নিতু দাঁড়িয়ে আছে শু র্যাকের সামনে। হাতে একজোড়া কালো পাম্প শু। সদ্য কিনে আনা প্যাকেটে ব্র্যান্ড নেম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শু জোড়া হাতে নিয়ে নিতুর চোখ চকচক করে উঠল। এই উজ্জ্বল, চকচকে চোখের দিকে তাকিয়ে যে কেউ তার মনের উপচে পড়া আনন্দের সন্ধান পাবে।
গত রাতে নিতুর স্বামী মিন্টু অফিস থেকে ফেরার পথে তাদের একমাত্র কন্যার জন্য শু জোড়া এনেছে। শু জোড়া হাতে নিয়ে নিতুর মনে হয় স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেল।
২০০৬ সাল। মাত্র প্রাইমারি পেরিয়ে মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে নিতু। গায়ে তখনো শহুরে গন্ধ আসেনি। সাধারণ, ছিমছাম নিতু বেশ ভালো ফলাফল করেই পাড়া গাঁ থেকে মফস্বলের একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে জায়গা করে নিল।
রঙিন ভুবন। নিতুর জায়গা প্রথম সারির বেঞ্চের কোনো এক কোণায়। মা বলে দিয়েছেন সব সময় সামনের বেঞ্চে বসতে। তবে প্রতিদিন জায়গা পাওয়া যায় না। শহরের মেয়েরা সেসব জায়গা নিজেদের বলে ধরে রাখে। যদিও তারা উপস্থিত থাকে না, তবু এক অলিখিত আইনে কেউ এ নিয়ম ভঙ্গ করে না। নিতুর মনে হয় সে তার ক্লাসে সবচেয়ে বোকা মেয়ে।
বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে! ছাপোষা এক প্রাইমারি স্কুল মাস্টারের মেয়ে নিতু। বাবার দুই চোখ ভরা স্বপ্ন নিতু আর মিতুকে নিয়ে। মিতু হলো নিতুর ছোট বোন।
মেয়েদের গায়ে আকাশি কামিজের ওপর ভাঁজ করা সাদা ওড়না কোমরবন্ধনীতে আবদ্ধ। সঙ্গে একটা ত্রিকোণা স্কার্ফ। প্যাগাসাস কেডস আর ছোট ছোট চুলে সাদা ফিতার বিনুনি। কেউবা ঝুটি বাঁধে চুলে। দেখতে যেন একঝাঁক ফুটফুটে পরী।
নিতু অবাক চোখে স্কুলের মেয়েদের দেখে। এক অদ্ভুত ভালো লাগায় মন ভরে ওঠে। সহপাঠীদের কথা বলার ভঙ্গি, কাঁধের ব্যাগ, নতুন স্টাইলের খাতা-পেন্সিল সবকিছুই নজর কাড়ে নিতুর।
একদিন গণিত ক্লাসের শেষে হঠাৎ নিতুর চোখ পড়ে আয়িশার জুতা জোড়ায়। নতুন চকচকে কালো রঙের পাম্প শু। এত সুন্দর মানিয়েছে আয়িশার পায়ে যে নিতু চোখ ফেরাতে পারেনি। মাঝে মাঝে মেয়েরা স্কুল ড্রেস ছাড়াই আসে। তখন সবার পরনে সুন্দর পোশাক দেখা যায়।
বাড়ি ফিরে তাই বায়না ধরল মায়ের কাছে। তারও অমন কালো পাম্প শু চাই। নিতুর আবদারগুলো বাবা পর্যন্ত পৌঁছানোর মাধ্যম হলো তার মা। মা অবশ্য কিছুই বললেন না।
এরপর আরও কতবার আয়িশার পায়ে সেই শু জোড়া দেখেছে নিতু। কিন্তু কখনো আর মাকে বলা হয়নি। নিতু জানে না মা আদৌ বাবাকে বলেছিলেন কি না।
অভাব না থাকলেও সংসার চলত খুব হিসাবে, ছোট্ট নিতু সেটা অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিল। বাবার শার্টের কলার দেখে। প্রতি ঈদে তাদের দুই বোন আর দাদির নতুন পোশাক আসলেও, বাবা-মায়েরটা ছিল পুরোনো। কাপড়ে বার্লি দিয়ে লন্ড্রিতে দিতেন মা যেন নতুনের মতো চকচকে হয়ে ওঠে। আজ এতগুলো বছর পরে পুরোনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছে যেন নিতুর মন। মিন্টুর ডাকে সম্বিত ফিরে পেল।
অজান্তেই চোখের কোণে পানি জমেছে। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে নিত্যদিনের ঘরকন্যায় মন দেয় নিতু। বেরোনোর আগেকে মিন্টুর এক কাপ চা চাই প্রতিদিনই। আজ খেয়ালের ভুলে দেরি হয়ে গেল! যেমন দেরি হয়ে গেছে একজোড়া কালো পাম্প শু নিজের করে পেতে!
আফিয়া সুলতানা আশা
মহিদেব, জুম্মাহাট
উলিপুর, কুড়িগ্রাম
তারেক
.jpg)