লোকচক্ষুর আড়ালে চলাচল করতে আমার ভীষণ পছন্দ। তাই, প্রতিদিন বিকেলে বাজারে আসি এককাপ রং চা খেতে বাড়ির পেছন দিয়ে, ফিরেও যাই এই পথে।
কেবলই চা শেষ করলাম। পাঁচ টাকার একটি নোট দোকানিকে ধরিয়ে দিয়ে, মাছ বাজারের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে যেই বাজারের মসজিদ পার হলাম তখন দেখি চারপাশটা অন্ধকার! ভাবলাম এখানে একটু অন্ধকার থাকাটাই স্বাভাবিক, যেহেতু অসংখ্য মেহগনি গাছ এখানে। কিন্তু না, মেহগনির পাতার ফাঁক দিয়ে জোছনার আলো পড়ছে, এটা কীভাবে সম্ভব! একটু আগেই তো দেখলাম গোধূলির আলো বাজারের মসজিদের ওপর দিয়ে, তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব! দাঁড়িয়ে ভাবছি! ভাবনা শেষ করে যেই পা বাড়াবো সামনে…
দাঁড়াও, ওপরে তাকাও। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মতো একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আমি চমকে গিয়ে ওপরে তাকালাম। আইডি কার্ডের মতো একটি কার্ড ধরে আছে শূন্যে একটি হাত, হাতটি মেয়ে মানুষের। নখে লাল টকটকে আলতা দেওয়া। কার্ডে লেখা ১৯৯৭ সাল। কণ্ঠটি বলে উঠল, তুমি যাকে ভালোবাসো, সে তোমার থেকে তিন বছরের বড়। বুঝছো? যাও।
–তাতে কী হয়েছে? রুহের কোনো বয়স নেই। আমি একটু উঁচু স্বরেই বললাম। ভয় পেয়ে কিংবা ক্ষোভ থেকেই বললাম কি না, তা বুঝলাম না! এটা বলার পর কণ্ঠস্বরটা আর শুনতে পেলাম না। নাহ, আর কোনো কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি না। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। এমন অদ্ভুত ঘটনা বহু ঘটে আমার সঙ্গে, বিষয়টা স্বাভাবিক মনে করে হাঁটা ধরলাম।
২
মেহগনির বাগান পার করে, খেতের আইল ধরে হাঁটছি। সবকিছু কেমন জানি ঘোরের মতো মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে আমি ঘুমিয়ে আছি আর স্বপ্ন দেখছি।
জোছনার আলোতে চারপাশটা কেমন যেন সবুজ-সবুজ, নীল-নীল রং ধরে আছে। হালকা হালকা কুয়াশাও আছে। একটু দূরে কেউ ধানের রোয়া রোপণ করছে মনে হচ্ছে, হ্যাঁ তাই। আমি তার কাছেই যেতে লাগলাম। ও স্যার, মানে আমাদের এখানকার ব্লু কাকা। তিনি দিন-রাত খেত-খামারে কাজ করেন, এলাকার লোকজন কেন জানি তাকে স্যার বলে। তার পাশের খেতে ধানের রোয়াই রোপণ করছে শেদ ভাই, তারা দুজন গ্রামের মধ্যে একই স্বভাবের। তাদের দেখে আমার একটু ভালোই লাগল, আমি তাদের উদ্দেশ করে বললাম,
সংসার সংসার কইরা ভবে করলি না বন্দিগী,
ওরে জীবন গোনায় গোনায় গেল।
এবার তো হলো, এবার বাড়ি যাও। ও কাকা, ও শেদ ভাই। কিন্তু তারা কিছুই বলছে না। আমি আবার বললাম, ও কাকা, ও শেদ ভাই। একী আমার ডাক ধোঁয়ার মতো উড়ে তাদের শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি দেখতে পাচ্ছি! যেভাবে বেরিয়ে যায় মানুষের শরীর থেকে আত্মা। আমি ভয় না পেয়ে আবার ডাকলাম, ও কাকা, ও শেদ ভাই। কী ব্যাপার, এরা মানুষ নাকি অন্যকিছু? আমি ভয় পেলাম না, তবুও কেন জানি দৌড় দিলাম।
