অনামিকা সামাজিক মাধ্যমে তার বাল্যসখী কাজলরেখা আর জামিলের হাসি-খুশি ছবিটা দেখেই মনের অজান্তে মন্তব্য করে বসল, ‘এই দুজন আমার খুব আপনজন’। আপনজনই যে একদিন দূরে সরিয়ে দেয়, অনাকাক্ষিত জলের ঢেউয়ের মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায় কোনো অজানার দেশে, তা এক মুহূর্তও ভাবার অবকাশ পায়নি অনামিকা।
ছবির এ জামিল লোকটাকে সে বড় ভালোবাসে, একই কলেজে পড়াশোনা করেছে। কেউ মুখ ফুটে কিছু বলেনি। ছাইচাপা বহ্নির মতো উত্তাপ ছিল, কিন্তু বাইরে আলোর রেখা ফুটে ওঠেনি। কথায় বলে- ‘মিলনে মলিন প্রেম, বিরহে উজ্জ্বল’। ভালোবাসার মানুষ যখন মিলে যায় তখন তাকে খারাপ না লাগলেও ভালো লাগাটা কেমন যেন আটপৌঢ়ে শাড়ির মতো হয়ে যায়। রংচটা রোদ্দুরে তাকে শুকাতে কোনো কষ্ট হয় না।
মনে পড়ে, হলের ডাইনিং রুমের জানালার কার্নিশে খড়িমাটি দিয়ে লেখা, বিবর্ণ অস্পষ্ট কয়েকটা কথা- ‘মনের মানুষ মিললেও মানুষের মন মেলে না এ সংসারে’। সামাজিক মাধ্যমে সে মন্তব্য করেছে- ‘এই দুজন আমার খুব আপনজন’। কিন্তু এই আপন মানুষই একদিন তাকে দূরে সরিয়ে দেবে না তো? অজানা শঙ্কায় তার বুক কেঁপে ওঠে।
কী পেয়েছে, কী হারিয়েছে, তা কিন্তু অনামিকা নিজেও জানে না। জামিলকে সে কখনো তার ভালোবাসার কথা বলেনি, আর যাকে পায়নি তাকে হারানোর প্রশ্নই ওঠে না। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে লজ্জা পেল অনামিকা। কিন্তু বুকের ওপর পাষাণের মতো চেপে আছে যে পাথর, কোনোমতেই তা সরানো যাচ্ছে না।
একদিন জামিল অনামিকাকে একটি হিন্দি শায়ের শুনিয়েছিল-
‘নিদ আয়েতো, খোয়াব আয়ে
খোয়াব আয়েতো, তুম আয়ে
পর তুমহেরি ইয়াদমে
ন নিদ আয়ে, ন খোয়াব আয়ে।’
অনামিকা হিন্দির হ-ও বোঝে না, শায়েরের অর্থ জানার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করেছিল। জামিল নিরীহ স্বভারের, কথাবার্তা যেন রেশনের দোকানের মতো মাপাজোকা। অনামিকার নোট খাতাটা নিয়ে খচ খচ করে লিখে দিল- ‘যখন ঘুম আসে তখন স্বপ্ন আসে, যখন স্বপ্ন আসে তখন তুমি আস, আর যখন তুমি আস তখন না আসে ঘুম, না আসে স্বপ্ন’। একবার পড়ে অনামিকার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে মনে হলো জামিলের মুখে একমুঠো ধুলা ছুড়ে দেয়। জামিল কিছুতেই তাকে বোঝাতে পারল না যে, এটা তার মনের কথা নয়, শায়েরের অর্থ। অবশেষে বরফ গলে, নদীও সাগরে মেশে। অনামিকার রাগ হলেও মনে মনে এই ভেবে খুশি হয় যে, তার জন্য জামিলের ঘুম নষ্ট হয়।
আজ কাজলরেখাকে জামিলের পাশে দেখে তার সে স্বপ্ন কাচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কাজলরেখা খুবই ভালো মেয়ে, দেখতে শুনতেও বেশ, শুধু লেখাপড়া তার তেমন একটা ভালো লাগে না। সে তার বন্ধু-বান্ধবী ও পরিচিতজনের মধ্যে মাঝে মাঝে খুঁজে দেখে যারা পড়াশোনায় ভালো ছিল এখন কে কেমন আছে।
কাজলরেখার ধারণা, ভালো ছাত্রছাত্রীরা কখনই ভালো সংসারি হতে পারে না, কারণ পড়ালেখায় তারা এতটা মনোযোগী যে, জীবন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা খুবই কম। সব কাজেই তারা শতভাগ পারফেকশন খোঁজে, চুলচেরা বিশ্লেষণ চায়, যা দৈনন্দিন জীবনে প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া জীবন তো একটাই, এতটা পারফেক্ট হওয়ার কোনো হেতু সে খুঁজে পায় না। টান টান বিছানায় শুয়ে কোনো মজা নেই, এই বুঝি চাদর এলোমেলো হয়ে যায়, তার চাই সবুজ ঘাসের গালিচা, যেখানে ইচ্ছেমতো লুটিপুটি খাওয়া যায়। সঙ্গত কারণে লেখাপড়ায় তার তেমন আগ্রহ নেই। সাদামাটা একটি দ্বিতীয় শ্রেণি হলেই যথেষ্ট। লেখাপড়া শেষ। বিয়ের কথাবার্তা, দেখাশোনা চলছে, মোটামুটি পছন্দ হলেই পিঁড়িতে বসে পড়বে, হইহুল্লোড় করেই আপাতত কেটে যাচ্ছে।
হঠাৎ টেলিফোনে পিক করে একটা শব্দ হলো, একটা নতুন মেসেজ। কাজলরেখার নামটা দেখে অনামিকার মনে হলো জানালা দিয়ে ফোন সেটটা পুকুরে ছুড়ে ফেলে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেসেজটা ওপেন করল। তাতে বাংলায় লেখা- ‘প্রিয় অনামিকা, আমার এবং আম্মুর ভিসা হয়ে গেছে, আমরা বাবার কাছে চলে যাচ্ছি।’ নিচে বন্ধনী দিয়ে লেখা-
[তুই যে আমার চোখের বালি
সরস্বতী দুর্গা কালি
সব দেবতার অর্ঘ্য,
যার ছিলি তুই তারই থাকিস
বেনিমাধবকে আগলে রাখিস
গড়িস ধুলায় স্বর্গ।]
অনামিকার চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল শিশিরে সিক্ত হলুদ বোঁটায় সাদা শিউলির ওপর গড়িয়ে পড়ল।
সোলমাইদ, ভাটারা, ঢাকা
তারেক
.jpg)
.jpg)
.jpg)