আজও খুঁজে ফিরি বাচ্চা দুটোকে। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। তার পরও মন থেকে বাচ্চা দুটোকে এখনো ভুলে যেতে পারিনি। নিয়তির অমোঘ বিধানে স্মৃতির মণিকোঠায় অবুঝ সেই বাচ্চা দুটি এখনো এসে মনটাকে বিগলিত করে দেয়।
নব্বই দশকের ঘটনা এটি। কাঠপট্টি লঞ্চ ঘাট টার্মিনাল এলাকায় দুটো অবুঝ বাচ্চা ফেলে তার মা উধাও হয়ে গেছে। বড় মেয়েটির বয়স সাত বছর আর ছোটটি মায়ের দুধ খাওয়া এখনো ছাড়েনি। অবুঝ এ বাচ্চা দুটোকে তার মা এখানে ফেলে কার হাত ধরে যেন যৌবনের তাড়নায় চলে গেছে। তবে বাচ্চাদের সঙ্গে মা যখন ছিল তখন কেউ তার বাবাকে দেখেনি। হঠাৎ করে ঘাট এলাকার কুলির সর্দার থেকে শুরু করে সবারই মধ্যে শোরগোল পড়ে যায়। বাচ্চাদের মাকে পাওয়া যাচ্ছে না। দুটো বাচ্চার মধ্যে বড়টি ছোটটিকে কোনো রকম কোলে-কাঁধে রাখতে পারে। কিন্তু অবুঝ দুধের শিশুটি যখন ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে তা নিবারণ করতে পারছে না বড় বাচ্চাটি। তাতেই চারদিকে হইচই-শোরগোল দেখা যাচ্ছে। সবারই মুখে একটাই কথা তোর মা কই?
ফজরের আজানের পর আলো ফোটার পর তার মাকে আর বাচ্চা দুটো খুঁজে পায়নি। মা আসবে সে অপেক্ষাতেই ছিল বাচ্চা দুটো। সকাল গড়ায় তার পর দুপুর গড়িয়ে যায়, তার পর সন্ধ্যা নামে কিন্তু অবুঝ বাচ্চাদের মা আর আসে না। মেয়েটি ছোট ভাইয়ের কান্নায় বিগলিত হয়ে পড়ে। এ ঘাট থেকে লঞ্চযোগে বড় বড় বালতি করে পুরান ঢাকায় গরুর দুধ যায়। তারা বাচ্চাদের জন্য দুধ রাখে। কেউ পাতিল কিনে সে দুধ জাল করে দেয়। কেউ দুধ খাওয়ার বাটি চামচ কিনে দেয়। সবাই এগিয়ে আসে। কিন্তু মায়ের অভাববোধ পূরণ হয় না। বড় বাচ্চাটি ছোটটিকে কোলে রাখে আর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না অবুঝ শিশুটি। তার পরের দিন দেখা গেল কে যেন একটি মশারি কিনে দিয়েছে। সকালে আমরা লঞ্চযোগে যারা ঢাকা যাই কর্মস্থলে তখন প্রতিবারই বাচ্চা দুটোকে এক পলক দেখে যাই সবাই।
না, কোনো খাবারের অভাব হচ্ছে না। জামা-কাপড়ও মানুষ কিনে দিয়েছে যথেষ্ট পরিমাণ। ঘাটের কুলি সর্দাররা পর্যন্ত বাচ্চা দুটোর দেখভাল করতে লাগল। ধীরে ধীরে বাচ্চা দুটো পৃথিবীর কঠিনতম বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হতে লাগল। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায় কিন্তু তাদের মা আর ফিরে আসে না। সে কোনো এক পুরুষের ছোঁয়া পেতে অবুঝ এ মানবসন্তান দুটোকে অথই জলে ফেলে গেছে। হয়তো মা ফেলে যেতে চায়নি। তার সঙ্গীর অসম্মতির কারণেই তাদের হয়তো ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছে। তবে শিশু দুটোর কপাল ভালো যে, তাদের মা হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়নি। যা বর্তমান দৃশ্যেকল্পে দেখা যাচ্ছে। এভাবে কত নারীই পরপুরুষের সঙ্গে লালসায় জড়িয়ে পড়ে নিজের সাত রাজার ধন গলা টিপে হত্যা করছে। কাউকে জীবন্ত মাটি চাপা দিচ্ছে।
হায়রে মানুষের যৌবনের তাড়না! একসময় হয়তো মানুষের অশান্ত নদীর স্রোতধারা থেমে যাবে। তাদের বাচ্চাদের কথা তখন মনে পড়বে কিন্তু শত চেষ্টা করলেও কী আর মিলবে এমন পরম ধন। তাই ভাগ্য অনেক ভালোই বলা চলে এ বাচ্চা দুটোর। কয়েক মাস পর সে বাচ্চা দুটোকে কে যেন পালতে নিয়ে গেছে। তাই যতবারই ওই লঞ্চঘাট দিয়ে যাতায়াত করছি তখনই বাচ্চা দুটো এসে মণিকোঠায় হাজির হচ্ছে। আজও বাচ্চা দুটোকে খুঁজে ফিরি। জোছনার আড়ালের মাঝে মাঝে মেঘ যেভাবে এসে ভিড় করে সেভাবেই বাচ্চা দুটো জোছনার আলোয় মেঘের ছায়া হয়ে ফিরে আসে। আমি খুঁজে-ফিরি এখনো। ভালো থাকো ফুলের বাগানের প্রজাপতিরা। ভালো থাকো নীল পরী আর জল পরী।
অলিউর রহমান ফিরোজ
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক
.jpg)
.jpg)
.jpg)