাজটি। অভিযানে মোট ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি এবং এক নারীসহ ৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক ছিলেন। উদ্ধারকৃতরা টেকনাফ এবং উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। এফবি তানজিনা সুলতানা নামক একটি বড় ফিশিং বোটে করে তারা গত ৪ এপ্রিল অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পথে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বোটটি ডুবে গেলে তারা সমুদ্রে ভাসতে থাকেন। পরে উদ্ধারকৃতদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কোস্টগার্ডের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, উদ্ধারকৃত ৯ জনের মধ্যে ৬ জন মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত এবং বাকি ৩ জন পাচারের শিকার। এ তথ্যের ভিত্তিতে ১১ এপ্রিল রাত ১টা ৪৫ মিনিটে কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে ৬ মানব পাচারকারীকে আটক করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, শাহ পরীরদ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ সদর, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে যুবকসহ সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে দালালদের মাধ্যমে পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব স্থাপন বা দাওয়াতের কথা বলে তাদের ফাঁদে ফেলা হয়, পরে কৌশলে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তুলে নেওয়ার পর ভুক্তভোগীদের পাহাড়ি এলাকায় ঝুপড়ি ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। এরপর তাদের একটি অংশকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। স্থানীয়দের মতে, মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন নৌঘাটগুলোকে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় আনলে মানব পাচার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি পাচারকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পাচারকারীদের একটি চক্রে ২০-৩০ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এদের কেউ কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আস্তানায় নিয়ে যায়, আবার কেউ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে নৌকায় করে সাগরের মাঝপথে পাঠিয়ে দেয়। চক্রের বড় গডফাদাররা গোপন আস্তানায় অবস্থান করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অধিকাংশ অর্থ লেনদেন করা হয় বিকাশের মাধ্যমে।
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের মুন্ডার ডেইল, সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া, কচ্ছপিয়া এবং রাজারছড়া এলাকা থেকে দালালের মাধ্যমে ছোট ছোট নৌকায় করে তাদের একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। প্রায় ২৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। যাত্রার প্রায় চার দিন পর এটি আন্দামান সাগরের দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর তারা পানির ড্র্রাম, তেলের ট্যাংক, ফোম ও কাঠ ধরে প্রায় দুই দিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় থাকেন। পরে একটি বাংলাদেশি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে এবং কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। এ ঘটনায় এখনো অনেক যাত্রীর খোঁজ না মেলায় স্বজনদের মধ্যে গভীর শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
এ ছাড়া জানা যায়, ভিকটিমরা মায়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী, যারা টেকনাফ এলাকায় অবস্থান করছিল। তাদের আর্থসামাজিক দুর্বলতা ও অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা এবং পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে অপহরণ, জোরপূর্বক শ্রম আদায় এবং নারী পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত। মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইন ২০১২-এর ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আটককৃতদের সঙ্গে আরও ১০-১৫ জন অজ্ঞাতনামা সদস্য একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা বিভিন্ন প্রলোভন যেমন উন্নত জীবনযাপন, উচ্চ বেতনের চাকরি এবং অবিবাহিত নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা করছিল।
আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া একমাত্র নারী উখিয়ার জামতলী ক্যাম্প-১৫-এর বাসিন্দা রাহেলা বেগম জানান, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে তার খালাতো ভাই ক্যাম্প থেকে দালাল চক্রের আস্তানায় নিয়ে যান। এরপর গত ৪ এপ্রিল তারা মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন। তিনি বলেন, যাত্রার চার দিন পর হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলে ট্রলারটি ডুবে যায়। ওই ট্রলারে প্রায় ২০ জন নারী ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি একটি ফোম ও কাঠ ধরে কোনোভাবে ভেসে থাকেন। পরে একটি জাহাজ তাকেসহ আরও ৯ জনকে উদ্ধার করে।
রাহেলা বেগম আরও জানান, এই দুর্ঘটনায় তার খালাতো ভাই মারা গেছেন এবং ট্রলারে থাকা আরও অনেকে সাগরে ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন।
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগরে নৌকাডুবিতে উদ্ধার হওয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দার মো. রফিক জানান, উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ২ এপ্রিল তাকে বাড়ি থেকে বের করে নেওয়া হয়। পরে একটি ঘরে আটকে রেখে তার মুখ, হাত ও পা বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর দুই দিন পর গভীর রাতে একটি ছোট ট্রলারে তুলে সাগরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে আরেকটি বড় ট্রলারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে প্রায় ২৪০ জন ভুক্তভোগী এবং ২০ জন দালাল ছিল বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ এপ্রিল সকাল ৫টার দিকে হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হয়। একের পর এক ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। অনেকেই মারা যান, কেউ কেউ পানিতে ভেসে থাকেন। তিনি একটি পানির বোতল ধরে ভেসে থাকেন। পরদিন একটি তেলবাহী জাহাজ ভাসমান অবস্থায় থাকা ৯ জনকে উদ্ধার করে।
নিখোঁজ ভিকটিম সাদেকের মা সাবরাং ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মদিনা বেগম জানান, তার একমাত্র ছেলে মো. সাদেক নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সাবরাং আলীর ডেইল এলাকার আব্দুল আমিন তার অজান্তে জোর করে ছেলেকে ট্রলারে তুলে দেয় এবং পরে ফোনে বিষয়টি জানায়।
