দুর্গের নাম শুনলেই আমাদের মনে হয় এমন কোনো স্থান, যে স্থানটি সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেখানে সৈন্যসামন্ত থাকে, শত্রুপক্ষের কাউকে ধরে এনে বন্দি করে রাখা হয়। কিন্তু আমাদের পৃথিবীতে আশ্চর্য সুন্দর এক রূপকথার দুর্গও আছে। অবাক হচ্ছেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক বাভারিয়ার সেই নিউসওয়ানস্টেন দুর্গের কথা।
অনেক বছর আগের কথা। বাভারিয়া রাজ্যে ছিল দুই রাজপুত্র। বড় রাজপুত্রের নাম ল্যুদভিগ। তার রাজ্য, শাসন, অর্থ এসবের কোনো মোহ ছিল না। তিনি মেতে থাকতেন শিল্প, সংগীতে। একটা আলাদা জগৎই তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৮৬৪ সালে বাধ্য হয়ে তাকে বাভারিয়ার (বর্তমান জার্মানি) রাজসিংহাসনে আরোহণ করতে হয়। তার আরেক নাম ছিল রাজহংস রাজ।
তখনকার জনপ্রিয় সুরকার রিচার্ড ভ্যাগনার ছিলেন ল্যুদভিগের নিকটজন। তার রচিত অপেরা দিয়ে তিনি মুগ্ধ করেছিলেন বাভারিয়া রাজ্য আর রাজপুত্রকে। তার রচিত অপেরাকে অমর করে রাখার জন্য রাজপুত্র সিদ্ধান্ত নিলেন একটি দুর্গ গড়ে তুলবেন; যেখানে মানুষ খুঁজে পাবে জীবনের মানে, আনন্দ-উচ্ছ্বাস। যেই ভাবা সেই কাজ। ১৮৬৯ থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত চলল দুর্গ নির্মাণের কাজ। সেই দুর্গটিই আজকের নিউসওয়ানস্টেন বা রূপকথার দুর্গ।
ব্যাপারটা এমন নয় যে, রাজপুত্র প্রজাদের কষ্টের অর্থ দিয়ে এসব করতেন। তিনি তার নীতিতে অটুট ছিলেন। তিনি কখনো তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা পূরণ করতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে হাত দেননি। সব সময় নিজের উপার্জনের টাকা দিয়েই ইচ্ছা পূরণ করেছেন। এই দুর্গটি নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি অনেক টাকা ঋণী হয়ে যান। তবুও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের একটি টাকাও তিনি ধরেননি। একপর্যায়ে তিনি দেউলিয়াও হয়ে পড়েন।
অনেক বছর ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরতম দুর্গের স্বীকৃতি এই দুর্গটির দখলে। এমনকি ওয়াল্ট ডিজনির স্লিপিং বিউটি কার্টুনে এই দুর্গের মডেলটিই হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে। ল্যুদভিগের পরিকল্পনা ছিল এই দুর্গে মোট ২০০টি কক্ষ হবে। কিন্তু মাত্র ১৫টি কক্ষ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। অথচ এই ১৫টি কক্ষ দেখেই বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ হতবাক হয়ে যায়; ২০০টি কক্ষ হলে না জানি কী হতো!
দুর্গটি দেখলে মনে হবে ডিজনির অ্যানিমেশন জগতে চলে এসেছি। সাদা দেয়ালের ওপরে সুউচ্চ অনেক কালো রঙের মিনার। বিশাল সিংহতোরণ দেখে চোখ আটকে যাবে যে কারও। প্রতিটি দেয়াল বহু বর্ণে রাঙানো। এমনকি মেঝে ও ছাদও খুব রঙিন। দুর্গটি থেকে বাভারিয়ার পর্বতশ্রেণি দেখা যায়, যা দুর্গের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক গুণ।
ল্যুদভিগের বিছানার ওপরের সিলিংটি এমনভাবে তৈরি, দেখে মনে হবে অসংখ্য তারাজ্বলা আকাশের নিচে শুয়ে আছেন তিনি। এই শিল্পমনা রাজাকে ষড়যন্ত্র করে ১৮৮৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তাকে পাগল আখ্যা দেওয়া হয়। মিউনিখের স্ট্রানবার্গ হ্রদের তীরে অবস্থিত দুর্গে তাকে পর্যবেক্ষণের জন্য আনা হয়। রহস্যজনকভাবে তার মাত্র কয়েক দিন পরই সেই হ্রদের অগভীর জলে তিনি তার চিকিৎসকসহ মৃত্যুবরণ করেন। আজ পর্যন্ত তার মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন হয়নি।
ল্যুদভিগ ছিলেন দক্ষ সাঁতারু। তার যে কোমরসমান জলে ডুবে মরার কথা নয়, এটা সবাই জানতেন। সরকারি নথিতে তার মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে লিপিবদ্ধ করা। কিন্তু ধারণা করা হয়, ৪০ বছর বয়সী সেই বেখেয়ালি রাজার মৃত্যুর পেছনে প্রভাবশালী কেউ দায়ী।
ক্ষমতা থেকে তাকে সরানোর কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, তার বেখেয়ালি কাজকর্মের জন্য রাজ্যের অর্থনীতি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। অথচ আজ বাভারিয়া অঞ্চলের অন্যতম উপার্জনের উৎস হচ্ছে ল্যুদভিগের বানানো বিভিন্ন স্থাপনা!
তারেক
.jpg)