ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি স্তম্ভ হলো হজ। হজ পালনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর কাছে যাওয়া যায়। প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ইচ্ছা থাকে জীবনে অন্তত একবার হলেও হজ পালন করার। তাই প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লি বিভিন্ন দেশ থেকে হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা নগরীতে গমন করেন। তবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে হজ পালন করতে ব্যর্থ হন।
যদি সুড়ঙ্গ দিয়ে হজ পালন করতে যাওয়া যায় বা হজ পালনের সওয়াব লাভ করা যায় তাহলে কেমন হবে? হ্যাঁ আজ এমনই এক গুহা বা সুড়ঙ্গ সম্পর্কে জানাব।
সাফারওয়াদি গুহা একটি রহস্যময় ও ঐতিহাসিক স্থান, যা ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উভয় দিক থেকে বিশাল গুরুত্ব বহন করে। গুহাটির নাম ‘সাফারওয়াদি’, যা আরবি ও ফারসি শব্দ মিশ্রিত এক রূপ। এর অর্থ হলো ‘ভ্রমণকারীদের আশ্রয়স্থল’।
সাফারওয়াদি গুহা যা ‘গুহা সাফারওয়াদি’ নামে পরিচিত। এটি ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভার তাসিকমালায়া অঞ্চলের পামিজাহান এলাকায় অবস্থিত। এটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটি স্থানীয় মুসলমানদের কাছে গভীর আধ্যাত্মিক, পবিত্র ও ঐতিহাসিক স্থান।
স্থানীয় বিজ্ঞদের মত অনুসারে, এই গুহায় এমন একটি গোপন সুড়ঙ্গ রয়েছে যা সরাসরি সৌদি আরবের মক্কা শহরের সঙ্গে যুক্ত। এটি কোনো কাল্পনিক বিষয় নয় বরং এই বিশ্বাসের পেছনে রয়েছে অলৌকিক মোজেজার ইতিহাস। ১৭০০ শতকের বিখ্যাত ইসলামিক সাধক শেখ আব্দুল মুহই, যিনি পশ্চিম জাভায় ইসলাম প্রচার করেছিলেন তিনি এবং তার সঙ্গীদের ইন্দোনেশিয়া থেকে মক্কায় হজ পালনের অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে এই সুড়ঙ্গ।
.jpg)
সাফারওয়াদি গুহার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮৪ মিটার এবং প্রস্থ আনুমানিকভাবে ১.৫ - ৩ মিটার। তবে কিছু স্থানে আরও সংকীর্ণ বা প্রশস্ত হতে পারে। এতে দুটি প্রবেশপথ রয়েছে একটি ‘পামিজাহান’ গ্রামে এবং অপরটি ‘পানিয়ালাহান’ গ্রামে। গুহার ভেতর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে। এখানে ঝুলন্ত ‘স্ট্যালাকটাইট’ এবং নিচে ওঠা ‘স্ট্যালাগমাইট’ দেখা যায়। যেগুলো কিছুটা স্বর্ণাভাব রঙের হয়ে থাকে।
গুহার ভেতরে বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক ঝরনাও রয়েছে যেগুলোকে ‘সি- জমজম’ এবং ‘সি- কুহুরিপান’ নামে ডাকা হয়। মক্কার জমজম কূপের সঙ্গে মিল রেখে এই নামকরণ করা হয়েছে। জমজম কূপের পানির মতো অনেকেই এই পানিকে অনেক শুদ্ধি এবং আরোগ্যের উৎসব বলে মনে করেন।
এই গুহার ভেতরের অংশ অন্ধকার হলেও প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের সংযোগ থাকায় দমবন্ধ ভাব হয় না। তীর্থযাত্রীরা এখানে প্রবেশ করায় তাদের মনে এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি আসে। গুহার ভেতরে বিভিন্ন রকমের খাঁজকাটা আকার আকৃতির পাথর রয়েছে। গুহার ভেতরে একটি বিশেষ প্রাকৃতিক গঠন রয়েছে যাকে স্থানীয়রা ‘কপিয়া হাজি’ নামে ডাকে। এই গুহার ছাদের গায়ে ডোম বা গম্বুজ আকৃতির চিহ্ন রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, যাদের মাথা এই গম্বুজে নিখুঁতভাবে আটকাবে, তারা প্রকৃত হজ করার সৌভাগ্য অর্জন করবে।
প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণির লোকেরা এখানে আসেন এক আধ্যাত্মিক তৃপ্তি ও আত্মার শান্তি লাভের আশায়। অনেক নৃতত্ত্ববিদ এই গুহাকে ‘প্রতীকী হজ বা গরিবের হজ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই সাফারওয়াদি গুহাকে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান বলে মনে করেন না বরং আত্মন্বেষণের একটি কেন্দ্র হিসেবেও দেখেন। প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও মানুষ যখন মানসিক প্রশান্তি খুঁজে ফেরে তখন এই ধরনের আধ্যাত্মিক স্থানগুলো তাদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। এখানে মানুষ তাদের ব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে কিছুটা সময়ের জন্য মুক্তি পেয়ে নিজের আত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে।
তবে এই গুহা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ মনে করেন, ইসলামিক বিশ্বাসের সঙ্গে গুহার এই ধরনের অলৌকিক ধারণা সংহতিপূর্ণ নয়। তারা মুসলমানদের সতর্ক করে দিয়েছেন যাতে তারা কুসংস্কারে জড়িয়ে না পড়ে এবং ইসলামি শরিয়তসম্মত পথ ও ইবাদতের গুরুত্ব বোঝে। গুহার মূল প্রবেশপথটি শেখ আব্দুল মুহই-এর সমাধি থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে অবস্থিত। এটি স্থানীয় প্রশাসন রক্ষণাবেক্ষণ করে।
তারেক
.jpg)