মদিনা বেগম বলেন, তিনি তখন জানান তার ছেলে স্কুলপড়ুয়া এবং বিদেশ যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করা থাকলেও সে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাবে না। কিন্তু দালাল আব্দুল আমিন তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, টাকা বেশি লাগবে না, মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিলেই হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত বছর একইভাবে একজনকে পাঠিয়ে দ্বিগুণ অর্থ, প্রায় ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে ওই দালাল। তিনি জানান, তার ছেলে মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী ছিল না। কয়েক দিন পর তিনি জানতে পারেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি ট্রলার ডুবে গেছে। এরপর দালাল আব্দুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে জানায়, ট্রলারটি ডাকাতের কবলে পড়েছে এবং আড়াই লাখ টাকা দিলে তার ছেলেকে উদ্ধার করা হবে। মদিনা বেগম অভিযোগ করেন, টাকা দেওয়ার পর থেকে ওই দালাল মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখে এবং তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমি দালাল আব্দুল আমিনের কাছ থেকে আমার ছেলেকে জীবিত বা অন্তত তার লাশ ফিরে পেতে চাই। পাশাপাশি এদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৪ নভেম্বর রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লম্বরী এলাকার মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় দালাল ফয়সালের লিজকৃত জায়গার সুপারি বাগানে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা জোরপূর্বক রোহিঙ্গা নারী-শিশুকে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রেখেছে- এমন সংবাদে থানা-পুলিশের একটি টিম সেখানে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ৪ জনকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে রোহিঙ্গা ৩ জন নারী, ৯ জন শিশুসহ ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ফয়সাল (২৫), আজিমুল্লাহ (২৭), ইসমাইল (২৬), ফেরদৌস আক্তার (৩৮), মো. ইউনুছ (২১), মো. রফিক (১৯), সাইফুল্লাহসহ (৪০) অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জন দালাল চক্রের সক্রিয় সদস্যরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। আরও জানা যায়, গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ লম্বরী সাইফুলের বাড়ি থেকে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ৩০ ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে থানার পুলিশ। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২২ জন পুরুষ, ৭ জন নারী ও একজন শিশু ছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সাইফুল, ইসমাইল, ফয়সাল, ইয়াছিন, গফুর ও নুর নবী মাঝিসহ একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা এবং স্কুল-কলেজপড়ুয়া বাংলাদেশি তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফে নিয়ে আসে। এরপর তাদের পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়।
স্থানীয়রা আরও জানান, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় এসব সন্ত্রাসী চক্র পাচার, অপহরণ ও জিম্মি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাম্প্রতিক নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ভিকটিমদের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের একাধিক সূত্রে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কথিত মানব পাচারকারীর নাম উঠে এসেছে। অনেকের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অপহরণ, ডাকাতি, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ট্রলারডুবির ঘটনায় পাচারকারীরা আত্মগোপনে রয়েছে। তাদের ধরতে প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
সরেজমিনে গিয়ে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রিদুয়ান, সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এনায়েত উল্লাহ (১৭), একই এলাকার ফিরুজ (২৫), মো. রাসেল (২৬), আরাফাত (২৬) ও মো. আব্দুল মাহবুদ (৩০) এবং সাবরাং ৪ নম্বর ওয়ার্ড সিকদারপাড়া এলাকার সাদেকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নিখোঁজ হওয়ার বিস্তারিত জানা যায়। পরিবারগুলোর বরাত দিয়ে জানা যায়, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী অসাধু পাচারকারী তাদের চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে নানা প্রলোভন দেখিয়ে লোকজন সংগ্রহ করে এবং অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। সেখানে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরিবারগুলোর দাবি, ভয় ও আতঙ্কের কারণে অনেক সময় তারা মুখ খুলতে পারেন না। পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিভিন্ন এলাকায় তাদের সদস্য ছড়িয়ে রয়েছে, যা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন করে তুলেছে।
সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া এলাকার বাসিন্দা, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ মো. রাসেলের মা হামিদা খাতুন বলেন, ‘স্থানীয় দুই মানব পাচারকারী তার ছেলেকে একই এলাকার বাসিন্দা জাফরের হাতে তুলে দেয়। এ খবর জানার পর তিনি জাফরের কাছে গিয়ে হাত জোড় করে, এমনকি পায়ে ধরে অনুরোধ করেন যত টাকা লাগে আমি দেব, শুধু আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন। কিন্তু তার আকুতি-মিনতি সত্ত্বেও জাফর তার ছেলেকে আর ফেরত দেয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। যারা এ ধরনের মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি সরকারের কাছে তার নিখোঁজ ছেলে রাসেলকে দ্রুত খুঁজে বের করে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানান।
সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া এলাকার বাসিন্দা, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ ফিরুজের স্ত্রী জান্নাতুল ইমা বলেন, ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার স্বামী ঘর থেকে বের হন। প্রায় এক ঘণ্টা পর ফোন করে বলেন, ‘আমি চলে যাচ্ছি, দোয়া করিও।’ এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় তার স্বামীও থাকতে পারেন, কারণ এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে না।
জান্নাতুল ইমা বলেন, ‘আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, যারা প্রলোভন দেখিয়ে আমার স্বামীকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক।’
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নৌকাডুবিতে নিখোঁজদের বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি বাংলাদেশের বাইরে সংঘটিত হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং নিখোঁজদের স্বজনদের কাছ থেকে একাধিক মানব পাচারকারীর নাম উঠে এসেছে।
তিনি আরও জানান, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে পাচারকারীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তিনি জানান, সর্বশেষ টেকনাফ উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন শাহ পরীরদ্বীপ কোনাপাড়া এলাকার ইসমাইল, দক্ষিণপাড়ার ফারুক ও সাবরাং মুন্ডাল ডেইল এলাকার ইব্রাহিম। গত রবিবার গভীর রাতে শাহ পরীরদ্বীপ ও সাবরাং এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।