আপনি হয়তো বৃক্ষ আচ্ছাদিত কোনো সবুজ গ্রামের কথা শুনেছেন। কিংবা মরুভূমির বুকে অবস্থিত সবুজহীন কোনো রুক্ষ গ্রামের কথাও ভেসে এসেছে আপনার কানে। কিন্তু কখনো কি শুনেছেন পানিতে ভাসমান গ্রামের কথা। যেখানে স্কুল, বাজার, হাসপাতাল, এমনকি পাশের বাড়ির ভাবির সঙ্গে গল্প করতে গেলেও নৌকায় চেপে যেতে হয়! ভাবছেন এটা কোনো গল্পের অংশ কিংবা কোনো কল্পনার জগৎ? যদি সত্যি সত্যি এমনটা ভেবে থাকেন তাহলে ভুল করছেন। কারণ, পশ্চিম আফ্রিকার প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বেনিনে সত্যিই রয়েছে এমন একটি ভাসমান গ্রাম। গ্রামটির নাম ‘গ্যানভি’।
গ্যানভির অবস্থান ও জনসংখ্যা
বেনিনের কোটোনু শহরের কাছাকাছি লেক নাহকুয়ের বুকে গ্যানভি গ্রামের অবস্থান। প্রায় ২০ হাজার মানুষের বাস এই ভাসমান গ্রামে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস গ্রামটিকে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ভাসমান গ্রাম হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।
গ্রামটি প্রায় ৩ তিন স্তম্ভযুক্ত বাড়ি (স্টিল্ট হাউস) নিয়ে গঠিত। বাড়িগুলো লেকজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এই বাড়িগুলো পানিতে উঁচু স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায়, গ্রামটির দৃশ্য আরও চমকপ্রদ করে তুলেছে।
গ্যানভির ইতিহাস
ওপর থেকে দেখলে গ্যানভিকে মনে হতে পারে এ যেন এক পরীর দেশ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক কঠিন ইতিহাস। গ্যানভির ইতিহাস শুনলে মনে হবে যেন কোনো উপন্যাসের গল্প। ১৭ শতকের কথা, তখন আফ্রিকায় দাস ব্যবসা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টোফিনু জনগোষ্ঠী নিজেদের বাঁচাতে এক অভিনব পথ বেছে নেয়। শত্রু থেকে বাঁচতে তারা পানির ওপরই গ্রাম বানিয়ে ফেলেন!
.jpg)
টোফিনু জনগোষ্ঠীর শত্রু ছিল ‘ফন গোষ্ঠী’। ফনরা বিশ্বাস করত যে, পানিতে পবিত্র আত্মা বা দানব বাস করে। এই বিশ্বাসের কারণে তারা পানিতে প্রবেশ করতে ভয় পেত। টোফিনুরা এই ভয়টাকে কাজে লাগিয়ে লেক নাহকুয়ের ওপর গ্রাম বানায়। আর এ গ্রামের নাম দেয় ‘গ্যানভি’, যার অর্থ ‘আমরা বেঁচে গেছি’।
গ্যানভি গ্রামটি তৈরি করার জন্য টোফিনু জনগোষ্ঠীকে বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হয়েছিল। লেক নাহকুয়ের গভীরতা মাত্র দুই মিটার (ছয় ফুট)। তারা স্থলভাগ থেকে মাটি এনে হ্রদে ভরাট করে ছোট ছোট দ্বীপ তৈরি করে। তারপর সেগুলোর ওপর বাড়ি, স্কুল, বাজার এমনকি হাসপাতালও বানায়।
লোকমুখে গ্যানভি গ্রামটি নিয়ে রূপকথার মতো অনেক গল্প শোনা যায়। এই গল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো টোফিনু রাজার কাহিনি। কথিত আছে, রাজা জানতেন যে ফন যোদ্ধারা পানি বা পানির আত্মাকে ভয় পায়। এই ভয়টাকে কাজে লাগিয়ে তিনি তার লোকদের বাঁচানোর এক অভিনব পরিকল্পনা করেন। লোকমুখে শোনা যায়, রাজা একটি ঈগলে পরিণত হয়ে একটি হ্রদ খুঁজতে বের হন। এরপর তিনি খুঁজে পান ‘লেক নাহকুয়ে’, সেখানে পৌঁছে তিনি একটি বিশাল কুমিরে রূপ নেন এবং তার লোকদের নিরাপদে এই লেকে নিয়ে আসেন।
