‘সাইরেন’ নামের একজোড়া রাক্ষসী, যারা বাস করে ইতালির দক্ষিণ-পশ্চিমের এক সমুদ্রসৈকতে। যখনই কোনো জাহাজ সেই সৈকতের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, সেই রাক্ষসী দুটো সুন্দরী নারীর রূপ ধরে মায়াভরা সুরে মায়া সংগীত গাইতে থাকে।
সেই সুরের মাধ্যমে তারা নাবিকদের আহ্বান জানায় সৈকতে এসে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য, লোভনীয় খাবার আর আমোদ-ফুর্তির নিমন্ত্রণ তো আছেই। সেই মায়াজালে সাড়া দিয়ে যেসব নাবিক জাহাজ সৈকতে ভেড়ায়, তাদের আর রক্ষা নেই। তারা সোজা চলে যায় রাক্ষসীর পেটে!
গল্পটা ট্রয়ের বিশ্বখ্যাত যুদ্ধের এবং তার পরবর্তী সময়ের। অনেকের মতো ট্রয়ের সেই যুদ্ধে গ্রিকদের পক্ষ থেকে অংশ নিয়েছিলেন ওদিদাস। জ্যোতিষী বলেছিলেন, যুদ্ধ থেকে ওদিদাস বেঁচে গেলেও তার ফিরে আসতে অনেক সময় লেগে যাবে। এ কথা শুনে ওদিদাস যুদ্ধে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু রাজার নির্দেশে শেষমেশ তাকে যেতেই হলো।
ট্রয়ের যুদ্ধে খুব ভালো বীরত্ব দেখালেন ওদিদাস। এবার ফেরার পালা। দেবী সার্সি তাকে সতর্ক করে দিলেন মায়া রাক্ষসীর সৈকতের ব্যাপারে। তাই ওদিদাসও জায়গাটি সম্পর্কে জাহাজের সবাইকে অবগত করলেন। আদেশ দিলেন, সবাই যেন নিজের কানের ফুটো জাহাজে থাকা মোম দিয়ে আটকিয়ে রাখে, যাতে ওই মায়া সংগীত কোনোভাবেই কারও কানে না পৌঁছায়। কিন্তু তিনি নিজে করলেন দুঃসাহসী কাজ! তিনি কান আটকালেন না। তীব্র কৌতূহলবশত শুনতে চাইলেন সেই মায়া সংগীত। তবে ঝুঁকি এড়াতে অন্যদের বললেন তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে এবং বাঁধা থাকা অবস্থায় তিনি যতই খুলে দিতে অনুরোধ করুক না কেন, কেউ যেন তার কথা না শোনে।
তার কথামতো তাকে জাহাজের সবচেয়ে বড় মাস্তুলের সঙ্গে বাঁধা হলো এবং অন্যরা মোম দিয়ে কান আটকে ফেলল। জাহাজ সেই সৈকত এলাকায় প্রবেশ করার পর যথারীতি শুরু হলো মায়া সংগীত। মায়া সংগীত শোনামাত্রই ওদিদাস ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। দড়ি ছিঁড়ে নেমে যেতে চাইলেন সৈকতে। নাবিকদের আদেশ দিতে লাগলেন তার বাঁধন খুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কানে মোম থাকায় কেউ সেই আদেশ শুনতে পেল না। রাক্ষসীরা ট্রয়ের অপরূপা সুন্দরী হেলেনের রূপ ধরে তাকে আবিষ্ট করতে চাইলেন। যদিও জাহাজের অন্যরা সেই রূপ দেখতে পায়নি। ওদিদাস ওই রূপ দেখে পাগল হয়ে গেলেন। তার বাঁধন ছেঁড়ার প্রচেষ্টায় শরীরের মাংস কেটে রক্ত পর্যন্ত বেরিয়ে গেল। এক সময় সেই রাক্ষসীর সৈকত তারা পেরিয়ে গেল। ওদিদাস জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন। সবাই তার সেবা-শুশ্রূষা করতে লাগলেন।
বলা হয়, ওদিদাসই একমাত্র মানুষ- যে মায়া রাক্ষসীদের কবলে পড়েও ওই সৈকত থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরতে পেরেছিলেন!
সেই মায়া রাক্ষসীর সৈকতটি এখন ‘সরেন্টো’ নামে পরিচিত। ‘সাইরেন’ রাক্ষসীদের নাম থেকেই ‘সরেন্টো’ নামকরণ করা হয়েছে। জায়গাটি বর্তমানে ইতালির জনপ্রিয় অবকাশ যাপনকেন্দ্র। এখন আর সেখানে কেউ মায়া সংগীত গায় না, তবে এক অমোঘ আকর্ষণে প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক ছুটে আসেন এই ‘সরেন্টো’তে।
তারেক
.jpg)
.jpg)
.jpg)