এত দিন অভিজাত ইন্টেরিয়রে ঢাকা আলো ঝলমলে পরিবেশে বুফে খেয়ে এসেছেন। যদি বলি এবার ফুটপাতেই বসেছে বুফের আয়োজন। তাও আবার খোদ রাজধানী ঢাকাতেই! বিশ্বাস করতে হয়তো কষ্ট হবে। তবে বাস্তবতা কিন্তু অনেকটাই এরকম। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত মিরপুর এক নম্বরে অবস্থিত হজরত শাহ আলী মহিলা কলেজের গেটের ঠিক সামনে গেলেই দেখা মিলবে এমন বুফের।
দুপুর শেষ হয়ে বিকাল শুরু-অনেকটা এরকম সময়েই হজরত শাহ আলী মহিলা কলেজের সামনে ভিড় জমে ওঠে। শনিবার বিকালে গিয়ে দেখা যায় মূলত দুটো পুরোনো ভ্যানগাড়িকে কেন্দ্র করেই জমে উঠেছে এ ভিড়। ভ্যানগাড়ির ওপর সারি সারি করে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খাবার ভর্তি বাটি। এগুলোর কোনোটিতে গরুর মাংস, কোনোটিতে মুরগির রোস্ট, আবার অন্য একটিতে দেখা গেল খাসির রেজালা। বড় পাত্র থেকে খাবারগুলো এবার রাখা হলো ছোট ছোট বাটিতে। দেখে হয়তো মনে হবে কোনো বুফের আয়োজন। অবশ্য সামান্য কিছু পার্থক্য ছাড়া এ আয়োজন কোনো অংশেই বুফের চেয়ে কম নয়। এ জায়গায় মূলত ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব ও কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো থেকে বেঁচে যাওয়া খাবার আসে। খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, কম দামে লোভনীয় খাবার পাওয়া যায় বলে এখানে আসে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত ক্রেতারাও।
.jpg)
এখানে দোকান মূলত দুটি। এর মধ্যে একটির বর্তমান মালিক জীবন আহমেদ। বয়স খুব বেশি নয়, ২৫-২৬ হবে। মুখে সব সময় যেন হাসি লেগেই আছে। অবশ্য এটা ব্যবসায়িক পলিসিও হতে পারে। সে যাই হোক, হাসিমুখে কাস্টমারকে অভ্যর্থনা জানাতে কজন ব্যবসায়ীবা পারেন! তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম ভ্যানগাড়ির ওপর তার এই অভিনব দোকান সম্পর্কে। বললেন- বছর ত্রিশ আগে তার মা শুরু করেছিলেন এ ব্যবসা। শুরুতে অবশ্য এত জমজমাট ছিল না। ফেসবুক, ইউটিউব ও পত্র-পত্রিকায় তার দোকান সম্পর্কে প্রচার হওয়ায় এখন ব্যবসা ভালোই হচ্ছে। মা-বাবা এখনো আসেন, তবে মূল দায়িত্ব আমাকেই সামলাতে হয়।
জীবন আহমেদের পাশের ভ্যানে যিনি খাবার সাজিয়ে বসেছেন তার নাম ফরিদা বেগম। বয়স্ক মানুষ। কাস্টমারদের একা সামলাতে কষ্ট হয় বলে সঙ্গে রেখেছেন নাতি মোহাম্মদ রাহাতকে। তিনি বেচা-বিক্রিতে সাহায্য করে থাকেন দাদিকে। জানালেন, তার জন্মের আগে থেকে এই ব্যবসা করে তার পরিবার। কাস্টমারের ভিড় কখন সবচেয়ে বেশি থাকে, প্রশ্ন করেছিলাম ফরিদা বেগমের কাছে। বললেন- ‘সন্ধ্যার আগে আগে সাধারণত কাস্টমার বেশি আসে। আবার কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার পরও আসে। ঠিক নেই। তয় রাতের মইধ্যে মাল শেষ হইয়া যায়।’

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হচ্ছে। বাটি ভরা তেল-মসলাযুক্ত খাবারগুলোর ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে চতুর্দিকে। সেই সঙ্গে ক্রমশ বাড়ছে মানুষের ভিড়। মাথার ভেতর একটি প্রশ্ন এসে বারবার উঁকিঝুঁকি মারছে। নিজেকে নিজেই উত্তর দিচ্ছি কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারছি না। শেষমেশ জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম জীবনের কাছে। জানতে চাইলাম- যে খাবারগুলো থাকার কথা বড় বড় সব রেস্টুরেন্ট কিংবা বুফের আয়োজনে, সেগুলো ফুটপাতে এই ভ্যানগাড়ির ওপর কীভাবে এল? জীবন যে উত্তর দিল তার সারমর্ম হচ্ছে- ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব ও কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো থেকে বেঁচে যাওয়া খাবারই মূলত এখানে নিয়ে আসা হয়। মিরপুরের এই ফুটপাতে সেসব খাবার বিক্রি হয় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম দামে। তাই অনেকে এখানে খাবার কিনতে ছুটে আসেন।
মহিলা কলেজ গেটের সামনে বিকাল ৪টায় শুরু হয়ে বেচাকেনা। চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। শুধু বুধবারে বন্ধ থাকে খাবার বিক্রি।
যেসব খাবার পাওয়া যায়
বড় বড় অনুষ্ঠানে মেনুতে যেসব খাবার থাকে, এসব দোকানে বিক্রি হয় সে খাবারগুলোই। তবে সব দিনই যে একই ধরনের খাবার পাওয়া যাবে তা কিন্তু নয়। একেক দিন একেক ধরনের খাবার পাওয়া যায় এখানে। তবে গরুর মাংস ও মুরগির রোস্ট অনেকটাই কমন আইটেম। এখানে সাধারণত গরুর মাংস ও মুরগির রোস্টের পাশাপাশি খাসির মাংস, রূপচাঁদা ভাজা, জর্দা, পোলাও, বোরহানি, কাবাব ও কাচ্চি পাওয়া যায়।
এখানে গরুর মাংসের এক কেজি ওজনের বাটি বিক্রি হয় ৫০০ টাকায়। পলিথিনে ভাগ ভাগ করে রাখা বিরিয়ানির দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। মুরগির রোস্টে ভর্তি বাটি ৫০০ টাকা, দুই লিটারের বোতল ভর্তি বোরহানি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিয়ে বাড়িতে বরের জন্য বরাদ্দ আস্ত খাসিও অনেক সময় এসব ভ্যানগাড়িতে পাওয়া যায়। দামও হাতের নাগালে, মাত্র ৩ হাজার টাকা!

