নব্বই দশকের কথা। কিশোর বয়স। সবে মাত্র দাড়ি-গোঁফ উঠতে শুরু করেছে। অনেক দূরের কোনো সেলুনে গিয়ে শেভ করছি। মুখে লজ্জা লজ্জা একটা ভাব বিরাজ করছে। চারদিকে যা দেখি সবকিছুই সুন্দর লাগে। উঠতি বয়সে যা হয় আরকি। তবে ছোটবেলা থেকেই বই-ম্যাগাজিন পড়ার খুব ভালো নেশা হয়ে যায়। পত্রিকার স্টল থেকে তখন বিভিন্ন বই-ম্যাগাজিন কিনে কিনে পড়ছি।
তখনকার সময়ে মোবাইল ফোন ছিল না। যোগাযোগের মাধ্যম বলতে চিঠিপত্র। হঠাৎ করেই একটি ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতেই চোখে পড়ল পত্রমিতালি। সেখানে অনেক ছেলেমেয়ের নাম ও ঠিকানা রয়েছে। তাদের কাছে চিঠি আদান-প্রদান করে মনের ভাব প্রকাশ করা হয়। আমিও একটি মেয়ের নাম দেখে তাকে চিঠি লেখার জন্য প্যাড কিনে আনি। মেয়েটির নাম রোকসানা। বাড়ি নেত্রকোনার রূপপুর। মেয়েটিকে চিঠি লেখার পর মেয়েটিও আমাকে চিঠি লিখে। বিভিন্ন ম্যাগাজিন মেয়েটি আমাকে পাঠায়। আমিও ম্যাগাজিন পাঠাই। এমন অবস্থা বছর ধরে চলতে থাকল। যতই চিঠি পাই ততই মেয়েটিকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ি।
এক সময় মনে হলো এ মেয়েকে না দেখলে আমার জীবনটা বৃথা। কিন্তু কীভাবে সেখানে যাওয়া যায় তা আমার জানা নেই। অনেক খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলাম ঢাকার মহাখালী থেকে নেত্রকোনার বাস যায়। তাই একদিন বাসায় কাউকে না বলে রূপপুরের রোকসানাকে খোঁজার জন্য ঢাকা চলে গেলাম। মহাখালী থেকে সকাল ১০টায় গাড়িতে উঠেছি আর নেত্রকোনায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। আমার পাশের সিটে ছিলেন একজন বয়স্ক মানুষ। তার সঙ্গে আমার খুব ভালো গল্প জমে উঠল।
বাস চলছে। চলার পথে দুজনের পরিচয় জেনে নিলাম। তা ছাড়া তার কাছ থেকে রূপপুর যাওয়ার ঠিকানাও জেনে নিলাম। তিনি নামবেন ঠাকুরাকোনা ব্রিজের কাছে। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে আসছে। আমিও দিশেহারা হয়ে গেলাম। গন্তব্যে পৌঁছাতে এখনো আমার অনেকটা পথ বাকি। রাত হলে সেখানে কীভাবে পৌঁছাব। আর তখনই আমার পাশের বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, আপনি এখন রূপপুর বাজারে যেতে পারবেন না। আমার সঙ্গে আসুন। সকাল হলে সেখানে যাবেন।
তার কথায় অনেক মায়া এবং আন্তরিকতা ছিল। তার এ কথায় আমার অজানা ভয় কিছুটা দূরীভূত হলো। আমি আমতা আমতা করে রাজি হয়ে গেলাম। আমি যার বাড়িতে এখন ঠাকুরাকোনায় নেমে যাচ্ছি তিনি হলেন একজন স্কুলশিক্ষক। তার নাম অতুল মাস্টার। বাড়ি সাহতা। বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেকটা রাত হয়ে গেল। অচেনা-অজানা একটা জায়গায় গিয়েছি, কেমন যেন একটু ভয় ভয় করছে। কিন্তু অতুল মাস্টারের আপ্যায়নে আমি অত্যন্ত মুগ্ধ। রাতের আহার করে তার বারান্দায় ঘুমালাম।
