এমন অনেক মূল্যবান জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদের চারপাশে, যা আলাদা করে চোখেই পড়ে না। কিংবা আমাদের মন সেসব জিনিসের প্রতি অতটা কৌতূহলীও হয়ে ওঠে না। তেমনই একটি নিদর্শন আছে টিএসসিতে; যা বঙ্গদেশে বিলুপ্তপ্রায় গ্রিকদের স্মৃতি নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। রোজ টিএসসিতে কত মানুষের চলাচল, কিন্তু ওই স্থাপনাটি সম্পর্কে খুব কম মানুষই অবগত।
ভারতের কালিকট বন্দরে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা পা রাখার পর ইউরোপ থেকে একে একে হাজির হয়েছে ওলন্দাজ, ফরাসি আর ইংরেজরা। ব্যবসার প্রয়োজনে এসেছে নানান দেশের মানুষ। তবে ইংরেজদের দৌরাত্ম্যে কেউই তেমন সুবিধা করে উঠতে পারেনি। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর কাছে অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে ব্যবসার জন্য নিজের দেশ ছেড়ে আসা আর্মেনীয়-গ্রিকরা।
আরমানিটোলার আর্মেনীয় গির্জা বা পোগোজ স্কুলের কারণে আর্মেনীয়দের নাম কিছুটা উচ্চারিত হলেও তা বিলুপ্তপ্রায় বলা যায়। গ্রিকদের অবস্থাও তেমনই শোচনীয়।
গ্রিকরা প্রথমে বঙ্গদেশে এসে হুগলি নদীর পাড়ে নিজেদের আস্তানা গড়ে তোলে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কলকাতায় আস্তানা গেড়েছিল গ্রিকরা, মুরগিহাট্টার ভার্জিন মেরি অব দ্য রোজারিতে দুটি গ্রিক সমাধির নামফলকে এর প্রমাণ মেলে। গ্রিকদের আগমনের পরবর্তী ধারা শুরু হয়েছে বাংলায় ইংরেজদের শাসন শুরু হওয়ার পর। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের শুমারি অনুযায়ী বাংলায় প্রায় ১২০টি গ্রিক পরিবার থাকত, যাদের বেশির ভাগই ছিল কলকাতায়।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দলিল অনুযায়ী, এই গ্রিক ব্যবসায়ী সমাজের নেতা ছিলেন আলেকজান্দ্রোস আরজিরিস। তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতার প্রথম গ্রিক অর্থোডক্স গির্জার ইতিহাসও। গির্জার অভ্যন্তরে মার্বেল পাথরে এর প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের নাম লেখা রয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে ওয়ারেন হেস্টিংস, আরজিরিসসহ আরও বেশ কয়েকজন গ্রিক ও ইংরেজ ব্যবসায়ীর নাম।
১৯২০ সালে কলকাতায় থাকা গ্রিকরা সিদ্ধান্ত নেন পুরোনো গির্জা ও এর আশপাশে থাকা গোরস্থানের জন্য ব্যবহৃত জমি বিক্রি করে অন্যত্র সরে যাবেন। গোরস্থানটিকে নারকেলডাঙা ও ফুলবাগানের সঙ্গে লাগোয়া ক্রসরোডের কাছে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং নতুন গির্জার জন্য কালীঘাটে জমি কেনা হয়। কালীঘাটে নিও-ক্ল্যাসিকাল ডোরিক ঘরানার অসাধারণ একটি অর্থোডক্স গির্জা তৈরি করে তারা, সঙ্গে পাদ্রির জন্য একটি দোতলা বাড়িও তৈরি করা হয়। গির্জার অর্থসংস্থানের একটি বড় অংশ আসে তুলা ও সিল্ক ব্যবসায়ী র্যালি ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছ থেকে, যারা ছিলেন র্যালি’স কোম্পানির মালিক।
কলকাতার বাইরে সবচেয়ে বড় গ্রিক সমাজ গড়ে ওঠে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে। ১৭৭৭ সালে আরজিরিস মারা যাওয়ার পর ঢাকা ও বাকেরগঞ্জে থাকা সম্পত্তি ভাগ হয়ে যায় তার ছেলেদের মাঝে। ১৮২১ সালে ঢাকায় চক বাজারের উত্তর দিকে থাকা মুকিম কাটরা রোডের পাশে একটি অর্থোডক্স গির্জা নির্মাণ করেন গ্রিকরা, গির্জার নামকরণ করা হয় সেইন্ট থমাসের নামানুসারে। গির্জাটি ১৮২১ সালে তৈরি হলেও টিএসসির সমাধিফলকগুলোর সবগুলোই এর আগে তৈরি। ফলে ধারণা করা যায় যে, এর আগেও ছোট কোনো গির্জা ছিল অথবা এই অঞ্চলে আর্মেনীয় বা দক্ষিণ ভারতীয় গির্জা ছিল।
