মহাসাগরের বিশাল জলরাশিতে রয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৫০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদ। এর মধ্যে পাইপ ফিশ অন্যতম (Pipe Fish)। পাইপ ফিশ দেখতে ছোট মুখবিশিষ্ট সোজা দেহের সামুদ্রিক ঘোড়ার মতো। আবার একে দেখতে অনেকটা সাপের মতোও লাগে।
পাইপ ফিশ হলো দাঁতহীন, খুব সরু, লম্বা দেহের মাছ, যা হাড়ের বর্ম দিয়ে আবৃত। তাদের লম্বা নলাকার থুতনি এবং ছোট মুখ, একটি একক পৃষ্ঠীয় পাখনা এবং সাধারণত একটি ছোট লেজের পাখনা থাকে। পাইপ ফিশের বেশির ভাগ প্রজাতি সাধারণত ৩৫-৪০ সেমি (১৪-১৫.৫ ইঞ্চি) লম্বা হয়ে থাকে।
পাইপ ফিশ ছোট জলজ প্রাণীর ওপর আক্রমণ করে এবং দ্রুত মুখে পুরে নেয়। এ মাছ খাবার চুষে খেতে পছন্দ করে।
ভেলন সারিয়া নামে এক ধরনের ঘাস আছে সমুদ্রের জলরাশিতে। সেই ঘাসেই এদের বাসস্থান। বিশেষ করে ইলগ্রাস, প্রবাল প্রাচীরেও এদের দেখা মেলে। ভেলন সারিয়া ঘাসের আড়ালে পাইপ ফিশ লুকিয়ে থাকায় অন্যান্য জলজ ও মাছখেকো প্রাণীরা এদের খুব একটা দেখতে পায় না।
বেশির ভাগ পাইপ ফিশের জীবনযাপন সমুদ্র কেন্দ্রিক। তবে কয়েকটি পাইপ ফিশ মিঠা পানির প্রজাতি। এদের বসবাসের স্থান সাধারণত ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের উপকূলে এগুলো প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। কিছু প্রজাতির পাইপ ফিশের লেজ প্রিহেনসিল থাকে। বেশির ভাগ পাইপ ফিশের পুচ্ছ পাখনার কিছু রূপ থাকে, যা চলাচলের জন্য ব্যবহার করে থাকে। যদিও পাইপ ফিশ সামুদ্রিক প্রাণী তবুও এরা খুব ভালো একটা সাঁতার জানে না।
পাইপ ফিশের প্রজনন প্রক্রিয়াটি খুব অদ্ভুত এবং বিরল। আমরা জানি গর্ভধারণ করে স্ত্রী প্রজাতির প্রাণীগুলো। কিন্তু গর্ভধারণের ক্ষেত্রে পাইপ ফিশ ও সি-হর্স ফিশ পুরোই উল্টো। পাইপ ফিশ ও সি-হর্স ফিশের পুরুষরাই গর্ভধারণ করে এবং প্রসবের বেদনা সহ্য করেই বাচ্চা প্রসব করে।
মিলনের সময় স্ত্রী পাইপ ফিশটি তার শুঁড় দিয়ে পুরুষ পাইপ ফিশের শাবক থলিতে ডিম প্রবেশ করিয়ে দেয়। এ সময় পুরুষ পাইপ ফিশটি এস (S) আকৃতি ধারণ করে এবং ডিমকে ফার্টিলাইজ করতে থাকে। মিলনের একপর্যায়ে পুরুষ পাইপ ফিশটি সেই উর্বর ডিমে তার স্পার্ম নিক্ষেপ করে। অতঃপর পুরুষ পাইপ ফিশটি কয়েক সপ্তাহ নিজের গর্ভে সন্তানকে ধারণ করে এবং বাচ্চা পাইপ ফিশ জন্ম দেয়। স্ত্রী পাইপ ফিশ পুরুষের জনন থলিতে ডিম পাড়ে। এটি থাকে তাদের মাথার কাছে। থলিতে ডিমগুলো নিষিক্ত হয় এবং দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ডিমে তা দেয় পুরুষ পাইপ ফিশ। এরপরই বাচ্চা ফুটে বের হয়। পুরুষ পাইপ ফিশ তাদের জনন থলিতে ৫ থেকে ৪০টি ছানা ধারণ করতে পারে।
পুরুষ পাইপ ফিশ তার সঙ্গী যে স্ত্রী পাইপ ফিশের থেকে ডিম এনেছে, তাকে যদি পরবর্তী সময়ে আর পছন্দ না হয় তাহলে ছানাগুলোর খুব একটা যত্ন নেয় না পুরুষটি। অন্যদিকে বড়, আকর্ষণীয় স্ত্রী পাইপ ফিশের ডিম ও বাচ্চার জন্য পুরুষ পাইপ ফিশটি বেশি পুষ্টি সরবরাহ করে ও যত্ন নেয়।
বাচ্চারা জন্মের পর থেকেই স্বাধীনভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে। এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য খাওয়া শুরু করে। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর থেকে বাচ্চা পাইপ ফিশরা তাদের বাবা-মায়ের থেকে আলাদা হয়ে যায়। স্বাধীন হয়ে চলাফেরা করে এবং খাদ্য খোঁজে। তবে এই পাইপ ফিশরা তাদের একেক বাচ্চার জন্য একেক ধরনের যত্নআত্তি করে থাকে। ছানা যদি সুস্থ-সবল হয় তাহলে সেটির প্রতি তেমন একটা নজর দেয় না। তবে যদি বাচ্চা দুর্বল হয় তাহলে তাকে চোখে চোখে রেখে যত্ন করে বড় করে বাবা পাইপ ফিশ।
পাইপ ফিশের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে জোড়া বন্ধন ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। যদিও কিছু একগামী, অন্যরা তা নয়। অনেক প্রজাতি বহু-পত্নীকতা প্রদর্শন করে। এ এমন একটি প্রজনন ব্যবস্থা যেখানে একজন স্ত্রী দুই বা ততোধিক পুরুষের সঙ্গে মিলন করে।
সাঁতার কাটার ক্ষমতা কম থাকার কারণে পাইপ ফিশ প্রায়শই অগভীর পানিতে পাওয়া যায়। নৌকা চলাচলের কারণে উপকূলীয় পলি সরে যায়। ফলে পাইপ ফিশের আবাসস্থলে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ঘাস এবং ইলগ্রাসের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। পাইপ ফিশের স্বল্পতা ইঙ্গিত দেয় যে তারা আবাসস্থল পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম নয়।
ঐতিহ্যবাহী চীনা ওষুধ তৈরিতে পাইপ ফিশের উচ্চ চাহিদা রয়েছে। পাইপ ফিশের ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাওয়ার জন্য এটিও অন্যতম একটি কারণ।
তারেক
.jpg)
.jpg)
.jpg)