মিসরকে বলা হয় নীল নদের দেশ। আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে থেকে নীল নদকে ঘিরে গড়ে ওঠে সভ্যতা। সে যুগের রাজাদের বলা হতো ফারাও। খ্রিষ্টজন্মের ৩১০০ বছর আগে রাজা মেনেস হন প্রথম ফারাও। এরপর একাদিক্রমে ৩১টি বংশ শাসন করেছে প্রাচীন মিসরকে।
তুতেনখামেন (Tutankhamun) হলেন মিসরের সবচেয়ে আলোচিত ফারাওদের মধ্যে একজন। তিনি জন্মেছিলেন প্রায় ৩৩০০ বছর আগে, ১৩৪১ খ্রিষ্টপূর্বে। তুতেনখামেন ছিলেন মিসরীয় ফারাওদের ১৮তম বংশের একজন রাজা। ১৩৩৩ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে শাসনভার নেন তুতেনখামেন। তুতেনখামেনের বাবা ছিলেন আখেনাতেন (Akhenaten) আর মা ছিলেন রানি ‘কিয়া’- ফারাও আখেনাতেনের একজন পত্নী। আখেনাতেনের প্রধানপত্নী ছিলেন নেফারতিতি।
তুতেনখামেনের শাসনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত ছিল এবং তিনি ৯ বছর বয়সে ফারাও হয়ে মাত্র ১০ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাই তিনি কোনো বড় ধরনের সংস্কার বা যুদ্ধ করতে পারেননি।
তার বাবা আখেনাতেন একজন এক ঈশ্বরবাদী ধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন। তুতেনখামেন শুরুতে তার বাবার ধর্ম অনুসরণ করেছিলেন, কিন্তু পরে তিনি পুরোনো মিসরীয় দেবতাদের পুজার রীতি পুনরুদ্ধার করেছিলেন। এই ধর্মীয় পরিবর্তন তার রাজত্বকালের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল।

তার শাসনকালে সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। তার সমাধিতে পাওয়া অসংখ্য বস্তু এই কথা প্রমাণ করে। তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কৃত হয় তার মৃত্যুর প্রায় ৩০০০ বছর পরে। এটিই একমাত্র সমাধি যা ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। এই সমাধি থেকেই সেই সময়ের ইতিহাসের দরজা অনেকটা খুলে যায়। এই ইতিহাস উদ্ধারের বিস্তারিত জানতে হলে আরও কিছু তথ্য জানতে হবে। যেমন- বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ব্রিটেনের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিলেন লর্ড কার্নারভন। জার্মানিতে গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি গিয়েছিলেন মিসরে। মিসরের শুকনো আবহাওয়ায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকরা আরও কিছুদিন কায়রোতেই বিশ্রাম নিতে বলেন তাকে আর ঠিক তখনই তিনি জানতে পেরেছিলেন, প্রখ্যাত আমেরিকান প্রত্নতত্ত্ববিদ থিওডোর ডেভিসের নেতৃত্বে মিসরের ‘ভ্যালি অব কিংস’-এ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চলছে। লর্ড কার্নারভনের ইচ্ছা হয়েছিল তিনিও আবিষ্কার করবেন নতুন কোনো পুরাকীর্তি। ইতিহাসের পাতায় চিরতরে থেকে যাবে তার নাম। লর্ড কার্নারভনের আগ্রহের কথা জেনে মিসর সরকার তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল হাওয়ার্ড কার্টারের। সেই সময় হাওয়ার্ড কার্টারের কাছে দেবদূত হয়ে দেখা দিয়েছিলেন লর্ড কার্নারভন।
তিনি কার্টারকে বলেছিলেন, নতুন করে খনন শুরু করতে। অর্থ কোনো সমস্যা হবে না, অর্থের ব্যাপার তিনি দেখবেন। হাওয়ার্ড কার্টারের মনে ইতোমধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই কথা। এই এলাকাতেই আছে তুতেনখামেনের সমাধি। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ববিদ ডেভিস, তার সঙ্গী হাওয়ার্ড কার্টারের কথায় আমল দেননি। তিনি ভেবেছিলেন এই এলাকায় যা ছিল মোটামুটি সবই উদ্ধার হয়েছে আর নতুন কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই লর্ড কার্নারভন ও হাওয়ার্ড কার্টারকে ভ্যালি অব কিংসে খননের অনুমতি দিয়েছিলেন ডেভিস। ১৯১৪ সালে লর্ড কার্নারভন ও কার্টার খননের পারমিট পেলেও, সে বছরই আবার শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ফলে খননের কাজ থেমে থাকে বহুদিন। বিরতির পর ১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়েছিল তুতেনখামেনের সমাধি খোঁজার কাজ। এরপর কেটে গিয়েছিল অনেকগুলো বছর। লর্ড কার্নারভন একসময় হতাশ হয়ে কার্টারকে বলেছিলেন খননের কাজ বন্ধ করে দিতে। লর্ড কার্নারভনকে কার্টার বলেছিলেন আর একটা বছর অন্তত দেখা উচিত তাদের। ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর নতুন করে খননের কাজ শুরু করেছিলেন হাওয়ার্ড কার্টার। নভেম্বরের চার তারিখেই খুঁজে পেয়েছিলেন পাথরের টুকরোর তলায় চাপা পড়ে থাকা একটি সিঁড়ি। যা ক্রমশ নিচের দিকে নেমে গিয়েছিল। সিঁড়ি থেকে ভারী পাথরগুলো সরানোর পর জেগে উঠেছিল একটি বন্ধ দরজার কিছু অংশ। দরজাটির ওপর প্লাস্টারের আস্তরণ আর সেই প্লাস্টারের ওপর মারা আছে মিসরের রাজকীয় সিল। এরপর ফেব্রুয়ারি, ১৯২৩ সালে সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন কার্টার ও লর্ড কার্নারভন। কক্ষের ভেতরে আলো ফেলতেই তাদের চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। হতবাক হয়ে তারা দেখেছিলেন সমাধিকক্ষের দেওয়ালগুলো নিরেট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি। সমাধিকক্ষের ভেতরে কার্টার ও লর্ড কার্নারভন খুঁজে পেয়েছিলেন স্বর্ণ দিয়ে মোড়া তুতেনখামেনের প্রকাণ্ড সমাধি।