মাংসের বাটি হাতে নিয়ে ঘ্রাণ নিচ্ছেন সবুজ নামের একজন ক্রেতা। কিন্তু বিক্রেতা জীবন নাখোশ। তার এক কথা- ‘ফ্রেশ খাবার। ঘ্রাণ নেওয়া লাগবে না। আমরা কোনো বাসি খাবার বিক্রি করি না।’ কিন্তু ক্রেতাও নাছোড়বান্দা। পরিবারের জন্য মাংস কিনবেন। খাবারের মানে কোনো ধরনের ছাড় দিতে তিনি রাজি নন। অবশেষে ক্রেতা পাঁচ বাটি মাংসের অর্ডার দিলেন। ক্রেতা সবুজের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম- এত মাংস একসঙ্গে কিনছেন যে? বললেন- ভালো মাংস সব সময় পাওয়া যায় না। আজকে পেয়েছি তাই কিনে নিলাম। বাজারে এক কেজি গরুর মাংস কিনতে হলে ৮০০ টাকা লাগে, সঙ্গে ২০০ টাকার মসলা। আর এখানে ৫০০ টাকায় এক কেজি রান্না করা মাংস কিনতে পারছি। তাই মাঝে মধ্যে এখানে ঢুঁ মারি।
পল্লবী থেকে রাজ্জাক এসেছিলেন মাংস কিনতে। অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পর ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে প্রায় দুই কেজি সমপরিমাণ খাসির মাংস কিনলেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে নিজ থেকেই বললেন-‘ফেসবুকে ভিডিও দেখে এখানে এসেছি। খারাপ না, এত কমদামে মাংস কোথাও পাওয়া যায় না।’
কারা কেনেন এসব খাবার
ফুটপাতের এই দোকানগুলোর ক্রেতা মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ। আপাতদৃষ্টিতে এমনটাই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। জীবন আহমেদ জানালেন, গরিবের চেয়ে ভিআইপি লোকই এখানে বেশি আসে। গাড়ি নিয়ে এসে অনেকেই ভ্যানের খাবার কিনে নিয়ে যান। তবে নিম্নবর্গের মানুষও আমিষের চাহিদা মেটাতে হাজির হন দোকানগুলোয়। ফরিদা বেগমও বললেন একই কথা।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে
বিকালে যেসব খাবার বিক্রির জন্য ভ্যানে ওঠে, সেগুলো সাধারণত তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় সকাল থেকেই। সকালের দিকে প্রস্তুত করা খাবার যখন এই ফুটপাতে আসে, তখন ঠিক কতটা খাওয়ার উপযোগী থাকে, সে নিয়ে প্রশ্ন অনেকেরই।
বিয়েবাড়ির অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় সেটা তো চিরন্তন সত্য। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবারই আপত্তি। সেটি হলো, ভ্যানের ওপর খাবারগুলো কখনোই ঢেকে রাখা হয় না। দোকানিরা বলছেন, মূলত ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই এ কাজ।
কিন্তু যে শহরে সামান্য বাতাসেই ধূলির ঝড় ওঠে, সে শহরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে খোলা খাবার কতটুকু নিরাপদ? এ ছাড়া শাহ আলী মহিলা কলেজটির অবস্থান মাজারের সঙ্গে। মাজারের পরিবেশকেও খুব বেশি স্বাস্থ্যকর বলা চলে না। তবে বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, ঢেকে রাখলে গরমে খাবার নষ্ট হয়ে যাবে। তাই খাবার ডিসপ্লে করাই লাগবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ায় অসহায় হয়ে পড়েছে মানুষ। ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে শাকসবজি, মাছ-মাংসের দাম। লাগামহীন দামে অল্প আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চ-মধ্যবিত্তরাও দিশাহারা। পরিস্থিতি যখন এমন, তখন কম দামে আমিষের চাহিদা মেটাতে এর চেয়ে ভালো কোনো উপায়ও নেই স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে। স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বাদ দিলে বলা যায়, মিরপুরের এই ফুটপাতের বুফে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে রসদ জোগাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
মোহনা জাহ্নবী/
.jpg)