সেদিন ভূমি অফিসে গিয়েছিলাম জীবনের নকশা বের করতে। বের করতে তো পারলামই না, উল্টো জলি ম্যাডাম আমার কথা শুনে এমন অবাক হলো, যেন বোবার মুখে কথা ফুটেছে। আমাকে দেখার পিয়াস যেন ওনার মিটছেই না, স্থিরচোখে আমার মুখের দিকে শুধু তাকিয়ে রইল। হয়তো পাগল মনে করেছে।
তিনি জীবনের নকশা দিতে পারলেন না এবং দেখাতেও পারলেন না। ফিরে এসে, পরে ভাবতে ভাবতে আমিই পেয়ে গেলাম আমার জীবনের নকশা। স্থির করলাম, আমার জীবননকশার ওপর থাকবে একটি গাছ। গ্রামবাংলার হিজল গাছ। আর তার নিচে শুয়ে থাকব আমি। এটাই হবে আমার জীবননকশা, জীবনের ভূমি।
জীবননকশার ওপরে হিজল গাছটি লাগানোর জন্য যেই গর্ত খুঁড়তে যাব, আমারই মতো দেখতে, আমারই অন্তরাত্মা হবে হয়তো। ও পেছন থেকে বলল-
– এই দুপুরবেলা কেউ গাছ লাগায়?
আমি গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তেই বললাম,
– দুপুরেই লাগায়।
– পাগলের যেই কথা।
– পাগল-পাগল কইরো না তো।
– পাগল রে তো পাগলই কইতে হয়। শোন এইসব পাগলামি বাদ দিয়ে সংসারমুখী হ।
– সংসার কইরা কোন হালায় ভালো রইছে? সংসার করার পর সব হালায় কয়, আহারে যদি আগের জীবনটা পাইতাম!
– তবুও সংসার করতে হয়, বিশ্রামের জন্য একটা ঘর তৈরি করতে হয়।
– আমি ঘরই তৈরি করতাছি।
– কী ঘর তৈরি করতাছত?
– এই যে।
– এই যে কী?
গাছটি লাগিয়ে পানি ছিটিয়ে দিতে দিতে আমি বললাম,
– সবাই তো বাড়ি করে, গাড়ি করে, সুন্দর একটা নারীও আনে। আমি না হয় ভিন্ন কিছু করলাম।
– আরে কী কইতাছত তুই?
ওর কথায় কান না দিয়ে বললাম,
– দেখো কী সুন্দর জায়গা এটা। শীতের সময় চারপাশে সরিষা, হেমন্তকালে চারপাশে পাকা ধান, তার মধ্যে একটা হিজল গাছ। আর তার নিচে একটা কবর। দেখো কল্পনা করে দেখো, কী সুন্দর! এর চেয়ে সুন্দর বাড়ি আছে কও?
– কী কছ তুই?
– আমি ঠিকই কই।
– এই জায়গা তর নামে আছে তো?
– না, এহনো আমার নামে করি নাই।
হাহা হিহি, ও হাসল।
– হাসো কেন?
– এই পৃথিবীতে এক ইঞ্চি জায়গা কেউ ছাড়ে না, তর নামে যদি না দেয়?
– বাকি যেইগুলা আমার নামে আছে, সবগুলা তাদের নামে লেইখা দিমু, তাইলেই তো দিব। বিনিময়ে আমি শুধু এই জায়গাটুকু চাই।
আমি বাঁশের খুঁটি গেড়ে, গাছটি বেড়া দিতে লাগলাম। ও আমার সামনাসামনি একটু দূরে ঘাসের ওপরে বসল। চারদিকে চোখ বুলিয়ে কী জানি দেখল, হয়তো প্রকৃতির সৌন্দর্য। রোদের তাপে ওর কপালে পিঁপড়ের সারির মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যাচ্ছে। তীব্র রোদের কারণে পুরোপুরি চোখ মেলে তাকাতেও পারছে না। তাই ভ্রু কুঁচকে ও বলল,
– খারাপ হবে না।
– কী?
