ডিজিটাল এ যুগে কোনো ঘটনাই শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর মুহূর্তেই জানছে অন্য প্রান্তের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে পুরো বিশ্বই এখন পরিণত হয়েছে একটি ‘ওপেন থিয়েটার’-এ।
এ খোলা মঞ্চেই সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে মরুভূমির এক প্রাণী। যার নাম ‘সান্ডা’।
সান্ডা কী
সান্ডা টিকটিকি জাতীয় একটি সরীসৃপ, যার বৈজ্ঞানিক নাম Uromastyx। এটি অ্যাগামিডি গোত্রের অন্তর্গত। এর এক ডজনের বেশি প্রজাতি রয়েছে। তাই সান্ডা কোনো নির্দিষ্ট প্রাণীর নাম নয়। মরু অঞ্চলে বাস করা এ গোত্রের বেশ কয়েকটি প্রজাতিকে বোঝানো হয়। আরবি ভাষায় একে বলা হয় ‘দব’। মরুভূমিতে বসবাসকারী এ গোত্রের লিজার্ডদেরই সাধারণভাবে সান্ডা বলা হয়।
সান্ডা দেখতে অনেকটা গুইসাপের মতো হলেও এর শরীর তুলনামূলক ছোট এবং মোটা। এ প্রাণীকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন- ‘মাস্টিগুর’, ‘সান্ডা টিকটিকি’ কিংবা ‘কাঁটা লেজযুক্ত টিকটিকি’।
এদের মাথা চওড়া, শরীর মোটা এবং চার পা-বিশিষ্ট। বড়দের গড় দৈর্ঘ্য ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার (১০ থেকে ১২ ইঞ্চি)। লেজ মোটা এবং কাঁটায় ভরা। এই কাঁটা শিকারিকে ভয় দেখাতে বা আঘাত করতে ব্যবহৃত হয়। আত্মরক্ষার জন্য এরা গর্তে ঢুকে লেজ বের করে তা হিংস্রভাবে দোলাতে থাকে। দিনের বেশির ভাগ সময় এরা রোদ পোহায় এবং সন্ধ্যা হলেই গর্তে ঢুকে পড়ে। বিপদ টের পেলে পাথরের খাঁজে আশ্রয় নেয়।
সান্ডার খাদ্যাভাস
সান্ডা সাধারণত উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক পরিবেশে বাস করে। সৌদি আরবের মরুভূমি এদের অন্যতম প্রাকৃতিক আবাসস্থল। এটি তৃণভোজী, অর্থাৎ গাছপালা, ফুল ও বীজ খেয়ে জীবনধারণ করে। বন্য পরিবেশে প্রাপ্তবয়স্ক সান্ডার মধ্যে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পোকামাকড় খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে যখন গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া অত্যন্ত গরম হয় এবং গাছপালাভিত্তিক খাদ্য কম সহজলভ্য থাকে। এ সময়টায় পোকামাকড়ই তাদের একমাত্র বা প্রধান খাদ্য উৎস হয়ে দাঁড়ায়। ডিম থেকে সদ্য ফোটা বাচ্চা সান্ডারা প্রথমে মায়ের মল খায়। এ কাজটি করে সঠিক অন্ত্র জীববৈচিত্র্য (gut flora) গঠনের জন্য, যা উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য হজমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ সরীসৃপের শরীর গিরগিটির মতো। তাপমাত্রা ও ঋতুভেদে এরা রং বদলাতে পারে। ঠাণ্ডায় এদের গায়ের রং গাঢ় হয়, যাতে সূর্যের তাপ বেশি শোষণ করতে পারে। গরমে শরীরের রং হালকা হয়। এভাবে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করে এরা বেঁচে থাকে।
.jpg)
প্রজনন
সব প্রজাতির সান্ডাই ডিম পাড়ে। একটি স্ত্রী সান্ডা, বয়স ও প্রজাতিভেদে ৫ থেকে ৪০টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে। সাধারণত মিলনের প্রায় ৩০ দিন পর সে ডিম পাড়ে এবং ডিমগুলো ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে (প্রজাতি ও পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে) ফুটে বাচ্চা বের হয়।
নবজাতক সান্ডার ওজন সাধারণত ৪ থেকে ৬ গ্রাম (০.১৪-০.২১ আউন্স) এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ সেমি (২ ইঞ্চি), যা থুঁতি থেকে লেজের আগা পর্যন্ত পরিমাপ করা হয়। ডিম ফোটার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে তারা দ্রুত ওজন বৃদ্ধি করে এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধির ধাপে প্রবেশ করে। বন্য স্ত্রী সান্ডা পুরুষদের তুলনায় ছোট এবং কম রঙিন হয়।
আয়ুকাল
সান্ডা সাধারণত ২৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এ প্রাণীর আয়ু নির্ভর করে খাদ্যের সহজলভ্যতা ও পরিবেশের ওপর।
সান্ডা কি খাওয়া যায়?
সব সৌদিবাসী কিন্তু সান্ডা খায় না। মূলত আরবের বেদুইন বা স্থানীয় গোষ্ঠীর মানুষ এ সান্ডা ধরে এবং কেউ কেউ এগুলো খায়। কেউ কেউ সান্ডার বিরিয়ানিও রান্না করে। একসময় এটি আরবীয় সুস্বাদু খাবার হিসেবে বিবেচিত ছিল। হাদিসে আছে- যখন বেদুইনরা মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সামনে একটি দব (সান্ডার কাছাকাছি একটি প্রাণী) রান্না করে এনেছিল, তখন তিনি এটি খাননি, কিন্তু অন্যদের খেতেও নিষেধ করেননি। এ কারণে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাণীটি খেতে নিরুৎসাহিত করা হয়। অর্থাৎ এটি মাকরুহ ধরা হয়। অধিকাংশ ইসলামি স্কলারের মতে, এটি খাওয়া হালাল।
ইহুদি ধর্মে সান্ডাকে ঐতিহ্যগতভাবে বাইবেলের তজাভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আটটি প্রাণীর মধ্যে এটি একটি, যা খাওয়া নিষিদ্ধ। বলা হয়, এটি ধর্মীয় অপবিত্রতা প্রদান করে। তাওরাত শরিফে বলা হয়েছে- ‘পৃথিবীতে ঝাঁকে ঝাঁকে চলা প্রাণীদের মধ্যে তোমাদের জন্য এ জিনিসগুলো অশুচি হবে: উইজল, ইঁদুর, সব ধরনের সান্ডা টিকটিকি; গেকো, স্থল কুমির, টিকটিকি, স্কিঙ্ক এবং গিরগিটি’ (লেবীয় পুস্তক ১১:২৯-৩০)।
সান্ডার তেল কি আসলেই উপকারি?
সান্ডার তেল একটি প্রাকৃতিক তেলের মিশ্রণ, যা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এ তেলকে অনেকে যৌনশক্তি বৃদ্ধির উপাদান হিসেবে প্রচার করে থাকেন। যদিও বিজ্ঞানসম্মতভাবে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত নয়, তবুও বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে কিছু আঞ্চলিক হাটে এ তেল বিক্রি হতে দেখা যায়।
তারেক
.jpg)