কবুতর শান্তির প্রতীক। বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কিংবা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন কবুতর উড়িয়ে সূচনা করা হয়। তবে একটা সময় পৃথিবীর বহু দেশে কবুতরের মাধ্যমে সংবাদ পাঠানোর রীতি প্রচলিত ছিল।
এক্ষেত্রে সংবাদ পাঠানোর কাজে ব্যবহারের জন্য বিশেষ জাতের কবুতর পোষা হতো। কবুতররা স্বাভাবিকভাবেই তাদের বাসা চেনে এবং দূরে কোথাও গেলে আবার তাদের বাসায় ফিরে আসতে পারে। আর বিশেষ প্রজাতির সংবাদবাহক কবুতরগুলো এ কাজে ছিল আরও দক্ষ। এদের বহু দূরে নিয়ে ছেড়ে দিলেও এরা বাসায় ফিরে আসত।
বর্তমানে ই-মেইল, কুরিয়ার বা ডাক বিভাগের মতো এত সুবিধা প্রাচীন যুগে ছিল না। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজা-বাদশাহদের সংবাদ আদান-প্রদানের বিষয়টি একসময় কবুতরের মাধ্যমেই হতো। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বর্তমান আধুনিক যুগেও একটি দেশ সংবাদ আদান-প্রদান করতে কবুতর ব্যবহার করছে। সেই দেশ কোনটি? সেটাই আপনাদের জানাব। তবে তার আগে আসুন, কবুতর সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য জেনে নেই।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের দিকে সিরিয়া এবং ইরানে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা বহন শুরু হয়। দ্বাদশ শতকে সিরিয়া এবং পারস্যে প্রথম এক শহর থেকে আরেক শহরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান সেবা চালু হয়।
বিশ্বের অন্যতম বড় সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জার্মানি থেকে বেলজিয়ামে লেটেস্ট খবর এবং স্টক এক্সচেঞ্জের খবর পাঠাতে কবুতরের সহায়তা নিত। সে সময় রেলগাড়ি ৭৬ মাইল যেতে সময় নিত ৪ ঘণ্টা, কবুতর নিত ২ ঘণ্টা।

কবুতর দিয়ে যারা বার্তা পাঠিয়েছিলেন
শোনা যায় কবুতরের মাধ্যমে জুলিয়াস সিজার রোমে গল জয়ের বার্তা পাঠিয়েছিলেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্টও ১৮১৫ সালে ওয়াটারলু যুদ্ধে পরাজয়ের বার্তা পাঠাতে কবুতরের সাহায্য নেন। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদদৌলার পারিবারিক কবরস্থানে নাকি একটি কবুতরের সমাধি দেখতে পাওয়া যায়, কথিত আছে কবুতরটি নবাবের হয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদান করেছিল। ভারত স্বাধীন হলে ১৯৪৮ সালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু সম্বলপুর থেকে কটকে কবুতর পাঠিয়ে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। সংক্ষিপ্ত সে বার্তায় তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বলেছিলেন— আপনারা এমনভাবে সভার আয়োজন করুন, যেন বক্তা আর শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ দূরত্ব না থাকে।
যেভাবে কাজ করত কবুতর
কোনো সংবাদ পাঠাতে হলে সংবাদটি ছোট্ট একটি কাগজে লেখা হতো। এরপর তা ছোট্ট একটি ধাতব কৌটায় রেখে কৌটাটি কবুতরের পায়ে বেঁধে দেওয়া হতো। কবুতরটি বাসায় ফিরে গিয়ে তার মালিকের কাছে পৌঁছে দিত সংবাদটি। সাধারণত সংবাদ আদান-প্রদান, রাজকার্যে এমনকি যুদ্ধের সময় খবর পাঠানোর জন্যও ব্যবহৃত হতো এই কবুতর। ‘চের আমি’ নামের এমনই এক কবুতর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে খবর পাঠানোর জন্য ‘ক্রইক্স ডি গ্যুরে’ পুরস্কার পায়। এই কবুতর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের গুলিতে অন্ধ ও একটি পা হারানোর পরও আমেরিকান সেনাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদ নিয়ে এসেছিল।

কবুতরের নামে রয়েছে কোটি রুপির সম্পত্তি
অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে, ভারতের রাজস্থান রাজ্যের নাগৌর অঞ্চলের জাসনগরে রয়েছে ‘মাল্টিমিলিয়নিয়ার’ কবুতরদের বাস। তাদের নামে রয়েছে কোটি কোটি রুপির সম্পত্তি। ৪০ বছর আগে নাগৌরে ‘কবুতর ট্রাস্ট’ নামের একটি সংস্থা স্থাপিত হয়। কবুতরদের খাবার খাওয়ানোর প্রাচীন প্রথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্পপতি সাজ্জানরাজ জৈন সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এই কবুতরদের সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে কয়েক একর জমি, নগদ অর্থ এবং অসংখ্য দোকানপাট।
যেখানে কবুতরই শেষ ভরসা
ভারত স্বাধীন হওয়ার আগের বছর, ১৯৪৬ সালে, যখন বিশ্বযুদ্ধ মাত্রই শেষ হয়েছে তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ সহজ করার জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ওড়িশা পুলিশকে ২০০ কবুতর উপহার দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে শুরু রাজ্যটির পিজিয়ন সার্ভিস। ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগকালে যখন রাস্তাঘাট, টেলিফোন যোগাযোগ ইত্যাদি সব বিধ্বস্ত হয়ে যেত তখন কবুতর দিয়েই বার্তা আদান-প্রদান করত ওড়িশা সরকার।
বর্তমানে, প্রয়োজন ফুরালেও বেলজিয়ান প্রজাতির কবুতর ঐতিহ্য হিসেবে বহন করছে ওড়িশা পুলিশ। দেখতে সাদামাটা হলেও; রীতিমতো পুলিশ ট্রেনিং পাওয়া এসব কবুতর ১৫ থেকে ২৫ মিনিটে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে, আর এরা বেঁচে থাকে ২০ বছর পর্যন্ত। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এটি বিরতি না নিয়ে ৫০০ মাইল পথ পাড়ি দিতে পারে ঘণ্টায় ৫৫ কিলোমিটার গতিতে। ছয় সপ্তাহ বয়স থেকে কবুতরগুলোর প্রশিক্ষণ শুরু হয়। কনস্টেবল প্রশিক্ষকদের তারা কণ্ঠস্বর দিয়ে চিনে নিতে পারে।
ওড়িশার পাহাড়ি জেলা কারাপুটে প্রথম পিজিয়ন পোস্ট চালু হয়। পরে এর প্রচলন ঘটানো হয় সব জেলাতেই। আরও পরে কটকে পুলিশের সদর দপ্তর স্থাপিত হলে সেখানে বেলজিয়ান হোমার পিজিয়নের একটি প্রজনন কেন্দ্রও গড়ে তোলা হয়। ওড়িশা পুলিশ সাধারণত তিন ধরনের কবুতর ব্যবহার করে থাকে। বন্যা বা ঝড়ের সময় ওয়ানওয়ে কবুতর, দুর্গম এলাকার থানাগুলোর খবর নিতে ও দিতে টু ওয়ে পিজিয়ন। আরেক দল আছে যাদের বলা হয় ভ্রাম্যমাণ কবুতর, এ দলের কবুতরদের সঙ্গেই রাখা হয় হেডকোয়ার্টারে খবর পৌঁছানোর জন্য। প্রশিক্ষকরা জানান, ৫ থেকে ৬ সপ্তাহ বয়স থেকেই এসব কবুতরকে শেখানো হয় বাড়ির গণ্ডি চেনার কৌশল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ানো হয় দূরত্ব। প্রতিদিন তিন কিলোমিটার হিসেবে নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের কাছে নেওয়া হয় ১০ দিন। পাখি একবার গতিপথ সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পেলেই, নিজ থেকে অন্তত ২৫ কিলোমিটার পথ ফিরতে পারে। কটকের পুলিশ সদস্য পরশুরাম নন্দ বলেন, আমরা তামার ক্যাপসুলে প্রথমে ছোট্ট চিরকুট ভরি। সেটি ট্রেনিং পাওয়া কবুতরের পায়ে বেঁধে ছেড়ে দিই। এভাবেই হয় প্রশিক্ষণ।
ঐতিহ্যবাহী এ কৌশলটি চালু রাখার পক্ষে গুণিজনরা। ভারতীয় ঐতিহাসিক ও গবেষক অনীল ধীর বলেন, আগামীতে যদি কেউ কবুতরের মাধ্যমে চিঠি আদান-প্রদান চালু করতে চায়; তাহলেও ৫০ বছর আগের মতো সার্ভিস পাবে। কারণ, অন্যান্য সব যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হলেও; কবুতর কখনো ব্যর্থ হবে না।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে ভারতের স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্র দিবসে কলাকৌশল দেখায় প্রশিক্ষণ পাওয়া এসব কবুতর। ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে উড়িয়ে দেওয়া হয় পাখিগুলোকে। ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা কটকে ফেরে। ইন্টারনেট অবলম্বনে
মোহনা জাহ্নবী/
.jpg)