.jpg)
সমাধির ভেতরে থাকা তুতেনখামেনের স্বর্ণের কফিনটি বের করে আনতে সময় লেগেছিল আরও এক বছর। তবে তুতেনখামেনের মমি দেখার সৌভাগ্য হয়নি লর্ড কার্নারভনের। তুতেনখামেনের মমি করা দেহকে তিনটি কফিনের মধ্যে রাখা হয়েছিল, যার সবচেয়ে বাইরের কফিনটি পুরোটাই স্বর্ণের তৈরি। একটি স্বর্ণের রথও পাওয়া গিয়েছিল। ধারণা করা হতো এই রথ মৃত্যুর পর রাজাকে অন্য জগতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। মমিটির সঙ্গে আরও পাওয়া যায় হার, ব্রেসলেট, আংটি, খাবারের পাত্র, খেলনা, প্রসাধনী, ধনুক, তির ও ছুরি। তবে তুতেনখামেনের সঙ্গে পাওয়া সামগ্রীর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো তার স্বর্ণের মুখোশ। এই মুখোশটি বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি। তুতেনখামেনের কবর থেকে পাওয়া এই ধনসম্পদ প্রাচীন মিসরীয়দের অসাধারণ কারিগরি দক্ষতা এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রমাণ।
তুতেনখামেনের অভিশাপ
সব প্রাচীন সমাধির মতো এই সমাধির শান্তি বিনষ্টকারীদের জন্যও বেশ কিছু অভিশাপ বার্তা পাওয়া যায়। যার মধ্যে একটি ছিল অনেকটা এরকম- ‘যারা এই পবিত্র সমাধিতে প্রবেশ করবে, মৃত্যু খুব দ্রুত তাদের গ্রাস করবে।’ অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হলো, এই অভিশাপেই সমাধি আবিষ্কারের সাত সপ্তাহ পরে ১৯২৩ সালের ৫ এপ্রিল, কায়রোতেই বিষাক্ত মশার কামড়ে মারা যান লর্ড কার্নারভন। লর্ড কার্নারভনের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর, তার ইংল্যান্ডের বাড়িতে থাকা কুকুর সুজি, অদৃশ্য কাউকে তাড়া করতে গিয়ে মারা যান। এরপর একের পর এক ঘটতে শুরু করেছিল অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা। তুতেনখামেনের সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন আমেরিকার ধনকুবের জর্জ গোল্ড। তিনিও অজানা জ্বরে ভুগে মারা গিয়েছিলেন কয়েক মাসের মধ্যে।
.jpg)
তুতেনখামেনের সমাধির ভেতরের ছবি তুলেছিলেন মিসরের যুবরাজ আলি কামেল ফাহমি। ১৯২৩ সালেই তার স্ত্রী তাকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। স্যার আর্চিবোল্ড ডগলাস বে, যিনি তুতেনখামেনের মমির এক্স-রে করেছিলেন, অস্বাভাবিকভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল ১৯২৪ সালে। তুতেনখামেনের সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ধনী ব্যবসায়ী ওলফ জোয়েল। কয়েক মাসের মধ্যে তাকে হত্যা করেছিল অজ্ঞাত আততায়ীরা। ১৯২৪ সালে সমাধিটি দেখার কয়েকদিনের মধ্যেই কায়রো শহরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সুদানের গভর্নর জেনারেল স্যার লি স্ট্যাককে। হাওয়ার্ড কার্টারের খননকারী দলের সদস্য ছিলেন আর্থার মেস। ১৯২৮ সালে তিনি মারা গিয়েছিলেন আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায়।
১৯২৯ সালে হাওয়ার্ড কার্টারের সেক্রেটারি রিচার্ড বেথেলকে মৃত অবস্থায় বিছানায় পাওয়া গিয়েছিল। পরের বছরেই কার্টারের সেক্রেটারি রিচার্ড বেথেলের বাবা ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।
যাই হোক, পরে তুতেনখামেনের মমিটির এক্স-রে, সিটি স্ক্যান ও ডিএনএ টেস্ট করেছেন গবেষকরা। দেখা গেছে, তুতেনখামেন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। আরও কিছু অসুস্থতা ছিল তার। যেমন হাতের তালু ফেটে গিয়েছিল। মৃত্যুর আগে তার পা-ও ভেঙে যায়। তা ছাড়া তার বাবা-মা সম্ভবত ভাই-বোন ছিলেন, ফলে তিনি জিনগত সমস্যাতেও ভুগতে পারেন। তবে ঠিক কী কারণে তিনি মারা যান, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়নি। তাকে হত্যা করা হয়েছিল, এমন কোনো চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তুতেনখামেনের মৃত্যুর সঠিক কারণ হয়তো কোনো একদিন জানা যাবে। সেদিন আগ্রহ মিটবে রহস্য পিপাসুদের।
.jpg)
.jpg)