লোককাহিনি হলেও এটা সত্যি যে টোফিনু রাজার লোকেরা লেক নাহকুয়ের ওপর গ্রাম বানিয়ে শত্রুদের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল। আজও গানভি গ্রামটি সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং এটি দেখতে সত্যিই অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্যানভির মানুষের জীবন পানির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের ঘরবাড়িগুলো তৈরি করা হয়েছে কাঠের খুঁটির ওপর। গ্রামটির যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। বাজার থেকে স্কুল, রেস্তোরাঁ থেকে হাসপাতাল সবকিছুই পানির ওপর ভাসমান। চারদিকে শুধু পানি আর পানি, আর এই পানিই তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
.jpg)
গ্যানভির মানুষের প্রধান পেশা হলো মাছ চাষ। কিন্তু এটা সাধারণ কোনো পদ্ধতিতে মাছ চাষ নয়। এখানে তারা এক অভিনব প্রাকৃতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে। স্থানীয় ভাষায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘আকাজা’। এই পদ্ধতিতে তারা পানির নিচে বাঁশ পুঁতে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ বন তৈরি করে। এই বন হচ্ছে মাছের জন্য আদর্শ আবাসস্থল। আবার এর মাধ্যমে পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি হয় না। এতে একদিকে যেমন মাছের উৎপাদন বাড়ে, তেমনি অন্যদিকে প্রকৃতির সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক গভীর হয়।
গ্যানভি গ্রামটির অর্থনীতি মূলত মাছ ধরা এবং মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল। তবে গ্যানভি এখন একটি সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্পও গড়ে তুলেছে। পর্যটকরা এখানে আসেন অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাসমান বাজার এবং অনন্য জলপথ দেখতে।
গ্যানভির মানুষরা তাদের জলজ জীবনযাত্রায় অভিযোজিত হয়েছে অসাধারণ উপায়ে। তারা পানিতে জন্মানো বিশেষ গাছপালা দিয়ে হ্যাট, ব্যাগ এবং আফ্রিকান অলংকারের মতো জিনিস তৈরি করে। তাদের জীবনযাত্রা এতটাই অনন্য যে, এটি বিশ্বের অন্য কোনো সম্প্রদায়ের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।
গানভি গ্রামটি বেশ প্রাণবন্ত এবং চিত্রল। মাছ ধরার লোকেরা তাদের কাজে ব্যস্ত, নারীরা আনারস নিয়ে যাচ্ছেন, শিশুরা খেলছে, আর নৌকাগুলো পানিপথ দিয়ে চলাচল করছে। পুরো দৃশ্যটি যেন এক জীবন্ত ছবি। গ্রামে একটি ছোট গেস্টহাউসও আছে। গানভি এমন একটি জায়গা যা দেখার পর মনে হয়, পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গাও আছে!
প্রতিদিন ১০ হাজারেরও বেশি পর্যটক এই অনন্য গ্রামটি দেখতে আসেন, যা গানভিকে বেনিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে একটি করে তুলেছে। গানভি শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস এবং সংস্কৃতির প্রতীক। গ্রামটিকে ১৯৯৬ সালের ৩১ অক্টোবর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ টেন্টেটিভ লিস্টে (সাংস্কৃতিক বিভাগে) যুক্ত করা হয়।
অনেকেই গানভিকে ‘আফ্রিকান ভেনিস’ বলে ডাকেন। ভাসমান ছোট ছোট ঘর, সংকীর্ণ জলপথ, নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলা ডিঙি নৌকাগুলো। সব মিলিয়ে গ্রামটি যে অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য তৈরি করে, এর জন্য একে আফ্রিকার ভেনিস উপাধি দেওয়া ভুল হবে না। আফ্রিকার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের সহনশীলতার একটি জীবন্ত নিদর্শন এই গ্রাম ‘গ্যানভি’।
তারেক/
.jpg)