– তর জীবননকশা, জীবনের ভূমি।
– আমি জানি তো খারাপ হইব না। দেইখো একদিন ওই কাঁচা রাস্তার ধারে সাইকেল রেখে, প্রিয়তমা-প্রিয়তমরা বসে বসে আমার জীবননকশা দেখব। ডুবন্ত সূর্য দেখব। আর বাদাম খাইব। অনেক কবি-সাহিত্যিক কবিতা-গল্পও লেখার চেষ্টা করব আমার জীবনী এবং কবর নিয়া।
– সব রেখে কবর গড়ার শখ হলো কেন?
– আমি অনেক কবরস্থান ঘুইরা দেখছি, জঙ্গলে ঢাইক্কা রইছে। বন্যপ্রাণী মল ত্যাগ কইরা থুইছে কবরের ওপরে। তারা দুনিয়ায় থাকতে খুব নামি-দামি ছিল, অথচ তাদের কবরে বন্যপ্রাণীর মল। তারা কি ভাগ্যবান বলো? ‘সে জীবনে চরম ব্যর্থ, যে সুন্দর একটা কবর পায় না।’
– তুই যে এইহানে কবরস্থ হবি গ্যারান্টি কী?
– কোনো গ্যারান্টি নাই।
– তাইলে এই পাগলামি করতাছত কেন?
– হুনো, দয়াময় মানুষের অন্তর দেখে। সুতরাং আমি দিন-দুনিয়া ত্যাগ করে, দয়াময়কে ভালোবেসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, এটাই আমার কাছে অনেক বড়। আমি মরার পর মানুষ আমাকে এইহানে কবরস্থ না করলে, আমি ঠকমু না, বরং ওরাই ওগো ঠকাইবো।
অনেকক্ষণ হয় আমরা দুজনের কেউই কোনো কথা বলছি না, দুজনেই চুপ। আমি বেড়া দেওয়া শেষ করে বললাম, দেইখা যাও কেমন হইল। ও এসে দেখল, আমার পিঠে হাত দিয়ে কিছু বলতে চেয়েও না বলে চলে যেতে লাগল। ও রাস্তায় উঠেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমিও চলে যেতে লাগলাম। কিছুদূর এসে আবার পেছন ঘুরে দাঁড়ালাম।
চৈত্রের ভীষণ রোদ, খাঁ খাঁ করছে চারদিক। রাস্তার এপাশে-ওপাশে কোনো কৃষক, কিংবা পথচারী নেই। আমি কল্পনা করতে লাগলাম জায়গায় দাঁড়িয়েই। গাছটি বড় হয়ে গেছে, তার নিচে আমার কবরটি। ওই তো কবরটি। কল্পনা করলাম হেমন্তকালে পাকা ধানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি, আমার কবর নিয়ে। দাঁড়িয়ে আছে সরিষার মধ্যেও, আমার কবর নিয়ে হিজল গাছটি। পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তাটিও মিলছে গিয়ে ওই গ্রামে, কী অসাধারণ দৃশ্য। সূর্যটিও ডুবতে শুরু করেছে, সাইকেল চালিয়ে ডাকপিয়নটিও হচ্ছে বাড়িমুখী। প্রিয়তমা প্রিয়তমরা রাস্তার পাশে বসে বাদাম খাচ্ছে আর ডুবন্ত সূর্য দেখছে। ওই তো আমার জীবননকশা, জীবনের ভূমি। আমার মৃত্যুর পর কেমন হবে, তা এখানে দাঁড়িয়েই কল্পনা করে দেখে নিলাম। ‘সবাই বাড়ি করে, গাড়ি করে। আমি না হয় সুন্দর একটা কবর গড়ার স্বপ্নই দেখলাম।’
বিলাসপুর, জাজিরা
শরীয়তপুর
তারেক
.jpg)
.jpg)
.jpg)