১৯৩৮ সালে ঢাকায় ৪০টি আর্মেনীয় ও ১২টি গ্রিক পরিবার বাস করত, যেখানে ১৮৩২ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট হেনরি ওয়াল্টারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গ্রিকদের ২১টি বাড়ি ছিল। ১৮৪০ এর দশক থেকেই গ্রিক ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কমতে থাকে। ১৮৫০ সালের মধ্যে গ্রিকদের সংখ্যা একেবারেই কমে যায়।
১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে গির্জাটি ধসে পড়ে এবং পরিত্যক্ত অবস্থাতেই থেকে যায়। এ থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন ঢাকায় গ্রিকরা একেবারেই ছিল না। ১৯১৩ সালে গ্রিকদের পরিত্যক্ত জমিতে ব্রিটিশ সরকার একটি মেডিকেল কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেখানে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজের (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ) নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। মেডিকেল কলেজটির স্থপতি ছিলেন ডক্সিয়াডেস নামক একজন গ্রিক, যিনি কর্তৃপক্ষের কাছে ভেঙে পড়া গির্জাটির স্তম্ভগুলো দিয়ে একটি গ্রিক স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার অনুরোধ করেন। ধারণা করা হয়, স্মৃতিস্তম্ভটি রমনার পুরোনো সমাধিক্ষেত্রে স্থানান্তর করা হয়।
১৯১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় স্মৃতিস্তম্ভটির একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘রমনা রোডের পাশে থাকা গ্রিক সমাধিক্ষেত্র পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় লোকজন পাথরের সমাধিফলকগুলো চুরি করে নিজেদের বাড়ি বানানোর কাজে ব্যবহার করছে’। প্রতিবেদনটি দেখে তৎকালীন ব্রিটিশ পাদ্রি ফাদার মিডলটন ম্যাকডোনাল্ড পূর্ব বাংলার চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে অনুরোধ করেন পরিত্যক্ত সমাধিক্ষেত্রটির ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে। অবশেষে গভর্নর লর্ড কারমাইকেল সমাধিফলকগুলো রক্ষা করার জন্য আরেকটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার নির্দেশ দেন। স্মৃতিস্তম্ভটির ভেতরে ১০টি সমাধিফলক স্থাপন করা হয়। র্যালি ভ্রাতৃদ্বয়ের অনুরোধে ভারতবর্ষের অর্থোডক্স গির্জার প্রধান আথানাসিওস অ্যালেক্সিও কলকাতা থেকে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করতে আসেন। ১৯২১ সালে স্মৃতিস্তম্ভের জায়গাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়, তবে স্থাপনাটিকে আর সরিয়ে নেওয়া হয়নি।
অনেক সমাধিফলক থাকলেও মাত্র ১০টি সমাধিফলক কেন স্মৃতিস্তম্ভটির ভেতরে স্থাপন করা হলো, তা নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। র্যালি ভাইদের ম্যানেজার এবং ভারতে গ্রিসের রাষ্ট্রদূত থিওডোরোস পৌলিসের মতে, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ যখন শুরু করা হয়, তখন পুরো জায়গাটি আবার ঢেলে সাজানো হয়। গ্রিকদের গোরস্থানটির ওপর মাটি ঢেলে ঘাসের লন বানানো হয়’। অর্থাৎ টিএসসির সবুজ মাঠটি আদতে গ্রিকদের সমাধিস্থল ছিল!
ধারণা করা হয়, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় স্মৃতিস্তম্ভটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দীর্ঘদিন অবহেলার মধ্যে পড়ে থাকা স্থাপনাটিকে অবশেষে ১৯৯৭ সালে নয়াদিল্লির দূতাবাসের মাধ্যমে গ্রিক সরকার সংস্কার করার উদ্যোগ নেয় এবং আজ অবধি হলুদাভ স্মৃতিস্তম্ভটি সেখানেই কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)