৩
সেই দৌড়ের পরে, আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম বাবার কবরের পাশে। যেন আকাশ থেকে ধপাস করে পড়লাম মাটিতে! বাবার কবরের এখানে মৃত্তিকাপ্রাণী কেঁচো, মাটি উঠিয়ে মাটিগুলো ঝুরাঝুরা করে রেখেছে। চারপাশটা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম, কারণ এখানে দিন। একটু আগেই তো দেখলাম রাত। তাহলে আমি এতক্ষণ কোথায় ছিলাম? ভয় শুরু হলো এটা ভাবতেই। বাবার কবরের ওপর দিয়ে লাফ মেরে যেতে চাইলাম, পারলাম না। লাফ দিয়ে বাবার কবরের ওপরেই পড়লাম, অথচ এইটুকু জায়গা আমার লাফ দিয়ে পার হয়ে যাওয়ার কথা। লাফ দিয়ে পড়ায়, বাবার কবরে আমার বাঁ পা-টি ঢুকে গেছে। কোনোমতে উঠে এলাম বাড়িতে ঢোকার রাস্তায়। দেখি মা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে হাঁস ডেকে যাচ্ছে, আয় চইচই আয়।
৪
মা এখনো হাঁস ডেকে যাচ্ছে। অপরিষ্কার সাদা থ্রিপিস পরে, খালি পায়ে কুর্শি দাঁড়িয়ে আছে আমাদের রাস্তায়। মুখটা মলিন। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম,
–আপনি এখানে?
–এই তো ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম।
–কিন্তু আপনার এ অবস্থা কেন? পায়ে তো দেখি জুতাও নেই।
–আপনার হাতে-পায়েও তো মাটি।
আমি একটু লজ্জা পেলাম। তার পর বললাম, চলুন গলাকাটা রাস্তায় গিয়ে বসি।
এই বলে যেই হাঁটা দিলাম, খেয়াল করলাম পায়ের নিচে পিচঢালা। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। সামনে-পেছনে, ডানে-বায়ে তাকিয়ে দেখি আমরা দুজন গলাকাটা রোডেই দাঁড়িয়ে আছি। অথচ আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাতেই ছিলাম আমরা, আর আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটি মাটির।
জনমানবশূন্য গলাকাটা রোডটি, এই মুহূর্তে একটি আদম সন্তানও দেখতে পাচ্ছি না আমাদের ছাড়া। রাস্তার দুপাশে ঢোলকলমির ঝোপ ও ছিটকি গাছ। ছিটকি গাছের ওপর মাথা উঁচু করে আছে কাঁচা রঙের হলুদ শূন্যলতা।
কুর্শির দিকে তাকালাম আমি। কুর্শি আমার চোখে চোখ রেখে বলল, সুন্দর উত্তর দিয়েছেন, ‘রুহের বয়স হয় না। আমি ওর কথা শুনে, কাঁদতে গিয়েও হেসে দিলাম। হচ্ছেটা কী এসব? ছিলাম তো বাড়ির রাস্তায়। এখানে কী করে এলাম? আর ওই ঘটনা কুর্শি জানল কী করে? আমি কি জীবিত? না মৃত? এটা আমার কাছে অজানাই রয়ে গেল। মেয়েদের বয়স নাকি জিজ্ঞেস করতে নেই, তাই জিজ্ঞেসও করছি না এ লজ্জায়। সত্যিই কি কুর্শি আমার থেকে তিন বছরের বড়? আলিফ-লাম-মিম-এর অর্থ না পাওয়ার মতো, ১৯৯৭ সালের ব্যাখ্যা আমি আজও পেলাম না।
জাজিরা, বিলাশপুর
শরীয়তপুর
.jpg)
.jpg)
.jpg)