অতুল মাস্টারের একটা ছেলে আর একটা মেয়ে রয়েছে। মেয়েটি বড়। নাম ইতি মনি। এসএসসি পাস করেছে। আর ছোট ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
পরের দিন সকাল বেলা খাবার খেয়ে মাস্টার সাহেবের বাড়িতেই আমার কাপড়ের ব্যাগটা রেখে রূপপুর বাজারে রওনা হলাম। প্রথমে রূপপুর বাজারে গিয়ে যে ঠিকানায় আমার কাছে চিঠি আসে সেটা পোস্ট মাস্টারকে দেখালাম। তিনি আমাকে সেখানে যাওয়ার লোকেশন বাতলে দিলেন। সেখান থেকে একটা রিকশা করে মাটির রাস্তা ধরে দুই পাশে ধানখেতের মধ্য দিয়ে রওনা দিলাম আমার পত্রমিতালি বন্ধুর বাড়ির দিকে। ভাবছি সেখানে গিয়ে রোকসানাকে চমকে দেব। বাড়ির সামনে নেমে রিকশা বিদায় করে বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। ছনের ঘর। মাঠে বেশ বড় একটা উঠান বাড়ির চারদিকে আম, নারিকেল ও সুপারির গাছ দেখতে পেলাম। বাড়ির পিঁড়া মাটির লেপে সাদা চিক চিক করছে।
ভেতরে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। সে বাড়ির লোকজন আমার পরিচয় পেয়ে তাজ্জব বনে গেল। এটা তাদের চিন্তার মধ্যেই ছিল না। আমি মুন্সীগঞ্জ থেকে নেত্রকোনার রূপপুর যেতে পারব। তবে আমার মাথার ওপরই আকাশ ভেঙে পড়ল সেই মেয়েটিকে দেখে। যার সঙ্গে আমি পত্রমিতালি করেছি সেই রোকসানার বয়স ছয়। তার নামেই তার মা সব চিঠি পাঠাত। নাম গোপন করে শিশুর মেয়ের নামেই চিঠি আদান-প্রদান করত রোকসানার মা। ব্যাপারটা এমন হবে তা আমি কখনো কল্পনা করিনি।
রোকসানার মা আমাকে তাদের গাছের আম কেটে খাওয়াল। তারপর দুপুরে খেতে বলল। রোকসানাকে দেখেই আমার আক্কেল গুড়ুম। অগত্যা মন খারাপ করে আবার অতুল মাস্টারের বাড়িতে চলে এলাম। অতুল মাস্টারের সেখানে আরও দুদিন বেড়ালাম। কী আতিথেয়তা যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এলাকাটা ঘুরে ঘুরে দেখালেন অতুল মাস্টারের মেয়ে ইতি। সেখানে সপ্তাহে হাট বসে। হাট বাড়ি থেকে অনেক দূরে, সেখানেও আমাকে নিয়ে গেলেন অতুল মাস্টার। আশপাশও ঘুরে দেখালেন এ দুদিন। সেখানে একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো, তার নাম নূপুর। তার বাবা একজন গ্রাম্য চিকিৎসক। তার চেম্বার ঠাকুরাকোনা ব্রিজের কাছে।
অসম্ভব আনন্দ এবং বেদনা নিয়ে অবশেষে ফিরে এলাম বাড়িতে। এদিকে বাড়িতে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে গেছে। এ কদিন আমাকে না পেয়ে সব জায়গায় খোঁজ করা হয়েছে। এরপর আর কখনো অতুল মাস্টারের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। কিন্তু মন থেকে অতুল মাস্টার তার ছেলেমেয়ে ইতিমনি এবং পাশের বাসার ডাক্তারের মেয়ে নূপুরকে এখনো ভুলতে পারিনি।
নেত্রকোনার কোনো লোকের সঙ্গে যদি আমার দেখা হয় এখনো তাদের না খাইয়ে ছাড়ি না। সেখানকার মানুষের জন্য একটা মায়া তৈরি হয়েছে।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক
.jpg)
.jpg)
.jpg)